মা নিজের উপার্জন করেন বলেই সন্তানের ভরণপোষণের আর্থিক দায় থেকে বাবার দায়িত্ব কমে যাবে—এমন কোনও সরল হিসাব করা যায় না। সন্তানের প্রয়োজন, বাবা-মায়ের আর্থিক সামর্থ্য এবং সন্তানের দৈনন্দিন দেখভালের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সম্প্রতি এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ দুই নাবালিকা কন্যার অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশের পরিমাণ ফের ৬০ হাজার টাকা করে দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, মা উপার্জন করেন—শুধু এই কারণ দেখিয়ে বাবার দায় অর্ধেক করে দেওয়া যায় না।
কী নিয়ে শুরু হয়েছিল মামলা?
এই মামলায় স্বামী-স্ত্রী দুজনেই পেশায় চিকিৎসক। ২০০৬ সালে তাঁদের বিয়ে হয় এবং তাঁদের দুই নাবালিকা কন্যাসন্তান রয়েছে।
দাম্পত্য সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হওয়ার পর স্ত্রী দুই মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন। এরপর সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি।
ফ্যামিলি কোর্ট দুই মেয়ের জন্য মাসে ৩০ হাজার টাকা করে, মোট ৬০ হাজার টাকা অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
কেন খোরপোশ কমিয়েছিল হাইকোর্ট?
পরবর্তীতে মামলাটি এলাহাবাদ হাইকোর্টে যায়। সেখানে দেখা যায়, মা নিজেও চিকিৎসক এবং তাঁর মাসিক আয় প্রায় ১.৫ লক্ষ টাকা।
এই বিষয়টি বিবেচনা করে হাইকোর্ট বাবার দেওয়া খোরপোশের পরিমাণ অর্ধেক করে দেয়। অর্থাৎ, দুই মেয়ের জন্য ৩০ হাজার টাকা—প্রতি সন্তানের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু এই যুক্তিই শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট গ্রহণ করেনি।
সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, মা উপার্জন করছেন—এটা একাই বাবার আর্থিক দায় কমিয়ে দেওয়ার যথেষ্ট কারণ নয়।
আদালতের মতে, সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব অবশ্যই বাবা-মা দুজনের। কিন্তু সেই দায়িত্বকে শুধুমাত্র অঙ্ক কষে ৫০-৫০ ভাগে ভাগ করা যায় না।
কারণ, দুই সন্তান মায়ের সঙ্গে থাকছে এবং চাকরি করার পাশাপাশি তিনিই তাঁদের প্রতিদিনের প্রয়োজন, দেখভাল ও লালন-পালনের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এই যত্নকে টাকার অঙ্কে মাপা সম্ভব নয়।
মায়ের দায়িত্ব তাহলে কী?
এখানেই এই রায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট মাকে সন্তানের আর্থিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত করেনি, আবার বাবাকেও এককভাবে সব দায়িত্ব নিতে বলেছে—এমন কোনও সাধারণ নিয়মও তৈরি করেনি।
বরং আদালত বলেছে, সন্তানকে মানুষ করার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের দায়িত্ব সামগ্রিকভাবে বিচার করতে হবে। কে কত উপার্জন করেন, কে সন্তানের সঙ্গে থাকেন, দৈনন্দিন যত্ন কে করেন এবং সন্তানের শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন কতটা—সবকিছু বিবেচনা করেই খোরপোশ নির্ধারণ করতে হবে।
অর্থাৎ, এই রায়কে ‘মা চাকরি করলেও বাবাকেই সব টাকা দিতে হবে’—এমন সার্বজনীন নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বাবার আয়ও বিবেচনায় নিয়েছে আদালত
এই মামলায় আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী নিজেই জানিয়েছেন, তাঁর মাসিক আয় প্রায় ২ লক্ষ টাকা।
সুপ্রিম কোর্টের মতে, এই আর্থিক পরিস্থিতিতে স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়ের জন্য মাসে ৬০ হাজার টাকা খুব বেশি নয়। তাঁদের পড়াশোনা, লালন-পালন এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
ফলে হাইকোর্টের কমিয়ে দেওয়া খোরপোশ বাতিল করে ফ্যামিলি কোর্টের মাসে ৬০ হাজার টাকার নির্দেশই পুনর্বহাল করেছে শীর্ষ আদালত।
তবে এটি কি চূড়ান্ত খোরপোশের রায়?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তটি অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশ নিয়ে। মূল মামলাটি এখনও ফ্যামিলি কোর্টে বিচারাধীন। তাই ভবিষ্যতে মূল মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আলাদাভাবে হতে পারে।
আদালত বাবাকে আগের কমিয়ে দেওয়া সময়ের কারণে যে বকেয়া অর্থ তৈরি হয়েছে, তা তিন মাসের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশও দিয়েছে।
কেন এই রায় গুরুত্বপূর্ণ?
এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—সন্তানের ভরণপোষণকে শুধুমাত্র বাবা-মায়ের বেতনের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যায় না।
একজন কর্মরত মা একইসঙ্গে চাকরি এবং সন্তানের দৈনন্দিন যত্নের দায়িত্ব সামলাতে পারেন। সেই অদৃশ্য শ্রমেরও মূল্য রয়েছে। তাই শুধু মায়ের আয় রয়েছে বলে বাবার দায়িত্ব অর্ধেক করে দেওয়ার যুক্তি সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
তবে এই রায় থেকে এমন কোনও ধারণা নেওয়ার সুযোগ নেই যে প্রতিটি মামলায় কর্মরত মা থাকলেও বাবাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতেই হবে। খোরপোশের অঙ্ক নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পরিবারের পরিস্থিতি, সন্তানের প্রয়োজন, বাবা-মায়ের আয় ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের উপর।
মূল বার্তাটা তাই একটাই—সন্তানের অধিকার ও কল্যাণই বিচার করার কেন্দ্রে থাকবে; বাবা-মায়ের আয়কে শুধু একটি গাণিতিক সূত্রে ভাগ করে দায়িত্ব নির্ধারণ করা যাবে না।



