একদিন যদি পৃথিবী থেকে হঠাৎ করে মানুষ নামের প্রাণীটি সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যায়, তাহলে কী হবে? বিশাল শহর, আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, ব্রিজ, রাস্তা, কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র—মানুষের তৈরি এই বিশাল সভ্যতার পরিণতিই বা কী হবে?
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, মানুষের অনুপস্থিতিতে পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে না। বরং ধীরে ধীরে প্রকৃতি মানুষের তৈরি কাঠামোর উপর নিজের কর্তৃত্ব ফিরে পেতে শুরু করবে। শহরের কংক্রিটের জঙ্গল বদলে যেতে পারে সবুজ অরণ্যে, আর বহু প্রাণী ফিরে পেতে পারে তাদের হারানো আবাসস্থল।
এই ‘মানুষহীন পৃথিবী’ কেমন হতে পারে, তা নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও গবেষকের আলোচনা রয়েছে। আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির কমিউনিটি অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং ও আরবান ডিজাইনের সহযোগী অধ্যাপক কার্লটন বাসম্যাগিয়ানের একটি বিশ্লেষণেও এমন সম্ভাব্য ভবিষ্যতের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছিল।
মানুষ না থাকলে প্রথম কয়েক দিনেই কী বদলাবে?
মানুষ হঠাৎ পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলে সবচেয়ে আগে থেমে যাবে মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড।
গাড়ি চলবে না, কারখানার যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে, নির্মাণকাজ থেমে যাবে। শহরের চেনা শব্দ—হর্ন, ইঞ্জিন, যন্ত্রপাতি এবং মানুষের কোলাহল—ক্রমশ হারিয়ে যাবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পৃথিবী সঙ্গে সঙ্গে দূষণমুক্ত হয়ে যাবে। বাতাসে ইতিমধ্যে থাকা দূষক ধীরে ধীরে কমবে, কিন্তু তার জন্য সময় লাগবে।
এক বছরের মধ্যে শহরের চেহারা বদলাতে শুরু করবে
মানুষের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বন্ধ হয়ে গেলে বাড়িঘর, রাস্তা এবং পার্ক দ্রুত বদলাতে শুরু করবে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন মানুষের তদারকি ছাড়া চালু রাখা কঠিন। জল সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা তৈরি হবে। ফলে কল থেকে জল পাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং শহরের বাসিন্দা না থাকায় বাড়িঘর অন্ধকার হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, বৃষ্টি ও মাটির আর্দ্রতার সুযোগ নিয়ে রাস্তার ফাঁক, ফুটপাত এবং পরিত্যক্ত জমিতে আগাছা জন্মাতে শুরু করবে। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকৃতি মানুষের তৈরি জায়গাগুলির দখল নিতে শুরু করবে।
বড় বড় ব্রিজ ও বিল্ডিংয়ের কী হবে?
মানুষের তৈরি কোনও কাঠামোই চিরস্থায়ী নয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বন্ধ হয়ে গেলে মরচে, জল, বাতাস, তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং উদ্ভিদের শিকড় ধীরে ধীরে নির্মাণগুলিকে দুর্বল করে দেবে।
বিশাল স্টিলের সেতু কিংবা উঁচু ভবনও একসময় ক্ষয়ে যেতে শুরু করবে। তবে সব কাঠামো একই সময়ে ভেঙে পড়বে না। কোন ভবন কতদিন টিকবে, তা নির্ভর করবে তার নির্মাণসামগ্রী, নকশা, পরিবেশ এবং অবস্থানের উপর।
কয়েক শতাব্দী পর বহু ধাতব কাঠামো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিছু সেতু ও ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
অর্থাৎ, মানুষের তৈরি স্থাপত্যের উপর প্রকৃতির প্রভাব যত বাড়বে, ততই শহরের বর্তমান চেহারা বদলে যাবে।
শহর কি জঙ্গলে পরিণত হবে?
সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি।
মানুষের অনুপস্থিতিতে রাস্তার ধারে, বাড়ির আশেপাশে এবং পরিত্যক্ত পার্কে উদ্ভিদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার কেউ থাকবে না। ধীরে ধীরে ছোট গাছ বড় হবে, লতাগুল্ম ছড়াবে এবং অনেক জায়গায় ঘন সবুজ তৈরি হতে পারে।
যেসব প্রাণী মানুষের তৈরি শহুরে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, তারাও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করবে। কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর, পাখি এবং বিভিন্ন ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী পরিত্যক্ত শহরগুলিতে নতুনভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রাণীদের জন্য কি আরও ভালো হবে পৃথিবী?
অনেক প্রজাতির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ মানুষের কৃষি, রাস্তা, শিল্প এবং শহর সম্প্রসারণের ফলে যে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হয়েছে, তার কিছু অংশ ধীরে ধীরে ফিরে আসতে পারে।
নদী ও জলাশয়ে শিল্পবর্জ্য বা অন্যান্য মানবসৃষ্ট দূষণ কমে গেলে জলজ পরিবেশও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সব বিলুপ্ত প্রাণী আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে। কোনও প্রজাতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেলে শুধু মানুষের অনুপস্থিতির কারণে তা স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসবে না। নতুন প্রজাতির বিবর্তনের জন্যও সাধারণত বিপুল সময় প্রয়োজন।
জল ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কী হবে?
মানুষ না থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে অচল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।
জল সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও পাম্প, পরিশোধনাগার এবং পাইপলাইনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। সেগুলি বন্ধ হয়ে গেলে শহরের মানুষ যেমন সমস্যায় পড়ত, মানুষ না থাকলে সিস্টেমগুলিও ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যাবে।
এরপর নদী, হ্রদ, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ জল নিজেদের স্বাভাবিক চক্রে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
প্লাস্টিকের কী হবে?
মানুষ চলে গেলেও প্লাস্টিক সহজে অদৃশ্য হবে না। এই উপাদান পরিবেশে অত্যন্ত দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের অবক্ষয়ের সময় এক নয়। সূর্যের আলো, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং পরিবেশের উপর নির্ভর করে এগুলি ধীরে ধীরে ভাঙতে পারে। কিন্তু তা যে কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ বছরের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাবে—এমন একটি নির্ভরযোগ্য একক সময়সীমা বলা কঠিন।
বরং প্লাস্টিকের বড় সমস্যা হল, তা ভেঙে ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিকেও পরিণত হতে পারে।
তাহলে কি মানুষই পৃথিবী ধ্বংস করছে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। পৃথিবী আর মানুষের সভ্যতা—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
মানুষ বিলুপ্ত হয়ে গেলে পৃথিবী ধ্বংস হবে না। পৃথিবীর জীবমণ্ডল নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে টিকে থাকবে। কিন্তু মানুষের তৈরি সভ্যতা ভেঙে পড়বে এবং পৃথিবী ধীরে ধীরে অন্য এক পরিবেশগত ভারসাম্যের দিকে এগিয়ে যাবে।
আসল শিক্ষা এখানেই। পৃথিবীর প্রয়োজন মানুষকে নয়, কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পৃথিবীর সুস্থ পরিবেশ অপরিহার্য।
মানুষ না থাকলে পৃথিবী শেষ হবে না, বদলে যাবে
মানুষের তৈরি ব্রিজ, বাড়ি, রাস্তা কিংবা শহর একসময় প্রকৃতির কাছে পরাজিত হবে। কোথাও গাছপালা কংক্রিট ঢেকে দেবে, কোথাও জল ফিরে পাবে তার পুরনো পথ, আবার কোথাও প্রাণীরা দখল নেবে মানুষের পরিত্যক্ত আবাসস্থল।
কিন্তু এই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য ভয় দেখানোর গল্প নয়। বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—প্রকৃতি মানুষের উপর নির্ভরশীল নয়, মানুষই প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল।
তাই পৃথিবীকে বাঁচানো মানে শুধু প্রকৃতিকে বাঁচানো নয়; শেষ পর্যন্ত সেটি মানুষের নিজেদের ভবিষ্যৎকেই সুরক্ষিত করা।



