Monday, August 31, 2026
Google search engine
Homeঅন্যান্যগঙ্গাজল কি সত্যিই নষ্ট হয় না? বোতলে বছরের পর বছর রেখেও কেন...

গঙ্গাজল কি সত্যিই নষ্ট হয় না? বোতলে বছরের পর বছর রেখেও কেন বদলায় না, জানাল বিজ্ঞান

সাধারণ জল কিছুদিন পাত্রে রেখে দিলে অনেক সময় গন্ধ, রং বা স্বাদে পরিবর্তন আসতে পারে। অথচ গঙ্গাজল দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে সংরক্ষণ করার রীতি রয়েছে, এবং বহু মানুষ মনে করেন, অনেক বছর পরেও এই জল সহজে পচে যায় না। এখান থেকেই প্রশ্ন—এটি কি শুধুই ধর্মীয় বিশ্বাস, নাকি এর পিছনে সত্যিই কোনও বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে?

উত্তরটা সরল নয়। গঙ্গার জলে এমন কিছু জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যাকটেরিওফেজের উপস্থিতি বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেছেন, যা নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে গঙ্গাজল কখনও দূষিত হয় না বা অনির্দিষ্টকাল বোতলে রাখলেও পানযোগ্য থাকে।

গঙ্গার জলে প্রথম এমন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছিলেন কে?

এই গল্পের সূত্রপাত প্রায় ১৩০ বছর আগে।

১৮৯৬ সালে ব্রিটিশ ব্যাকটেরিয়োলজিস্ট আর্নেস্ট হানকিন গঙ্গা ও যমুনার জলের মধ্যে কলেরার জীবাণু Vibrio cholerae-এর বিরুদ্ধে একটি ব্যাকটেরিয়ানাশী প্রভাব লক্ষ্য করেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, এই জলে এমন কোনও উপাদান রয়েছে যা পরীক্ষাগারে কলেরার জীবাণুর সংখ্যা কমাতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হানকিনের গবেষণা হয়েছিল ব্যাকটেরিওফেজ আবিষ্কারের প্রায় দুই দশক আগে। তাই তিনি তখন এই ঘটনাকে ‘বাকটেরিওফেজ’ বলে ব্যাখ্যা করেননি। পরবর্তী গবেষণার আলোকে সেই প্রাচীন পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ফেজ-নির্ভর ব্যাকটেরিয়ানাশী কার্যকলাপের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন—হানকিনের ফলাফলকে সরাসরি ব্যাকটেরিওফেজের চূড়ান্ত প্রমাণ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

ব্যাকটেরিওফেজ কী?

ব্যাকটেরিওফেজ হল এমন এক ধরনের ভাইরাস, যারা নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে সেই ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে।

অর্থাৎ নামের মধ্যেই রয়েছে তার কাজের ইঙ্গিত—‘bacteria eater’। প্রকৃতিতে নদী, হ্রদ, মাটি ও আরও নানা পরিবেশে এই ভাইরাসের উপস্থিতি দেখা যায়। গঙ্গার জলেও বিভিন্ন ব্যাকটেরিওফেজ শনাক্ত হয়েছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি metagenomic গবেষণায় গঙ্গার বিভিন্ন অংশে ব্যাকটেরিওফেজের বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি দেখায়, নদীর জলে বিভিন্ন ধরনের ফেজ রয়েছে এবং তারা নানা ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি করে।

তাহলে কি ফেজই গঙ্গাজলকে ‘অমর’ করে?

এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি তৈরি হয়।

গঙ্গায় ব্যাকটেরিওফেজ থাকলেও, শুধুমাত্র তাদের উপস্থিতি দিয়ে গঙ্গাজল কখনও নষ্ট হয় না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।

গঙ্গার জলও দূষিত হতে পারে। শিল্পবর্জ্য, নিকাশি, কৃষিজ দূষণ এবং মানবিক কার্যকলাপের কারণে নদীর জলের গুণমান বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণাতেও গঙ্গার জলে রোগজীবাণু এবং অন্যান্য দূষকের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ, ‘গঙ্গাজল নিজে থেকেই সব দূষণ পরিষ্কার করে ফেলে’—এমন বৈজ্ঞানিক দাবি করা ঠিক নয়।

তাহলে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা গঙ্গাজলে পরিবর্তন কম হওয়ার কারণ কী?

এটি একটি জটিল বিষয় এবং একাধিক পরিবেশগত কারণ এখানে ভূমিকা রাখতে পারে।

জলের মধ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়ার ধরন, তাদের খাদ্য বা পুষ্টির পরিমাণ, তাপমাত্রা, দ্রবীভূত অক্সিজেন, সূর্যালোক এবং অন্যান্য রাসায়নিক ও জৈবিক উপাদান—সবকিছুই জীবাণুর বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে।

গঙ্গার জলে ব্যাকটেরিওফেজের উপস্থিতি কিছু ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। ২০২০ সালের একটি গবেষণায় মহাকুম্ভের সময় গঙ্গার জলে ব্যাকটেরিওফেজের উপস্থিতি এবং ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির মধ্যে সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছিল। গবেষণার ফলাফল থেকে ইঙ্গিত মেলে যে ফেজগুলি কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এটিকে বোতলবন্দি গঙ্গাজল বছরের পর বছর নিরাপদ থাকার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

গঙ্গার জলে কি অন্য নদীর তুলনায় বেশি ব্যাকটেরিওফেজ থাকে?

