পুজোর আগে রেশন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসছে—মোবাইলে আসা বিশেষ টোকেন দেখালেই নাকি রেশন দোকান থেকে চাল-গম মিলবে, এমন দাবি ইতিমধ্যেই ছড়িয়েছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিষ্কার করা দরকার। কেন্দ্রীয় সরকার সত্যিই CBDC বা ডিজিটাল রুপির মাধ্যমে রেশন বিতরণের পাইলট প্রকল্প চালু করেছে, কিন্তু ২৬ অগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে এই ব্যবস্থার এমন কোনও সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি যে রাজ্যের সব রেশন গ্রাহককে মোবাইল টোকেন না দেখালে চাল-গম দেওয়া হবে না।
তাই ‘পুজোর আগেই বাংলার সব রেশন দোকানে ডিজিটাল কারেন্সি চালু’—এমন দাবি এখনই নিশ্চিত করে বলা ঠিক হবে না। কেন্দ্রের যে প্রকল্পটি বাস্তবে চালু হয়েছে, সেটি কী এবং কোথায় চলছে, তা জানলে বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হবে।
রেশনে ‘ডিজিটাল কারেন্সি’ আসলে কী?
কেন্দ্রীয় খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রক ২০২৬ সালে CBDC-based Digital Food Currency নামে একটি পাইলট প্রকল্প শুরু করেছে। এখানে RBI-এর Digital Rupee বা e₹-কে নির্দিষ্ট খাদ্যসামগ্রী কেনার জন্য ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল কুপন বা টোকেন হিসেবে প্রোগ্রাম করা হচ্ছে।
এই টোকেন সাধারণ টাকার মতো ইচ্ছেমতো খরচ করা যাবে না। অনুমোদিত Fair Price Shop বা নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্রে খাদ্যশস্য কেনার জন্যই এর ব্যবহার নির্দিষ্ট থাকবে। (PIB)
অর্থাৎ এটি নতুন কোনও আলাদা টাকা নয়; RBI-এর CBDC বা ডিজিটাল রুপির একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহারযোগ্য রূপ।
কোথায় শুরু হয়েছে এই পাইলট প্রকল্প?
প্রথম পর্যায়ে এই ব্যবস্থা গুজরাত এবং পুদুচেরিতে চালু করা হয়। গুজরাতে ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রকল্পের উদ্বোধন হয় এবং পুদুচেরিতে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাইলট শুরু হয়। পরবর্তীতে চণ্ডীগড় এবং দাদরা ও নগর হাভেলি ও দমন ও দিউ-তেও এই CBDC-ভিত্তিক খাদ্য ভর্তুকি ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে। (PIB)
২৬ অগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে এই একই CBDC-ভিত্তিক রেশন ব্যবস্থার সর্বজনীন rollout-এর সরকারি ঘোষণা মেলেনি।
অতএব, গুজরাত বা অন্য জায়গায় চালু হওয়া পাইলট প্রকল্পের তথ্যকে সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের নতুন রেশন-নিয়ম হিসেবে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
তাহলে মোবাইলে টোকেন কীভাবে কাজ করে?
কেন্দ্রের পাইলট ব্যবস্থায় সুবিধাভোগীর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যভর্তুকি programmable Digital Rupee আকারে বরাদ্দ করা হয়।
এই ডিজিটাল টোকেন বা কুপন নির্দিষ্ট খাদ্যশস্য কেনার জন্য ব্যবহার করা যায়। অনুমোদিত Fair Price Shop-এ QR code বা coupon/voucher code-এর মাধ্যমে তা redeem করা যায়। (PIB)
এর একটি বড় সুবিধা হল, ভর্তুকির টাকা কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা ডিজিটাল ব্যবস্থায় ট্র্যাক করা যায়। ফলে খাদ্যভর্তুকি অন্য খাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
e-POS মেশিনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
ভারতের রেশন ব্যবস্থায় e-POS মেশিন নতুন নয়। ইতিমধ্যেই বহু রাজ্যে Aadhaar-ভিত্তিক authentication এবং real-time transaction recording-এর জন্য e-POS ব্যবহার করা হচ্ছে।
CBDC-ভিত্তিক নতুন পাইলটের লক্ষ্য হল সেই ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে programmable money যুক্ত করা। ফলে প্রতিটি লেনদেনের একটি ডিজিটাল trail তৈরি হয় এবং নজরদারি আরও শক্তিশালী করা যায়। (PIB)
তবে এর অর্থ এই নয় যে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান e-POS ব্যবস্থা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়ে সবার জন্য নতুন টোকেন বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গে এখন কী পরিবর্তন হয়েছে?
পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের অগস্টে Smart PDS-এর মতো প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন নিয়ে ইতিমধ্যেই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে রেশন বিতরণে আইরিস স্ক্যানের মতো biometric verification ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। (Aaj Tak Bangla)
অর্থাৎ বাংলায় ডিজিটাল ও বায়োমেট্রিক রেশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ হচ্ছে—এটি সত্য। কিন্তু Smart PDS-এর biometric verification আর CBDC-based Digital Food Currency এক জিনিস নয়।
এই দুই প্রযুক্তিকে একসঙ্গে মিশিয়ে ‘ফোনে টোকেন না থাকলে রেশন মিলবে না’ বলা তথ্যগতভাবে ঠিক নয়।
‘এক দেশ, এক রেশন কার্ড’-এর সঙ্গে কি এর সম্পর্ক আছে?
হ্যাঁ, বৃহত্তর ডিজিটাল PDS সংস্কারের সঙ্গে এই প্রকল্পের যোগ রয়েছে। কেন্দ্র ইতিমধ্যে One Nation One Ration Card (ONORC)-এর মাধ্যমে দেশজুড়ে রেশন কার্ডের portability এবং end-to-end digitisation এগিয়ে নিয়েছে।
কেন্দ্রের দাবি, ডিজিটাল রেশন কার্ড, Aadhaar-based verification, e-POS এবং beneficiary database-এর মাধ্যমে ভুয়ো বা duplicate beneficiary শনাক্ত করা এবং খাদ্যশস্যের diversion কমানো সহজ হচ্ছে। (PIB)
CBDC-based food currency-কে এই ডিজিটাল সংস্কারের পরবর্তী ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেছে কেন্দ্র।
কেন এই ব্যবস্থা আনা হচ্ছে?
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য তিনটি জায়গায়—স্বচ্ছতা, হিসাবযোগ্যতা এবং ভর্তুকির সঠিক ব্যবহার।
বর্তমান PDS ব্যবস্থায় e-POS, Aadhaar authentication ও digital supply-chain monitoring ইতিমধ্যেই চালু রয়েছে। CBDC যুক্ত হলে সরকার খাদ্যভর্তুকির প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেন আরও নির্দিষ্টভাবে trace করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। (PIB)
এছাড়াও, সরকারি দাবি অনুযায়ী, biometric authentication বা e-POS ব্যবস্থায় যে প্রযুক্তিগত সমস্যা কখনও কখনও দেখা যায়, নতুন ব্যবস্থায় তার কিছুটা সমাধান করার সম্ভাবনা রয়েছে। (PIB)
তাহলে কি পশ্চিমবঙ্গে রেশন নিতে ফোনে টোকেন রাখতেই হবে?
এই মুহূর্তে এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
২৬ অগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী CBDC-based Digital Food Currency এখনও নির্বাচিত এলাকা ও সীমিত সুবিধাভোগী নিয়ে পাইলট বা সম্প্রসারণ পর্যায়ে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সব রেশন গ্রাহকের জন্য ‘টোকেন ছাড়া রেশন নয়’—এমন নির্দেশের সরকারি প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাই কেউ যদি ফোনে কোনও অচেনা লিঙ্ক, QR code বা OTP পাঠিয়ে বলে ‘রেশন পেতে এটি চাপুন’ বা ‘টোকেন activate করতে টাকা দিন’, তাহলে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। সরকারি রেশন ব্যবস্থা সংক্রান্ত পরিবর্তনের জন্য অফিসিয়াল খাদ্য দফতর, রেশন ডিলার বা সরকারি নোটিসই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস।
ভবিষ্যতে কি বাংলাতেও এই ব্যবস্থা আসতে পারে?
কেন্দ্রের বর্তমান পাইলটগুলির লক্ষ্যই হল প্রযুক্তিটি বিভিন্ন ধরনের PDS ব্যবস্থায় পরীক্ষা করে দেখা এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনে আরও জায়গায় সম্প্রসারণ করা। গুজরাতের পাইলট এবং পরবর্তী সম্প্রসারণ সেই পরিকল্পনারই অংশ। (PIB)
তাই ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গেও CBDC-ভিত্তিক খাদ্য ভর্তুকির কোনও মডেল চালু হতে পারে—এমন সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু কবে, কোথায় এবং কার জন্য তা চালু হবে, সে বিষয়ে রাজ্য বা কেন্দ্রের নির্দিষ্ট সরকারি ঘোষণা না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত দাবি করা উচিত নয়।
এক নজরে
ডিজিটাল ফুড কারেন্সি: হ্যাঁ, কেন্দ্রের পাইলট প্রকল্প বাস্তব।
ভিত্তি: RBI-এর CBDC বা Digital Rupee (e₹)।
প্রথম পাইলট: গুজরাত ও পুদুচেরি।
পরবর্তী সম্প্রসারণ: চণ্ডীগড় ও দাদরা ও নগর হাভেলি-দমন ও দিউ।
ব্যবহার: অনুমোদিত রেশন দোকানে খাদ্যশস্য কেনার জন্য নির্দিষ্ট ডিজিটাল কুপন/টোকেন।
পশ্চিমবঙ্গে সবার জন্য বাধ্যতামূলক? ২৬ অগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এমন সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
সুতরাং ‘পুজোর আগে বাংলায় রেশন তুলতে মোবাইলে বিশেষ টোকেন না থাকলে চাল-গম মিলবে না’—এই দাবিকে আপাতত নিশ্চিত খবর হিসেবে না দেখাই ভালো। সত্যিটা হল, ভারতের রেশন ব্যবস্থায় ডিজিটাল রুপির ব্যবহার শুরু হয়েছে, কিন্তু তার rollout এখনও নির্বাচিত এলাকায় সীমিত এবং পশ্চিমবঙ্গে সবার জন্য এই নিয়ম চালু হয়েছে—এমন প্রমাণ নেই।



