দুর্গাপুজো মানেই বাংলায় একদিকে ধর্মীয় আচার, অন্যদিকে শিল্প, সৃজনশীলতা ও সর্বজনীন উৎসব। সেই পুজোর প্রস্তুতি যখন পুরোদমে চলছে, তখনই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা VHP-এর একগুচ্ছ পরামর্শ ও আপত্তি ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। থিম প্যান্ডেল, প্রতিমার রূপ, মণ্ডপের আশপাশে আমিষ খাবার বিক্রি এবং বিসর্জনের সময়—একাধিক বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে সংগঠনটি।
তবে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটিকে কোথাও ‘দুর্গাপুজোর ফতোয়া’ বলা হলেও, VHP-এর এই নির্দেশগুলির কোনও আইনগত বা প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা নেই। সংগঠনটি মূলত পুজো কমিটিগুলিকে নিজেদের পরামর্শ ও অবস্থান মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। VHP-এর কোনও বিধিবদ্ধ ক্ষমতা নেই যে তারা কোনও পুজো কমিটিকে আইন করে নির্দেশ মানতে বাধ্য করতে পারে।
কী নিয়ে আপত্তি VHP-এর?
২৬ অগস্ট আয়োজিত একটি বৈঠকে VHP দুর্গাপুজোর ‘ঐতিহ্য, পবিত্রতা ও ধর্মীয় মর্যাদা’ বজায় রাখার বিষয়ে একাধিক পরামর্শ দেয়। সংগঠনের বক্তব্য, আধুনিক থিম বা শিল্পভাবনার বিরোধিতা তাদের নেই। তবে থিমের নামে এমন উপকরণ বা প্রতিমার এমন উপস্থাপনা তারা মেনে নিতে রাজি নয়, যা তাদের মতে দেবীর মর্যাদা বা ধর্মীয় ভাবনার সঙ্গে অসঙ্গত।
অর্থাৎ, থিম পুজো বন্ধ করার কথা সরাসরি বলা হয়নি। বরং কী ধরনের থিম বা উপস্থাপনা ‘গ্রহণযোগ্য’, সেই সীমা নিয়ে নিজেদের আপত্তি জানিয়েছে সংগঠনটি।
ডিম, জুতো বা ভাঙা সামগ্রী দিয়ে থিমে আপত্তি কেন?
VHP-এর বক্তব্য অনুযায়ী, পুজোর সঙ্গে সম্পর্কহীন বা তাদের দৃষ্টিতে অশোভন উপকরণ দিয়ে থিম তৈরি করা উচিত নয়। ডিম, জুতো, ভাঙা চুড়ি কিংবা ছেঁড়া কাপড়ের মতো উপকরণ ব্যবহার করা থিমের ক্ষেত্রে তারা আপত্তি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের ঐতিহ্যবাহী মন্দিরের স্থাপত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে মণ্ডপ তৈরিতে তাদের আপত্তি নেই। অর্থাৎ সংগঠনটির অবস্থান পুরোপুরি ‘থিম-বিরোধী’ নয়; বরং থিমের বিষয়বস্তু ও উপকরণ নিয়ে তাদের ধর্মীয় আপত্তি রয়েছে।
দুর্গাপ্রতিমার ক্ষেত্রে কী বলছে VHP?
প্রতিমা নিয়েও VHP-এর বক্তব্য যথেষ্ট স্পষ্ট। তাদের পরামর্শ, দুর্গামূর্তির মধ্যে ‘মাতৃত্ব’ ও ‘শালীনতা’র ভাব বজায় থাকা উচিত।
কোনও থিমের প্রয়োজনে দুর্গাকে ‘বিধবা শাড়ি’ পরানো কিংবা তাঁর হাতে থাকা ঐতিহ্যগত অস্ত্র সরিয়ে অন্য কোনও বস্তু বসানোর মতো উপস্থাপনার বিরোধিতা করেছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, আধুনিক শিল্পচিন্তা থাকতে পারে, কিন্তু দেবীর মূল ধর্মীয় পরিচয়কে বিকৃত করা উচিত নয়।
এখানেই শিল্পী স্বাধীনতা বনাম ধর্মীয় সংবেদনশীলতার পুরনো বিতর্কটি নতুন করে সামনে এসেছে।
মণ্ডপের পাশে আমিষ খাবারও নয়?
VHP-এর সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রস্তাবগুলির একটি হল পুজোমণ্ডপের আশপাশে আমিষ খাবার বিক্রি ও খাওয়ার ব্যবস্থা না রাখা।
তবে সংগঠনটি একইসঙ্গে স্পষ্ট করেছে, তারা বাংলার দুর্গাপুজোকে সম্পূর্ণ নিরামিষ উৎসবে পরিণত করার দাবি করছে না। বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে আমিষের ঐতিহাসিক উপস্থিতি তারা অস্বীকার করছে না। তাদের প্রস্তাব, আমিষ খাবার বিক্রি করতে হলে তা মণ্ডপ থেকে দূরে নির্দিষ্ট জায়গায় করা হোক, যাতে খাবারের উচ্ছিষ্ট দেবীর মণ্ডপের আশপাশে না আসে এবং পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে।
অর্থাৎ ‘বঙ্গে আমিষ খাওয়া বন্ধ’—VHP এমন কথা বলেনি। তাদের আপত্তি মূলত মণ্ডপের তাত্ক্ষণিক পরিসর নিয়ে।
দশমীতেই বিসর্জনের পরামর্শ
বিসর্জনের সময় নিয়েও VHP-এর অবস্থান রয়েছে। বহু পুজো কমিটি দশমীর পরও একদিন বা তার বেশি সময় প্রতিমা দর্শনের জন্য রেখে দেয়। সংগঠনটি এই রীতির বিরোধিতা করে দশমীতেই বিসর্জন করার পক্ষে মত দিয়েছে। তাদের যুক্তি, দশমীর ধর্মীয় তাৎপর্য বজায় রাখা উচিত।
এখানে আবার বাস্তবতার প্রশ্নও রয়েছে। কলকাতার বহু প্রতিষ্ঠিত পুজোয় প্রতিমা কিছুটা পরে বিসর্জন দেওয়ার রীতি রয়েছে এবং দর্শকদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে এমন ব্যবস্থা করা হয়। ফলে VHP-এর প্রস্তাব বাস্তবে কতটা গ্রহণ করবেন পুজো উদ্যোক্তারা, সেটাই দেখার।
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগান নিয়েও আপত্তি
দুর্গাপুজো নিয়ে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিতর্কের আরও একটি জায়গা হল ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এই বহুল ব্যবহৃত ধারণা।
VHP এই স্লোগানটির বিরোধিতা করে বলেছে, হিন্দু ধর্মীয় উৎসবের ধর্মীয় রীতি ও আবেগ রক্ষার দায়িত্ব হিন্দুদেরই। তাঁদের বক্তব্য, অন্য ধর্মের উৎসবকে যেমন সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মীয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে পালন করে, তেমনই হিন্দুদেরও নিজেদের ধর্মীয় রীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
এই বক্তব্যটি অবশ্যই বাংলার দুর্গাপুজোর দীর্ঘদিনের সর্বজনীন চরিত্র নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
VHP কি পুজো বন্ধ করাতে পারবে?
আইনগতভাবে বিষয়টি অনেক বেশি স্পষ্ট। VHP-এর এমন কোনও statutory authority নেই, যার ভিত্তিতে তারা নিজেরা কোনও পুজো কমিটিকে বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিতে পারে। India Today-র বিশ্লেষণেও এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিতর্ক তৈরি হয়েছে অন্য জায়গায়। VHP-এর এক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কোনও পুজো কমিটি তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ‘সংশোধন’ না করলে সংগঠন ‘intervene’ করতে পারে। কিন্তু সেই ‘হস্তক্ষেপ’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে—প্রশাসনের কাছে যাওয়া, প্রকাশ্যে প্রতিবাদ, নাকি অন্য কোনও পদক্ষেপ—তা স্পষ্ট করা হয়নি।
এই অস্পষ্টতাই পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি অনেকটা এগিয়ে
বিতর্কের আরেকটি কারণ সময়। দুর্গাপুজো এখনও কিছুটা দূরে থাকলেও কলকাতার বহু বড় পুজোর প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। India Today-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু পুজো কমিটি নিজেদের কাজের প্রায় ৪০ শতাংশ শেষ করে ফেলেছে এবং বড় পুজোগুলির বাজেটও উল্লেখযোগ্য।
এই অবস্থায় কোনও প্রতিমা বা প্যান্ডেলের থিম পরিবর্তন করতে হলে উদ্যোক্তাদের জন্য তা আর শুধু মতাদর্শগত প্রশ্ন থাকে না; তার সঙ্গে যুক্ত হয় সময়, অর্থ এবং শ্রমের বিষয়ও।
শিল্পীর স্বাধীনতা বনাম ধর্মীয় সংবেদনশীলতা
বাংলার থিম পুজো বহু বছর ধরে সামাজিক সমস্যা, ইতিহাস, শিল্প, প্রযুক্তি এমনকি আন্তর্জাতিক ঘটনাকেও মণ্ডপের ভাষায় তুলে ধরেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতেও কলকাতায় AI, পরিবেশ, ইতিহাস ও নানা সমসাময়িক বিষয়কে কেন্দ্র করে থিম হয়েছে।
তাই VHP-এর বক্তব্যের পর মূল প্রশ্নটি দাঁড়াচ্ছে—দেবী ও ধর্মীয় প্রতীকের ক্ষেত্রে শিল্পীর স্বাধীনতার সীমা কোথায়?
এক পক্ষ বলছে, ধর্মীয় প্রতীকের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা জরুরি। অন্য পক্ষের বক্তব্য, থিম পুজো শিল্পের একটি আলাদা ভাষা; সেখানে প্রতীকী উপস্থাপনাকে ‘অপবিত্রতা’ হিসেবে দেখলে সৃজনশীলতার জায়গা সংকুচিত হতে পারে।
এই বিতর্কের কোনও একলাইন উত্তর নেই।
সাধারণ বাঙালির কাছে আসল প্রশ্ন
দুর্গাপুজো বাংলায় শুধু পাঁচ দিনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অর্থনীতি, মৃৎশিল্প, আলো, প্রতিমা নির্মাণ, প্যান্ডেল শিল্প, খাবার এবং লাখ লাখ মানুষের সামাজিক মেলামেশা।
তাই পুজোর ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই উৎসবের শিল্পীসত্তা ও সামাজিক পরিসর নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। VHP-এর পরামর্শ বাস্তবে কতটা গ্রহণ করা হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে পুজো কমিটি, পুরোহিত, শিল্পী এবং প্রশাসনিক কাঠামোর উপর।
এক নজরে VHP-এর মূল প্রস্তাব
থিম প্যান্ডেল: পুরোপুরি নিষেধ নয়, তবে ধর্মীয় ভাবনার সঙ্গে অসঙ্গত উপকরণ এড়ানোর পরামর্শ।
প্রতিমা: শালীনতা ও মাতৃত্বের ভাব বজায় রাখার কথা; ‘বিকৃত’ বা প্রচলিত ধর্মীয় চিহ্নবিহীন উপস্থাপনায় আপত্তি।
আমিষ খাবার: পুরো বাংলায় নিষেধ নয়; মণ্ডপের কাছাকাছি বিক্রি না করে নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখার প্রস্তাব।
বিসর্জন: দশমীতেই করার পক্ষে মত।
সর্বজনীনতার ধারণা: ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগামের বিরোধিতা।
আইনি ক্ষমতা: VHP-এর কোনও statutory authority নেই; এগুলি মূলত তাদের পরামর্শ ও অবস্থান।
সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজো নিয়ে VHP-এর বক্তব্যকে আইনগত ‘ফতোয়া’ বলা ঠিক হবে না। এটি একটি প্রভাবশালী ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক সংগঠনের দেওয়া নির্দেশিকা বা পরামর্শ। কিন্তু ‘intervene’ করার হুঁশিয়ারি এবং প্রতিমা, থিম ও খাদ্য নিয়ে তাদের অবস্থান যে বাংলার পুজো সংস্কৃতি নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি করেছে, সেটি স্পষ্ট। সামনে এখন দেখার—পুজো উদ্যোক্তারা কতটা এই প্রস্তাব মানেন, আর কোথায় শুরু হয় ধর্মীয় রীতি ও শিল্পী স্বাধীনতার সীমারেখা নিয়ে নতুন সংঘাত।