কিছু গবেষণায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

২০২০ সালের একটি গবেষণায় মহাকুম্ভের সময় গঙ্গা ও যমুনার জলের মধ্যে ব্যাকটেরিওফেজের উপস্থিতি তুলনা করা হয়েছিল। সেখানে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে গঙ্গার জলে যমুনার তুলনায় বেশি ফেজ-কার্যকলাপ পাওয়া যায় বলে গবেষকরা জানান। তাঁদের মতে, এই ফেজগুলি ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে গঙ্গার জল সর্বত্র বা সর্বদাই জীবাণুমুক্ত। নদীর বিভিন্ন অংশের জলমান এক নয়।

‘১,০০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিওফেজ’—এই দাবিটি কতটা নিশ্চিত?

গঙ্গাজলে বিপুল বৈচিত্র্যের ব্যাকটেরিওফেজ রয়েছে—এটি গবেষণায় সমর্থিত। কিন্তু ‘ঠিক ১,০০০ প্রজাতি’ সংখ্যাটিকে গঙ্গার জলের একটি স্থির, সর্বজনীন বৈজ্ঞানিক হিসাব হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

কারণ নদীর বিভিন্ন জায়গা ও সময়ে ফেজের বৈচিত্র্য ও ঘনত্ব বদলাতে পারে। আধুনিক metagenomic গবেষণায় বহু ধরনের ফেজ শনাক্ত হলেও, তাদের সংখ্যা নির্দিষ্ট একটি ছোট অঙ্কে বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি গবেষণার পদ্ধতি ও নমুনার উপর নির্ভর করে।

‘অমরত্বের জল’ কথাটি কোথা থেকে এল?

গঙ্গার জল দীর্ঘদিন ভালো থাকে—এমন ধারণা ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে বহু পুরনো। গঙ্গার জলকে পবিত্র ও বিশেষ গুণসম্পন্ন মনে করার ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক সময়ে এর জীবাণুবিরোধী বৈশিষ্ট্যের বৈজ্ঞানিক আলোচনা অনেক সময় একসঙ্গে মিশে যায়।

তবে ঐতিহাসিকভাবে সম্রাট আকবর গঙ্গার জলকে ‘অমরত্বের জল’ বলতেন—এই জনপ্রিয় দাবিটির পক্ষে শক্তিশালী প্রাথমিক ঐতিহাসিক সূত্র না থাকায় সেটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে লেখা উচিত নয়।

অর্থাৎ সাংস্কৃতিক বিশ্বাস এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা—দুটি আলাদা বিষয়। দুটিকে এক করে দেখলে তথ্যের জায়গায় অতিরঞ্জন ঢুকে যায়।

গঙ্গার জল কি পান করার জন্য নিরাপদ?

এখানেও খুব স্পষ্ট থাকা দরকার—গঙ্গার জল মানেই নিরাপদ পানীয় জল নয়।

বিভিন্ন গবেষণায় গঙ্গার জলে pathogenic এবং zoonotic microorganisms-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নদীর দূষিত অংশে untreated wastewater, শিল্পবর্জ্য এবং অন্যান্য দূষণের প্রভাবও রয়েছে।

তাই গঙ্গাজলে কিছু প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া-নিয়ন্ত্রণকারী প্রক্রিয়া থাকলেও, সরাসরি নদী থেকে জল তুলে তা পান করা নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্ত বিজ্ঞান সমর্থন করে না।

তাহলে গঙ্গার ‘self-cleansing’ ক্ষমতা কোথায়?

গঙ্গাকে ঘিরে ‘self-cleansing’ বা স্ব-পরিশোধনের ধারণা নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। এর পিছনে কোনও একক কারণ নেই।

ব্যাকটেরিওফেজ একটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক উপাদান। তার সঙ্গে মিশে যায় নদীর প্রবাহ, সূর্যালোক, তাপমাত্রা, অক্সিজেন, পলি, অণুজীবের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অন্যান্য ভৌত-রাসায়নিক প্রক্রিয়া। ফলে গঙ্গার জল কোনও কোনও পরিস্থিতিতে কিছু দূষক ও ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে যে বিশেষভাবে আচরণ করে, তা একটি সমন্বিত ecological process হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

আধুনিক গবেষণা কি এখনও গঙ্গার এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করছে?

অবশ্যই।

২০২৫ সালের গবেষণাতেও গঙ্গার জল থেকে নতুন ব্যাকটেরিওফেজ শনাক্ত করা হয়েছে, যা কিছু রোগজীবাণু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে। এমন গবেষণা ভবিষ্যতে antibiotic-resistant bacteria মোকাবিলায় phage-based প্রযুক্তির সম্ভাবনা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ গঙ্গার ব্যাকটেরিওফেজ নিয়ে গবেষণা শুধু নদীর পবিত্রতা বা ঐতিহ্যের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এর সম্ভাব্য চিকিৎসা ও জীবাণুনিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবহার নিয়েও বিজ্ঞানীরা আগ্রহী।

আসল সত্যিটা তাহলে কী?

গঙ্গাজল ‘অমর’ নয়।
গঙ্গার জল কখনও দূষিত হয় না—এটিও সত্য নয়।

কিন্তু গঙ্গার জলে সত্যিই বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিওফেজ এবং অন্যান্য জৈবিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। ১৮৯৬ সালে হানকিনের গবেষণা থেকে শুরু করে আধুনিক metagenomic বিশ্লেষণ—এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এখনও চলছে।

তাই গঙ্গাজলের রহস্যকে এক কথায় ‘অলৌকিক’ বা ‘সম্পূর্ণ কুসংস্কার’—কোনও একটিতে ফেলে দেওয়া ঠিক হবে না। ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা আলাদা, আর বিজ্ঞানের জায়গা আলাদা; গঙ্গার জল নিয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সত্যটি হল, প্রকৃতির জটিল এক microbial ecosystem-এর মধ্যে এর কিছু সত্যিই বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments