Friday, August 28, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাটবিধানসভা লাইব্রেরির ১৯টি বই ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ, মমতাকে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি...

বিধানসভা লাইব্রেরির ১৯টি বই ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ, মমতাকে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি মন্ত্রীর

বিধানসভা লাইব্রেরি থেকে নেওয়া ১৯টি বই এখনও ফেরত আসেনি—প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়িয়ে এমন অভিযোগ ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসার পর রাজ্যের জনশিক্ষা প্রসার ও গ্রন্থাগার পরিষেবা মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ফেরত না এলে নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৮ খণ্ডের ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ এবং ‘সঞ্চয়িতা’। বিধানসভা সূত্রের দাবি, বইগুলি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে ইস্যু করা হয়েছিল এবং নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও লাইব্রেরির নথিতে সেগুলি ফেরত দেখানো হয়নি।

১৯টি বই নিয়ে ঠিক কী অভিযোগ?

বিধানসভা লাইব্রেরির হিসাব অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে মোট ১৯টি বই ইস্যু রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে।

এর মধ্যে ১৮টি বই রবীন্দ্র রচনাবলীর বিভিন্ন খণ্ড। অন্যটি ‘সঞ্চয়িতা’। বইগুলি অনেক আগে নেওয়া হয়েছিল এবং এখনও লাইব্রেরির রেকর্ডে সেগুলিকে ‘রিটার্নড’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়নি।

তবে ‘বই ফেরত দেওয়া হয়নি’—এই বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে জানানো হয়েছে, বইগুলি তাঁর বাড়িতে নেই; সেগুলি বিধানসভা ভবনের মুখ্যমন্ত্রীর চেম্বারে রয়েছে। ফলে এখন মূল প্রশ্ন, নির্দিষ্ট লাইব্রেরি প্রক্রিয়া অনুযায়ী বইগুলি কবে এবং কীভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত দেখানো হবে।

কেন আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি?

গ্রন্থাগার মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষের বক্তব্য, কোনও ব্যক্তি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বা অন্য কোনও পদে ছিলেন বলেই লাইব্রেরির নিয়ম তাঁর ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে না।

তিনি জানিয়েছেন, সাধারণ পাঠকের ক্ষেত্রে যে নিয়মে বই ফেরত নেওয়া হয়, একই প্রক্রিয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বই ফেরত না এলে প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

অর্থাৎ, এখনই কোনও আদালতের মামলা হয়ে গিয়েছে—এমন তথ্য নেই। বরং মন্ত্রীর বক্তব্যকে সম্ভাব্য আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা উচিত।

মমতার পক্ষের বক্তব্য কী?

এই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা তথ্য সামনে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বইগুলি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত বাড়িতে নেই; সেগুলি বিধানসভার মুখ্যমন্ত্রীর চেম্বারেই রয়েছে বলে তাঁর তরফে জানানো হয়েছে।

এক্ষেত্রে বিতর্কের কেন্দ্র তাই কিছুটা বদলে যায়। বই ‘উধাও’ হয়ে গিয়েছে কি না, তার চেয়ে বড় বিষয় দাঁড়াচ্ছে—বিধানসভা লাইব্রেরির নথি অনুযায়ী বইগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে কি না।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনও বই একই ভবনের অন্য কক্ষে থাকলেও লাইব্রেরির রেকর্ডে সেটি ফেরত না দেখালে প্রশাসনিকভাবে সেটি এখনও ‘outstanding’ হিসেবে থাকতে পারে।

শুধু বই ফেরত নয়, লাইব্রেরির নীতি নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গৌরীশঙ্কর ঘোষ সরকারি গ্রন্থাগারগুলিতে কোন ধরনের বই রাখা হবে, তা নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, আগের সরকারের সময়ে সরকারি ও স্কুল লাইব্রেরিতে নির্দিষ্ট কিছু লেখকের বই কেনার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করা হত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘এপাং ওপাং ঝপাং’-এর মতো বই নিয়েও তিনি আপত্তি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর বই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

নতুন সরকারের অধীনে গ্রন্থাগারের সংগ্রহে ভারতের ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ এবং স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বদের লেখা বেশি গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সরকারি লাইব্রেরিতে কোন বই থাকবে—এ নিয়েও প্রশ্ন

মন্ত্রী যে অবস্থান নিয়েছেন, তা শুধু মমতার বই নিয়ে নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি গ্রন্থাগারের নীতি নিয়েও বৃহত্তর বিতর্ক।

একটি সরকারি লাইব্রেরির বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাহিত্যিক মূল্য, পাঠকের চাহিদা, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, শিক্ষামূল্য এবং বিষয়বৈচিত্র্য—এসব বিষয় কতটা বিবেচনায় নেওয়া হবে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে শুধু কোনও একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের লেখা বই থাকবে কি না—এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্ন হল, সরকার বদলের সঙ্গে কি সরকারি লাইব্রেরির বইয়ের নীতিও বদলাবে?

‘বই কেলেঙ্কারি’ বলা কতটা যুক্তিযুক্ত?

এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ভাষ্যে ‘বই কেলেঙ্কারি’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হলেও, এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে কোনও আর্থিক দুর্নীতি বা বই চুরির ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে—এমন কথা বলা যায় না।

এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হল—মমতার নামে ইস্যু হওয়া ১৯টি বই লাইব্রেরির রেকর্ডে ফেরত দেখানো হয়নি এবং সেই কারণেই মন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।

তাই ঘটনাটিকে আপাতত লাইব্রেরির বই ফেরত ও প্রশাসনিক নথিভুক্তির বিতর্ক হিসেবে দেখা বেশি নির্ভুল।

রাজনৈতিক সংঘাত কি আরও বাড়বে?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সরকার বদলের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে শাসক ও বিরোধী শিবিরের টানাপোড়েন নতুন নয়। তার মধ্যে বিধানসভা লাইব্রেরির মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বইয়ের হিসাব সামনে আসায় বিষয়টি প্রতীকী গুরুত্বও পাচ্ছে।

একদিকে মন্ত্রী বলছেন, নিয়ম সবার জন্য সমান। অন্যদিকে মমতার তরফে বইগুলি বিধানসভা ভবনের চেম্বারে থাকার কথা জানানো হয়েছে। ফলে এখন দেখার বিষয়, বইগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে লাইব্রেরিতে ফেরত দেখানো হয় কি না এবং এরপর কোনও প্রশাসনিক বা আইনি পদক্ষেপ বাস্তবে নেওয়া হয় কি না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই বিতর্কে অভিযোগ এবং প্রমাণ—দুটিকে আলাদা রাখা জরুরি। ১৯টি বই নিয়ে প্রশাসনিক প্রশ্ন উঠেছে, মন্ত্রী ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন; কিন্তু এখনই এটিকে প্রমাণিত ‘কেলেঙ্কারি’ বা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।

পরবর্তী পদক্ষেপেই স্পষ্ট হবে, এটি নিছক লাইব্রেরির রেকর্ড সংশোধনের বিষয়, নাকি এর পেছনে আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হতে চলেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments