পুজোর বাজার শুরুর আগেই দেশের ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য সামনে এসেছে বড়সড় সতর্কবার্তা। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ একাধিক দিন দেশব্যাপী ব্যাংক ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে United Forum of Bank Unions (UFBU)। এর ফলে বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকের শাখায় টাকা জমা, নগদ তোলা, চেক সংক্রান্ত কাজ এবং অন্যান্য কাউন্টার পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে।
তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরতে থাকা ‘টানা চার দিন সমস্ত ব্যাংক ও ATM পুরোপুরি বন্ধ’—এই দাবিকে সরাসরি সত্যি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ধর্মঘটের দিনগুলির সঙ্গে সাপ্তাহিক ও স্থানীয় ছুটি মিলে কিছু এলাকায় টানা কয়েকদিন শাখা বন্ধ বা পরিষেবা সীমিত থাকতে পারে, কিন্তু ATM, UPI বা ইন্টারনেট ব্যাংকিং সব জায়গায় একইভাবে বন্ধ থাকবে—এমন কোনও ঘোষণা নেই।
সেপ্টেম্বরের কোন কোন দিনে ধর্মঘট?
UFBU-এর ২৩ অগস্ট ২০২৬-এর কর্মসূচি অনুযায়ী সেপ্টেম্বর মাসে দু’টি ধাপে দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে।
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার একদিনের সর্বভারতীয় ধর্মঘট হবে।
এর পরে ২৮, ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর টানা তিন দিনের ধর্মঘটের কর্মসূচি রয়েছে।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই মোট চারটি নির্ধারিত ধর্মঘটের দিন রয়েছে।
১১ সেপ্টেম্বরের পর টানা কয়েকদিন ব্যাংক বন্ধ কেন?
১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ধর্মঘট। তার পরের ১২ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় শনিবার এবং ১৩ সেপ্টেম্বর রবিবার, দু’দিনই নিয়মিত ব্যাংক ছুটি। ফলে ধর্মঘট এবং সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে অনেক জায়গায় শাখাভিত্তিক পরিষেবা টানা তিনদিন ব্যাহত হতে পারে।
এর পাশাপাশি ১৪ সেপ্টেম্বর কিছু রাজ্যে গণেশ চতুর্থীর ছুটি রয়েছে। কিন্তু এই ছুটি সর্বভারতীয় নয়; রাজ্যভেদে ব্যাংক বন্ধের ক্যালেন্ডার আলাদা হয়। তাই ‘দেশের সব ব্যাংক ১১ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর বন্ধ’ বলা সঠিক নয়।
মাসের শেষে আরও বড় সমস্যা হতে পারে?
হ্যাঁ, ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের তিন দিনের ধর্মঘটের কর্মসূচি রয়েছে। এই সময়ের আশপাশে মাসিক হিসাব বন্ধ এবং আর্থিক বছরের নিয়মিত কার্যক্রমের কারণে শাখায় গ্রাহকের চাপও বাড়তে পারে। ফলে কাউন্টার পরিষেবা ব্যাহত হলে ব্যবসায়ী, সংস্থা এবং সাধারণ গ্রাহকদের সমস্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে শেষ মুহূর্তে বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, চেক জমা বা ব্যাংক শাখায় গিয়ে কোনও কাজ সারতে হলে আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখা সুবিধাজনক।
কেন ধর্মঘটের ডাক?
ব্যাংক কর্মী ও অফিসারদের সংগঠনগুলির প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যাংক খোলা রাখা, অর্থাৎ শনিবার-রবিবার পূর্ণ ছুটির ব্যবস্থা কার্যকর করা।
এর পাশাপাশি নতুন Performance Linked Incentive বা PLI ব্যবস্থার কিছু বিষয় নিয়েও আপত্তি রয়েছে। কর্মী সংগঠনগুলির অভিযোগ, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কর্মীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। পেনশন সংক্রান্ত বিভিন্ন পুরনো দাবিও ধর্মঘটের কর্মসূচির অংশ।
অর্থাৎ আন্দোলনটি শুধু পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহ নিয়ে নয়; এর সঙ্গে বেতন, incentive এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের বিভিন্ন দাবিও যুক্ত রয়েছে।
কোন ব্যাংকগুলিতে প্রভাব পড়তে পারে?
UFBU-র কর্মসূচি মূলত বিভিন্ন বড় ব্যাংক কর্মী ও অফিসার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত বা public sector bank-এর শাখাগুলিতে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। SBI, Punjab National Bank, Bank of Baroda-সহ সরকারি ব্যাংকের শাখায় কাউন্টার পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে।
অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মীরা এই একই ধর্মঘটে অংশ নেবেন—এমন কোনও সাধারণ ঘোষণা নেই। তাই বেসরকারি ব্যাংকের পরিষেবাকে সরকারি ব্যাংকের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
ATM কি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে?
এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি রয়েছে।
ব্যাংক ধর্মঘট মানেই সব ATM বন্ধ—এমন নয়। ATM পরিষেবা শাখা খোলার উপর সরাসরি নির্ভর করে না। তবে টানা ছুটি বা ধর্মঘটের সময়ে কিছু ATM-এ নগদের জোগান বা রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যা হলে সাময়িক পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে।
একইভাবে UPI, mobile banking, internet banking-এর মতো ডিজিটাল পরিষেবা সাধারণত শাখা ধর্মঘটের কারণে সরাসরি বন্ধ হয়ে যায় না। তবে নির্দিষ্ট কোনও ব্যাংকের প্রযুক্তিগত সমস্যা হলে আলাদা বিষয়।
অক্টোবর থেকে কি অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট?
সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি সফল না হলে আন্দোলন আরও বড় আকার নিতে পারে বলে UFBU জানিয়েছে। বর্তমান কর্মসূচি অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি রয়েছে। তবে সেটি শর্তসাপেক্ষ—সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে আলোচনায় সমাধান হলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
অর্থাৎ অক্টোবরের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটকে এখনই নিশ্চিত ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
সাধারণ গ্রাহকদের কী করা উচিত?
যাঁদের ব্যাংক শাখায় গিয়ে জরুরি কাজ রয়েছে, তাঁরা ১১ সেপ্টেম্বর এবং ২৮–৩০ সেপ্টেম্বরের তারিখগুলি মাথায় রেখে আগেভাগেই কাজ সেরে নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে চেক ক্লিয়ারেন্স, নগদ লেনদেন, ডিমান্ড ড্রাফট, নথি জমা বা শাখাভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করাই নিরাপদ। একইসঙ্গে জরুরি সময়ে ডিজিটাল ব্যাংকিং পরিষেবার বিকল্প রাখাও সুবিধাজনক।
সেপ্টেম্বর ২০২৬ ব্যাংক ধর্মঘট: এক নজরে
১১ সেপ্টেম্বর: দেশব্যাপী একদিনের ধর্মঘট
১২ সেপ্টেম্বর: দ্বিতীয় শনিবারের নিয়মিত ছুটি
১৩ সেপ্টেম্বর: রবিবার
১৪ সেপ্টেম্বর: কিছু রাজ্যে গণেশ চতুর্থীর ছুটি
২৮–৩০ সেপ্টেম্বর: তিন দিনের দেশব্যাপী ধর্মঘট
২৬ অক্টোবর থেকে: দাবি পূরণ না হলে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি
সব মিলিয়ে, সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংক পরিষেবা নিয়ে সত্যিই সতর্ক থাকার কারণ রয়েছে। তবে ‘চার দিন সমস্ত ব্যাংক এবং ATM সম্পূর্ণ বন্ধ’—এমন সরল দাবি না করে ধর্মঘট, সাপ্তাহিক ছুটি এবং রাজ্যভিত্তিক ব্যাংক ছুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
আর পুজোর কেনাকাটা বা জরুরি ব্যাংকিং কাজ থাকলে সেপ্টেম্বরের এই তারিখগুলি এখনই ক্যালেন্ডারে চিহ্নিত করে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।



