Friday, August 28, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাটক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের অফিসে পুলিশি অভিযান, গ্যাস কাটার নিয়ে ধস্তাধস্তি! সরানো হল...

ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের অফিসে পুলিশি অভিযান, গ্যাস কাটার নিয়ে ধস্তাধস্তি! সরানো হল তৃণমূলের বিলবোর্ড

কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে বৃহস্পতিবার বিকেলে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসকে ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়াল। একটি তৃণমূলের বিলবোর্ড খুলতে কলকাতা পুরসভা ও কলকাতা পুলিশের যৌথ দল সেখানে পৌঁছতেই শুরু হয় তীব্র বচসা। পরে পরিস্থিতি ধস্তাধস্তি পর্যন্ত গড়ায়। শেষ পর্যন্ত পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যে ছাদে উঠে বিলবোর্ডের কাঠামোও খুলে ফেলে পুরকর্মীরা।

ঘটনার সময় অফিসে উপস্থিত ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দলের অন্য নেতাকর্মীরা। অভিষেকের অভিযোগ, তাঁকে কোনও বৈধ নির্দেশপত্র দেখানো হয়নি এবং পুলিশ জোর করে তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ঢোকার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে KMC ও পুলিশের দাবি, বিলবোর্ডটি অনুমতিহীন হওয়ায় নিয়ম মেনেই তা সরানোর পদক্ষেপ করা হয়েছে।

কেন অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে গেল KMC?

ঘটনার কেন্দ্র ছিল ৯ ক্যামাক স্ট্রিটের ভবনের ছাদে থাকা তৃণমূলের একটি বড় বিলবোর্ড। কলকাতা পুরসভার দাবি, সেটি প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া লাগানো হয়েছিল। কলকাতা পুলিশের তরফে অভিযোগ পাওয়ার পর KMC-র বিজ্ঞাপন ও বিল্ডিং বিভাগের আধিকারিকরা সেটি সরাতে যান। তাঁদের সঙ্গে ছিল গ্যাস কাটার-সহ একটি ডিমোলিশন টিম।

অর্থাৎ সরকারি সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য অভিযান ছিল না; বরং অনুমতিহীন কাঠামো সরানোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ।

নোটিশ নিয়ে আপত্তি অভিষেকের

পুরসভার আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছতেই তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন অভিষেক। তাঁর দাবি, যে নির্দেশপত্র দেখানো হয়েছিল, তাতে প্রয়োজনীয় বিবরণ ছিল না। বিশেষ করে মেমো নম্বর, স্বাক্ষর, সরকারি সিল এবং বিলবোর্ডের ছবি না থাকায় তিনি সেটিকে বৈধ নোটিশ হিসেবে মানতে আপত্তি জানান।

অভিষেক প্রশ্ন তোলেন, একটি ব্যক্তিগত কার্যালয়ে থাকা সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ড সরাতে গ্যাস কাটার নিয়ে আসার প্রয়োজন কেন হল। তাঁর অভিযোগ, ঘটনাটি নিছক পুরসভার নিয়ম প্রয়োগ নয়; এর পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।

তারপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি

নোটিশ নিয়ে কথা কাটাকাটির পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়। পুলিশ ও অভিষেকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী, অফিসকর্মী এবং তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে ধস্তাধস্তির অভিযোগ ওঠে। পুরসভা ও পুলিশের আধিকারিকদের ছাদে পৌঁছতে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।

ঘটনার সময় ডেরেক ও’ব্রায়েনও ধস্তাধস্তির মধ্যে পড়েন এবং সিঁড়িতে পড়ে যান। তৃণমূলের অভিযোগ, পুলিশি ধাক্কাতেই তিনি পড়ে যান। পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্যে আবার সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।

শেষ পর্যন্ত খুলেই ফেলা হল বিলবোর্ড

প্রথম দফায় পরিস্থিতির কারণে অভিযান থমকে গেলেও পরে বড় পুলিশবাহিনী ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ কর্মীরা অফিসের ভিতর দিয়ে ছাদের দিকে এগিয়ে যান। এরপর বিলবোর্ডের সামনে থাকা তৃণমূলের ব্যানার সরানোর পাশাপাশি লোহার কাঠামো ভাঙার কাজ শুরু হয়।

শেষ পর্যন্ত গ্যাস কাটার ব্যবহার করে ওই কাঠামো খুলে ফেলা হয়। কয়েকজন তৃণমূল কর্মী ও অফিসকর্মীকে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে আটক করা হয়েছে বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।

পুলিশের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ তুলল তৃণমূল?

তৃণমূলের বক্তব্য, পুরসভা ও পুলিশ কোনও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া না মেনেই অফিসে ঢুকেছে। দলের দাবি, অভিষেক ও ডেরেক ও’ব্রায়েন-সহ নেতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে এবং মহিলা নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গেও ধস্তাধস্তি হয়েছে।

অভিষেক পরে ফেসবুক লাইভে পুরো ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে অভিযোগ করেন এবং জানান, এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে যাওয়া হবে।

KMC ও পুলিশের বক্তব্য কী?

প্রশাসনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। KMC-র দাবি, বিলবোর্ডটি অনুমোদনহীন ছিল এবং সেই কারণেই সেটি সরানো হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, সরকারি আধিকারিকদের কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং সেই কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

অর্থাৎ ঘটনাটিতে দুই পক্ষের বয়ান একেবারেই বিপরীত—একদিকে ‘অবৈধ বিলবোর্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযান’, অন্যদিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত কার্যালয়ে হস্তক্ষেপ’।

‘নোটিশ’ নিয়ে বিতর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

এই ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নগুলির একটি হয়ে উঠেছে নোটিশের বৈধতা। অভিষেকের বক্তব্য, পুরসভার দেওয়া কাগজে প্রয়োজনীয় তথ্য ছিল না। আবার অন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, KMC-র দল একটি নোটিশ নিয়েই সেখানে গিয়েছিল। ফলে ঠিক কী ধরনের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং সেটি সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া পূরণ করেছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত নথিপত্র ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।

অভিষেকের হাইকোর্টে যাওয়ার বার্তা

অভিষেক ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হবেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁর আইনজীবী কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে জরুরি শুনানির কথা উল্লেখ করেন। আদালতের তরফে বিষয়টি শুক্রবার উল্লেখ করার সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে।

ফলে ক্যামাক স্ট্রিটের এই সংঘাত এখন কেবল পুরসভা বনাম একটি রাজনৈতিক দলের বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু

ঘটনার পর বিজেপির তরফে বলা হয়েছে, KMC যদি কোনও নির্মাণ বা বিলবোর্ডকে বেআইনি মনে করে, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী তা সরানো তাদের দায়িত্ব। বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার অভিষেকের কর্মীদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

অন্যদিকে তৃণমূল গোটা ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। দলীয় নেতাদের বক্তব্য, একই এলাকায় অন্য বিলবোর্ড থাকলেও সেগুলির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযান হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত হওয়া দরকার।

আসল লড়াই কোথায়?

ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনাটি তাই একসঙ্গে দুটি প্রশ্ন সামনে এনেছে।

প্রথমত, অনুমতিহীন বিলবোর্ড হলে সেটি সরানোর অধিকার পুরসভার রয়েছে কি না—তার উত্তর আইনি কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সেই ক্ষমতা প্রয়োগের সময় সংশ্লিষ্ট পক্ষকে কী ধরনের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন: একই নিয়ম কি সব বিলবোর্ডের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলির কোনওটিরই চূড়ান্ত উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।

এখন নজর আদালত ও তদন্তে

বিলবোর্ড শেষ পর্যন্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে বিতর্ক শেষ হয়নি, বরং আরও বড় হয়েছে। পুলিশি অভিযানে কারা বাধা দিয়েছিলেন, কোনও সরকারি কর্মী আক্রান্ত হয়েছেন কি না, নোটিশটি বৈধ ছিল কি না এবং বিলবোর্ডটি সত্যিই অনুমতিহীন ছিল কি না—এসবই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ফলে ক্যামাক স্ট্রিটের এই ঘটনাকে ঘিরে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপই অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, অভিযোগকে রায় হিসেবে না দেখে দুই পক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র আলাদা করে দেখা। কারণ বৃহস্পতিবারের ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে—একটি বিলবোর্ড নিয়েও কলকাতায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মুহূর্তের মধ্যে বড় রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments