Sunday, September 20, 2026
Google search engine
Homeআন্তর্জাতিকপাকিস্তানে বাড়ছে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা! গম-চাল-মাংসের ব্যবহার কমেছে, কী বলছে সরকারি রিপোর্ট?

পাকিস্তানে বাড়ছে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা! গম-চাল-মাংসের ব্যবহার কমেছে, কী বলছে সরকারি রিপোর্ট?

দাম বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না মানুষের আয়। ফলটা ধরা পড়ছে এবার পাকিস্তানের খাবারের থালাতেই। পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্সের Household Integrated Economic Survey (HIES) 2024-25-এর তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে দেশের একটি বড় অংশের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করা আরও কঠিন হয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ সালে পাকিস্তানের ১৫.৯২ শতাংশ পরিবার মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। ২০২৪-২৫ সালে সেই হার বেড়ে হয়েছে ২৪.৩৫ শতাংশ। একই সময়ে ‘তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা’র হারও ২.৩৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.০৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু খাবারের দাম বাড়ার নয়; বহু পরিবারের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত এবং পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত জোগাড় করার সক্ষমতাও কমেছে।

খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বলতে কী বোঝায়?

‘Food insecurity’ মানেই যে একটি পরিবার পুরোপুরি না খেয়ে থাকছে, এমন নয়।

জাতিসংঘের Food Insecurity Experience Scale বা FIES-ভিত্তিক এই সূচক মূলত দেখে, কোনও পরিবারের সদস্যরা পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা হারাচ্ছেন কি না, খাবারের পরিমাণ বা বৈচিত্র্য কমাতে হচ্ছে কি না, কিংবা অর্থের অভাবে পছন্দমতো পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে কি না।

তাই পাকিস্তানে ২৪.৩৫ শতাংশ পরিবারের moderate বা severe food insecurity থাকার অর্থ হল, এসব পরিবারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খাদ্যের নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ততার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি। এটি সরাসরি ‘দেশে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে’—এমন ঘোষণা নয়।

ছয় বছরে পরিস্থিতি কতটা বদলেছে?

২০১৮-১৯ এবং ২০২৪-২৫—এই দুই সমীক্ষার তুলনা করলে পরিবর্তনটি বেশ স্পষ্ট।

মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা:
২০১৮-১৯ → ১৫.৯২%
২০২৪-২৫ → ২৪.৩৫%

তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা:
২০১৮-১৯ → ২.৩৭%
২০২৪-২৫ → ৫.০৪%

অর্থাৎ, ছয় বছরের ব্যবধানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সামগ্রিক হার প্রায় ৮.৪৩ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। আর severe category-র হার দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

শহরের তুলনায় গ্রামে কি সমস্যা বেশি?

সরকারি তথ্য বলছে, দুই ক্ষেত্রেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে।

গ্রামীণ পরিবারে moderate বা severe food insecurity-এর হার ১৯.৯৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৬.৭২ শতাংশ হয়েছে। শহরে তা ৯.২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০.৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

অর্থাৎ গ্রাম এখনও তুলনামূলকভাবে বেশি food insecurity-র মুখোমুখি হলেও, শহরেও গত কয়েক বছরে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

আর severe food insecurity-র ক্ষেত্রে ২০২৪-২৫ সালে শহরের হার ৫.১২ শতাংশ, গ্রামে ৪.৯৯ শতাংশ। অর্থাৎ এই নির্দিষ্ট সূচকে শহর ও গ্রামের ব্যবধানও খুব বড় নয়।

কোন প্রদেশে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ?

পাকিস্তানের সব অঞ্চলের পরিস্থিতি একরকম নয়।

২০২৪-২৫ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বালোচিস্তানে moderate বা severe food insecurity-র হার সবচেয়ে বেশি—৩০.২৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে সিন্ধে ২৯.৪২ শতাংশ। পাঞ্জাবে এই হার ২২.৫৮ শতাংশ এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় ২১.৫৪ শতাংশ।

Severe food insecurity-র ক্ষেত্রেও বালোচিস্তান সবচেয়ে বেশি—৮.২০ শতাংশ। সিন্ধে তা ৬.৩০ শতাংশ এবং পাঞ্জাবে ৫.২০ শতাংশ।

অর্থাৎ পাকিস্তানের খাদ্য সংকটের চাপ সর্বত্র সমানভাবে ছড়ায়নি; কিছু প্রদেশে সমস্যা অনেক বেশি তীব্র।

কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে?

সরকারি HIES রিপোর্টটি মূলত পরিস্থিতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে; ‘খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়ার একমাত্র কারণ’ হিসেবে কোনও একটি বিষয়কে চিহ্নিত করে না। তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট—খাবারের দাম এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সম্পর্ক

বাজারে খাবার থাকলেও কোনও পরিবারের আয় যদি সেই খাবার কেনার মতো না থাকে, তাহলে বাস্তবে food security কমে যায়। আর খাদ্যতালিকায় সবচেয়ে আগে চাপ পড়ে তুলনামূলক ব্যয়বহুল পুষ্টিকর খাবারে।

মাংস, দুধ, ডিম, মাছ বা বিভিন্ন শাকসবজির দাম তুলনামূলক বেশি হলে নিম্নআয়ের পরিবার সেগুলির ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারে। তখন পেট ভরানোর জন্য তুলনামূলক সস্তা ক্যালোরির উৎসের উপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।

বনস্পতি ঘিরে যে পরিবর্তন, তার অর্থ কী?

আপনার দেওয়া স্ক্রিপ্টে বনস্পতির পারিবারিক ব্যবহার বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই নির্দিষ্ট পরিবর্তনটি নিয়ে HIES 2024-25-এর সংশ্লিষ্ট household consumption table দেখে আলাদা করে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে একটি বিষয় অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ—যদি নিম্নআয়ের পরিবার পুষ্টিকর প্রোটিনের পরিবর্তে তুলনামূলক সস্তা উচ্চ-ক্যালোরি খাবারের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে ক্যালোরি পাওয়া গেলেও খাদ্যতালিকার পুষ্টিগত বৈচিত্র্য কমতে পারে

অর্থাৎ ‘পেট ভরেছে’ আর ‘পুষ্টি নিশ্চিত হয়েছে’—এই দুটি এক জিনিস নয়।

খাদ্য কমার অর্থ কি মানুষ না খেয়ে থাকছে?

অবশ্যই এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না।

কোনও পরিবারের নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্যের consumption কমে যাওয়ার পেছনে দাম, খাদ্যাভ্যাস, বাজারের প্রাপ্যতা, আয়, মৌসুমি পরিবর্তন—বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।

তবে food insecurity সূচকের এত বড় বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। এর অর্থ, বহু পরিবারের খাদ্য কেনার সক্ষমতা এবং খাদ্যের নিরাপত্তা আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।

পাকিস্তান কি ‘দেউলিয়া’ হয়ে যাচ্ছে?

এখানে আরেকটি অতিরঞ্জন এড়ানো জরুরি।

খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে মানেই পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে—এমন কোনও সিদ্ধান্ত PBS-এর এই রিপোর্টে নেই।

‘Bankruptcy’, ‘sovereign default’ এবং ‘food insecurity’ তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচক। একটি দেশের পরিবারগুলির খাদ্য সংকটের মাত্রা বেড়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে গুরুতর সমস্যা, কিন্তু তা দিয়ে রাষ্ট্রের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও সমস্যা কেন?

পাকিস্তানের কৃষিখাত দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও কৃষি উৎপাদন থাকা আর প্রত্যেক পরিবারের খাদ্য ক্রয়ক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়

কোনও দেশে গম বা অন্যান্য ফসল উৎপাদিত হলেও, পরিবহণ খরচ, বাজারদর, সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি-নির্ভরতা, সংরক্ষণ এবং পরিবারের আয়—সবকিছু খাদ্যের শেষ খুচরো দামে প্রভাব ফেলে।

তাই কৃষিপ্রধান দেশের ক্ষেত্রেও food insecurity থাকতে পারে। পাকিস্তানের বর্তমান তথ্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনছে।

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

PBS-এর HIES 2024-25 রিপোর্টের সংখ্যাগুলি দেখাচ্ছে, পাকিস্তানের খাদ্য সমস্যাকে শুধু ‘খাবার আছে কি না’ দিয়ে বিচার করলে ছবিটা অসম্পূর্ণ হবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—সাধারণ পরিবার সেই খাবার নিয়মিত কিনতে পারছে কি না, খাবারের বৈচিত্র্য বজায় রাখতে পারছে কি না এবং দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কি না।

বিশেষ করে বালোচিস্তান ও সিন্ধের মতো প্রদেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার জাতীয় গড়ের থেকেও বেশি। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে আঞ্চলিক বৈষম্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এক নজরে পাকিস্তানের খাদ্য নিরাপত্তা

২০১৮-১৯ moderate/severe food insecurity: ১৫.৯২%
২০২৪-২৫: ২৪.৩৫%
২০১৮-১৯ severe: ২.৩৭%
২০২৪-২৫ severe: ৫.০৪%
২০২৪-২৫ গ্রামীণ moderate/severe: ২৬.৭২%
২০২৪-২৫ শহুরে moderate/severe: ২০.৫৮%
সবচেয়ে বেশি moderate/severe: বালোচিস্তান, ৩০.২৬%

সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের সামনে যে খাদ্যসংকটের চাপ বাড়ছে, তা এখন আর শুধু বাজারদরের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশের সরকারি সমীক্ষাই দেখাচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার ছয় বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এটিকে সরাসরি ‘দুর্ভিক্ষ’ বা ‘রাষ্ট্র দেউলিয়া’ বলে ব্যাখ্যা করা অতিরঞ্জিত হবে, কিন্তু সাধারণ পরিবারের খাবার জোগাড়ের সক্ষমতা যে চাপের মধ্যে রয়েছে—সরকারি পরিসংখ্যান সেই উদ্বেগ যথেষ্ট স্পষ্ট করে দিচ্ছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments