ভালোবাসার মানুষকে ফুল, গয়না কিংবা দামি উপহার দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু স্ত্রীকে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে যদি কেউ আস্ত একটি প্রাসাদ বানিয়ে দেন, তাও আবার বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপত্য তাজমহলের আদলে—তাহলে সেই গল্প যে নজর কাড়বে, সেটাই স্বাভাবিক।
মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুরের বাসিন্দা আনন্দ প্রকাশ চোকসের তৈরি এমনই একটি বাড়ি কয়েক বছর ধরে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র। স্ত্রী মঞ্জুষাকে ভালোবাসার বিশেষ উপহার হিসেবে তৈরি এই বাড়ির নকশায় রয়েছে আগ্রার তাজমহলের স্পষ্ট ছাপ।
কেন তাজমহলের আদলে বাড়ি বানালেন আনন্দ প্রকাশ?
তাজমহলের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কের গল্প ভারতীয় সংস্কৃতিতে বহু পুরনো। তবে শাহজাহানের স্মৃতিসৌধের মতো মৃত্যুর পর নয়, নিজের স্ত্রীকে জীবিত অবস্থাতেই ভালোবাসার বিশেষ নিদর্শন দিতে চেয়েছিলেন আনন্দ প্রকাশ।
সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় এই অভিনব বাড়ি। তাই অনেকেই তাঁকে মজা করে ‘আধুনিক শাহজাহান’ বলেও উল্লেখ করেন।
তবে এটি কোনও সরকারি স্থাপনা বা তাজমহলের হুবহু পুনর্নির্মাণ নয়। বরং ব্যক্তিগত আবাসন হিসেবে তাজমহলের স্থাপত্যশৈলী থেকে অনুপ্রাণিত একটি বাড়ি।
চার বেডরুমের প্রাসাদে কী কী রয়েছে?
বাড়িটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার স্থাপত্য। তাজমহলের আদলে তৈরি গম্বুজ, মিনার, খিলান এবং সূক্ষ্ম জালির কাজ নজর কাড়ে।
প্রতিবেদনে জানা যায়, বাড়িটির ছাদ প্রায় ২৪ ফুট উঁচু। নকশায় তাজমহলের বিভিন্ন মাপ ও অনুপাতকে অনুসরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
চার বেডরুমের এই বাড়িতে শুধু বাইরের নকশাই নয়, ভিতরের অংশেও রাজকীয় আবহ তৈরির চেষ্টা রয়েছে।
মাকরানা মার্বেল দিয়ে তৈরি
বাড়িটির নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে রাজস্থানের বিখ্যাত মাকরানা মার্বেল। তাজমহল নির্মাণেও মাকরানা মার্বেল ব্যবহারের ঐতিহাসিক উল্লেখ রয়েছে।
মার্বেলের পাশাপাশি কারুকার্যময় নকশা এবং জালির কাজ বাড়িটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে। নির্মাণে ইন্দোর এবং পশ্চিমবঙ্গের কারিগরদেরও যুক্ত করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
কত টাকা খরচ হয়েছে?
এই ব্যক্তিগত ‘তাজমহল’ তৈরি করতে আনুমানিক ২ থেকে ২.৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—এটি আনুমানিক নির্মাণ ব্যয়। বাড়িটির প্রকৃত মোট খরচ বা বর্তমান বাজারমূল্য আলাদা হতে পারে।
বাড়িটি সম্পূর্ণ করতে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছিল বলেও জানা যায়।
আসল তাজমহলের সঙ্গে কতটা মিল?
আনন্দ প্রকাশের বাড়িটির নকশা তাজমহল থেকে অনুপ্রাণিত হলেও সেটি আকারে অনেক ছোট।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল তাজমহলের বিভিন্ন মাপকে অন্য স্কেলে রূপান্তর করে তার আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ মাপের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
ফলে দূর থেকে দেখলে তাজমহলের কথা মনে পড়লেও এটি আসল তাজমহলের বিকল্প নয়। বরং ব্যক্তিগত বাড়ি হিসেবে তৈরি একটি স্থাপত্য-প্রতিলিপি।
আসল তাজমহল তৈরি করতে কত সময় লেগেছিল?
মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে আগ্রায় তাজমহল নির্মাণ করান। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, মূল নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হতে প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় লেগেছিল।
তাজমহলের নির্মাণ ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক হিসাব পাওয়া যায়। তাই অতীতের টাকার অঙ্ককে সরাসরি বর্তমান মূল্যের সঙ্গে তুলনা করা সহজ নয়।
এখানেই আনন্দ প্রকাশের বাড়ির সঙ্গে আসল তাজমহলের সবচেয়ে বড় পার্থক্য—একটি স্মৃতিসৌধ, অন্যটি জীবিত স্ত্রীর জন্য তৈরি ব্যক্তিগত আবাস।
বুরহানপুরের এই বাড়ি কেন এত চর্চায়?
ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে তাজমহলকে নতুন করে ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে যুক্ত করাই এই বাড়িটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
আনন্দ প্রকাশ চোকসে এমন একটি স্থাপত্য তৈরি করেছেন, যেখানে আবেগের পাশাপাশি রয়েছে কারিগরি দক্ষতারও ছাপ। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে নিজের বাড়িকে তাজমহলের আদলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
তাই এটি শুধু ‘তাজমহলের প্রতিলিপি’ নয়, বরং একজন মানুষের ব্যক্তিগত ভালোবাসার ভাবনাকে স্থাপত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করার একটি উদাহরণ।
ভালোবাসার স্মৃতিস্তম্ভ, তবে অন্যরকম
শাহজাহানের তাজমহল তৈরি হয়েছিল মমতাজের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য। আর বুরহানপুরের এই বাড়ি তৈরি হয়েছে জীবিত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের উদ্দেশ্যে।
দুই স্থাপত্যের ইতিহাস, উদ্দেশ্য এবং পরিসর সম্পূর্ণ আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে—ভালোবাসাকে স্থাপত্যের ভাষায় প্রকাশ করার আকাঙ্ক্ষা।
আর সেই কারণেই মধ্যপ্রদেশের এই ‘আধুনিক তাজমহল’ আজও মানুষের কৌতূহলের বিষয়।



