একটা ছবি রাতারাতি কাউকে তারকা বানিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সেই তারকাকে ধরে রাখা যায় না সবসময়। ১৯৯০ সালের ‘আশিকি’ দিয়ে রাতারাতি লক্ষ তরুণ-তরুণীর প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন রাহুল রায়। একসময় তাঁর মুখ, চুলের স্টাইল আর পর্দার রোম্যান্টিক উপস্থিতিই ছিল নব্বইয়ের বলিউডের অন্যতম পরিচিত ছবি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সেই ঝলমলে ক্যারিয়ার। কাজের অভাব, ব্যক্তিগত জীবনের পরিবর্তন এবং ২০২০ সালের ভয়াবহ ব্রেন স্ট্রোক—সব মিলিয়ে রাহুল রায়ের জীবন যেন একেবারে অন্য পথে চলে যায়।
আজ, কয়েক বছর পর, সেই অভিনেতাই আবার বলছেন—তিনি থেমে যাননি। বরং শূন্য থেকে নিজের জীবন ও কেরিয়ার গড়ার চেষ্টা করছেন।
‘আশিকি’ থেকেই রাতারাতি তারকা
১৯৯০ সালে মহেশ ভাট পরিচালিত ‘আশিকি’ মুক্তির পর রাহুল রায়ের কেরিয়ার যেন রকেটের গতিতে এগিয়ে যায়।
অনু আগরওয়ালের সঙ্গে তাঁর জুটি এবং ছবির গান তাঁকে রাতারাতি পরিচিত করে তোলে। এরপর ‘জুনুন’, ‘ফির তেরি কাহানি ইয়াদ আয়ি’-সহ একাধিক ছবিতে দেখা যায় তাঁকে।
পরে তিনি টেলিভিশনেও কাজ করেন এবং ‘বিগ বস’-এর প্রথম সিজনের বিজয়ী হন। কিন্তু সেই প্রথম ছবির মতো জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতা তাঁর কেরিয়ারে আর তৈরি হয়নি।
তারপর কোথায় হারিয়ে গেলেন রাহুল রায়?
রাহুল রায়ের ক্ষেত্রে “হঠাৎ বলিউড থেকে হারিয়ে যাওয়া” বললে গল্পটা পুরোপুরি বলা হয় না।
নব্বইয়ের দশকের পর নিয়মিত বড় পর্দায় তাঁর উপস্থিতি কমে যায়। টেলিভিশন, বিভিন্ন ছবি ও অন্যান্য কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি ক্যারিয়ার চালিয়ে গেলেও ‘আশিকি’র সেই বিপুল জনপ্রিয়তা আর ফিরে আসেনি।
এরপর আসে ২০২০ সালের ঘটনা, যা তাঁর জীবনের গতিপথই বদলে দেয়।
কার্গিলের শুটিংয়ে আচমকাই ব্রেন স্ট্রোক
২০২০ সালের নভেম্বর। ‘LAC – Live The Battle’ ছবির শুটিং চলছিল কার্গিলে।
সেখানেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন রাহুল রায়। পরে জানা যায়, তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁকে প্রথমে শ্রীনগরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে মুম্বইয়ের হাসপাতালে চিকিৎসা চলে। বেশ কিছুদিন ICU-তেও ছিলেন তিনি।
স্ট্রোকের পর তাঁর কথা বলার ক্ষমতাও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে রাহুল জানিয়েছেন, একটা সময় তিনি নিজেই জানতেন না ভবিষ্যতে ঠিকমতো হাঁটতে বা কথা বলতে পারবেন কি না।
এই অসুস্থতার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে তাঁর দীর্ঘ সময় লাগে।
পাঁচ বছর যেন কেরিয়ারের বিরতি
২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে রাহুল রায় জানিয়েছেন, স্ট্রোকের পরের প্রায় পাঁচ বছর তাঁর কাছে অত্যন্ত কঠিন ছিল।
কাজের সুযোগ কমে যায়। সুস্থ হয়ে উঠতে সময় লাগে। আর সেই সঙ্গে চলতে থাকে জীবনের অন্যান্য আর্থিক দায়িত্ব।
তাঁর কথায়, এই সময় তিনি যে কাজ পেয়েছেন, সেটাই করার চেষ্টা করেছেন। অবস্থা এমন ছিল যে অভিনয়ের পাশাপাশি অন্য ধরনের পারফরম্যান্সের কাজও তাঁকে নিতে হয়েছে।
বিয়েবাড়িতে নাচলেন ‘আশিকি’র নায়ক!
২০২৫ সালে বিয়ের অনুষ্ঠানে রাহুল রায়কে নাচতে দেখা যাওয়ার কিছু ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল।
সেই ভিডিও ঘিরে অনলাইনে নানা মন্তব্য ও ট্রোল শুরু হয়। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, কেন ‘আশিকি’র মতো জনপ্রিয় ছবির নায়ককে বিয়েবাড়িতে পারফর্ম করতে হচ্ছে?
কিন্তু রাহুলের নিজের বক্তব্য ছিল অনেক বেশি সরল।
তিনি জানিয়েছেন, তাঁর খরচ রয়েছে এবং অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। তাই যে কাজ থেকে আয় করা সম্ভব, তিনি সেটি করতে পিছপা হননি।
একেকটি অনুষ্ঠানে ₹২–৪ লাখ?
রাহুল রায় নিজেই জানিয়েছেন, কখনও কখনও বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ বা পারফর্ম করে তিনি ₹২ লাখ থেকে ₹৪ লাখ পর্যন্ত আয় করেন।
এই বক্তব্যই সম্প্রতি আবার সামনে আসার পর তাঁর জীবন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে এটাকে তাঁর প্রতি অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কখনও কখনও ওই পরিমাণ আয় হয়েছে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাহুলের কাছে এই কাজ কোনও লজ্জার বিষয় নয়।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা, মানুষ যে কাজ করে নিজের উপার্জন করছে, সেটিকে ছোট করে দেখার কারণ নেই।
সালমান খান কি সত্যিই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন?
রাহুল রায়ের জীবনের এই কঠিন সময়ে সালমান খানের সাহায্যের কথাও বহুবার সামনে এসেছে।
২০২৩ সালের একটি সাক্ষাৎকারে রাহুল জানিয়েছিলেন, ব্রেন স্ট্রোকের পর তাঁর চিকিৎসার সময় সালমান খান হাসপাতালের বিল মেটাতে সাহায্য করেছিলেন। রাহুল আরও বলেছিলেন, ভবিষ্যতে কাজ করে তিনি সেই সাহায্যের প্রতিদান দিতে চান।
তবে আপনার মূল স্ক্রিপ্টের একটি জায়গা এখানে সংশোধন করা জরুরি।
মহেশ ভাট, পূজা ভাট ও করিশ্মা কাপুর চিকিৎসার খরচ দিয়েছেন—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে লেখা ঠিক হবে না।
বরং ২০২৩ সালে রাহুল নিজেই জানিয়েছিলেন, তাঁর হাসপাতালে থাকার সময় মহেশ ভাট, পূজা ভাট, করিশ্মা কাপুরসহ কয়েকজন সহকর্মী তাঁকে ফোন বা দেখতে আসেননি।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি করিশ্মা, রাভিনা, পূজা-সহ কয়েকজনের সমর্থনের কথাও বলেছেন। অর্থাৎ কোন সময়ে কে কীভাবে পাশে ছিলেন—এই বিষয়টি আলাদা করে দেখা দরকার।
বিবাহবিচ্ছেদের পর আর্থিক জীবনও বদলে যায়
রাহুল রায় ২০০০ সালে মডেল রাজলক্ষ্মী খানভিলকরের সঙ্গে বিয়ে করেছিলেন। ২০১৪ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে রাহুল জানিয়েছেন, বিবাহবিচ্ছেদের সময় তিনি নিজের কিছু সম্পদ স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করেছিলেন। ফলে পরবর্তীতে তাঁকে আবার আর্থিকভাবে নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে হয়েছে।
এছাড়াও তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে প্রায় ₹৩০ লাখের একটি আইনি বিষয় নিয়ে মামলা চলছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
৫৮ বছর বয়সেও নতুন করে ‘সাম্রাজ্য’ গড়ার স্বপ্ন
এখানেই রাহুল রায়ের গল্পের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, এখন তাঁর লক্ষ্য একেবারে নতুন করে নিজের জীবন ও কেরিয়ার তৈরি করা।
রাহুলের জন্ম ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮। তাই ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর বয়স ৫৮ বছর। কিছু প্রতিবেদনে তাঁকে ৬০ বলা হলেও জন্মতারিখ অনুযায়ী এখনই ৬০ নন।
তিনি অবসর নেওয়ার কথা ভাবছেন না। বরং নতুন কাজ পেলে আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে চাইছেন।
স্ট্রোকের পর বদলে ফেলেছেন জীবনযাপন
শুধু কেরিয়ার নয়, নিজের জীবনযাপনেও বড় পরিবর্তন এনেছেন রাহুল।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, আগে তিনি নিয়মিত ধূমপান করতেন এবং non-vegetarian খাবার খেতেন। স্ট্রোকের পর তিনি ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন এবং এখন vegan ও Jain-style diet অনুসরণ করেন। পেঁয়াজ, রসুন ও দুধও এড়িয়ে চলেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
এছাড়া প্রতিদিন আটটি ওষুধ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন অভিনেতা।
এগুলো তাঁর নিজের বর্ণনা—কোনও নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা-পদ্ধতি বা সাধারণ স্বাস্থ্যপরামর্শ হিসেবে এগুলোকে দেখা উচিত নয়।
এবার ‘Super Badshah’-এ ফের ক্যামেরার সামনে
দীর্ঘ বিরতির পর অভিনয়ে ফিরছেন রাহুল রায়।
Kuku TV-এর ‘Super Badshah’-এ তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যাবে। রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনি একজন underworld don-এর চরিত্রে অভিনয় করছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন করণভীর বোহরা।
স্ট্রোকের পর কথা বলার সমস্যার কারণে নতুন করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো নিয়ে তাঁর কিছুটা সংশয় ছিল। কিন্তু সহ-অভিনেতা ও টিমের সহযোগিতায় তিনি সেই ভয় কাটিয়ে আবার কাজে ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন।
তাহলে কি রাহুল রায় বলিউডের ‘শিকার’?
এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া কঠিন।
রাহুল রায়ের কেরিয়ারে জনপ্রিয়তার ওঠানামা ছিল, কিন্তু তাঁকে “বলিউডের শিকার” হিসেবে চিহ্নিত করার মতো নিরপেক্ষ প্রমাণ নেই।
বরং তাঁর নিজের সাম্প্রতিক বক্তব্যে যে ছবিটা পাওয়া যায়, তা হল—একদিকে স্ট্রোকের পর দীর্ঘ পুনর্বাসন, অন্যদিকে কাজের অভাব ও আর্থিক চাপ; আর সেই পরিস্থিতিতে তিনি বিভিন্ন ধরনের কাজ গ্রহণ করে আবার নিজের কেরিয়ার দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন।
‘আশিকি’র নায়ক থেকে জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস
একটা সময় যে অভিনেতার গান-ছবিতে গোটা প্রজন্ম মুগ্ধ হয়েছিল, আজ সেই রাহুল রায়কে হয়তো অন্যভাবে দেখা দরকার।
বিয়েবাড়িতে নাচা তাঁর কাছে কোনও “পতন” নয়—তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী সেটিও কাজ, সেটিও উপার্জনের পথ।
আর ২০২০ সালের ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের পর আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রত্যাবর্তন।
তারকা হয়ে ওঠা হয়তো ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু কঠিন সময়ের পর আবার শুরু করার সিদ্ধান্তটা ব্যক্তিগত।
রাহুল রায়ের গল্প তাই শুধু ‘আশিকি’র নায়কের হারিয়ে যাওয়া বা ফিরে আসার গল্প নয়—এটি জনপ্রিয়তার বাইরে একজন অভিনেতার নিজের জীবনকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টার গল্প।
FACT CHECK
দাবি: রাহুল রায় এখন বিয়েবাড়িতে নেচে ₹২–৪ লাখ আয় করেন।
রায়: মূলত সঠিক, তবে এটি তাঁর নিজের বক্তব্য। তিনি জানিয়েছেন, কখনও কখনও বিয়েতে নাচ বা পারফর্ম করে ₹২–৪ লাখ আয় করেন।
দাবি: সালমান খান তাঁর চিকিৎসার খরচে সাহায্য করেছিলেন।
রায়: রাহুল রায়ের নিজের বক্তব্যে সমর্থিত। ২০২৩ সালের সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সালমান হাসপাতালের বিল মেটাতে সাহায্য করেছিলেন।
দাবি: মহেশ ভাট, পূজা ভাট ও করিশ্মা কাপুর চিকিৎসার খরচ দিয়েছিলেন।
রায়: নিশ্চিত নয়/বিভ্রান্তিকর। ২০২৩ সালে রাহুল বলেছিলেন, তাঁরা হাসপাতালে থাকার সময় যোগাযোগ করেননি; ২০২৬ সালে তিনি আবার কয়েকজনের সমর্থনের কথা বলেছেন। তাই নির্দিষ্ট চিকিৎসা-খরচের দাবি করা ঠিক নয়।
দাবি: রাহুল রায়ের বয়স এখন ৬০।
রায়: ভুল। তাঁর জন্ম ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮; সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ তাঁর বয়স ৫৮।
দাবি: রাহুল রায় আবার অভিনয়ে ফিরছেন।
রায়: সঠিক। ‘Super Badshah’-এ তাঁর প্রত্যাবর্তনের খবর প্রকাশিত হয়েছে।



