Sunday, September 20, 2026
Google search engine
Homeদেশের কথাফারাক্কার ১০৯ গেট খোলা, বাংলাদেশে বাড়ছে পদ্মার জল! বড় বন্যার আশঙ্কা কতটা?

ফারাক্কার ১০৯ গেট খোলা, বাংলাদেশে বাড়ছে পদ্মার জল! বড় বন্যার আশঙ্কা কতটা?

ফারাক্কা ব্যারেজের সবকটি গেট খুলে দেওয়ার পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। উজান থেকে নেমে আসা বিপুল জলধারার প্রভাবে পদ্মার জলস্তর দ্রুত বেড়েছে। ইতিমধ্যেই রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুষ্টিয়ার একাধিক নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

তবে কি এবার বড়সড় বন্যার মুখে পড়তে চলেছে পদ্মাপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা? ১০৯টি গেট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তই বা কেন নেওয়া হল? আর ফারাক্কা দিয়ে ঠিক কতটা জল বাংলাদেশে ঢুকছে?

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখলে ছবিটা যেমন উদ্বেগের, তেমনই সব জায়গায় পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গিয়েছে—এমনটা বলার মতো তথ্যও এখনও নেই।

কেন ফারাক্কার সব গেট খুলে দেওয়া হল?

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে ফারাক্কা ব্যারেজের ১০৯টি গেটই খোলা হয়েছে। এর পিছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে গঙ্গার উজানে বিপুল জলপ্রবাহ এবং বন্যার চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তা।

ফারাক্কা ব্যারেজের জেনারেল ম্যানেজার আর ডি দেশপাণ্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, উজান থেকে প্রচুর জল নেমে আসায় ব্যারেজের জলস্তর দ্রুত বেড়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডাউনস্ট্রিমে জল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অর্থাৎ, বিষয়টিকে শুধুমাত্র বাংলাদেশে জল পাঠানোর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। উজানে জমে থাকা অতিরিক্ত জল দ্রুত সরিয়ে নদীর চাপ কমানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

প্রায় ১৬ লক্ষ কিউসেক জল কোথায় যাচ্ছে?

সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ফারাক্কা দিয়ে প্রায় ১৬ লক্ষ কিউসেক জল প্রবাহিত হয়েছে। এর পাশাপাশি ফিডার ক্যানেল দিয়েও কয়েক হাজার কিউসেক জল প্রবাহিত হচ্ছে।

ফারাক্কার গেট খুললে ব্যারেজের ডাউনস্ট্রিম দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গার জল পরবর্তী অংশে পদ্মা নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ফলে উজানের প্রবাহ বাড়লে তার প্রভাব বাংলাদেশের পদ্মার জলস্তরেও পড়তে পারে।

তবে কতটা জল সরাসরি কোন এলাকায় গিয়ে কতটা প্লাবন তৈরি করবে, তা নির্ভর করে নদীর স্থানীয় পরিস্থিতি, বৃষ্টিপাত, উজানের প্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট পয়েন্টের জলস্তরের উপর।

গঙ্গার জলস্তর বিপৎসীমার অনেক ওপরে

ফারাক্কা এলাকায় পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে জলস্তরের পরিসংখ্যানটিও গুরুত্বপূর্ণ।

১০ সেপ্টেম্বরের রিপোর্ট অনুযায়ী, ফারাক্কায় গঙ্গার জলস্তর প্রায় ২৩.৭৫ মিটার পর্যন্ত উঠেছিল। সেখানে স্থানীয় বিপৎসীমা ছিল প্রায় ২২.২৫ মিটার। অর্থাৎ জলস্তর বিপৎসীমার প্রায় দেড় মিটার ওপরে চলে গিয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতেই অতিরিক্ত জল দ্রুত downstream-এ সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন তৈরি হয়।

মুর্শিদাবাদের নদীতীরবর্তী এলাকাতেও জলস্তর বৃদ্ধি ও নদীভাঙন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের নদীতীরবর্তী এলাকাগুলিও এই জলবৃদ্ধির প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশে কি ইতিমধ্যেই বন্যা শুরু?

হ্যাঁ, কয়েকটি এলাকায় প্লাবনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের বহু এলাকা পানিতে ঢেকেছে। পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর জলস্তর বৃদ্ধির ফলে প্রায় ৪,৩৫০টি পরিবার পানিবন্দি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট নদীগুলির জলস্তর তখনও বিপৎসীমার নিচে ছিল এবং পদ্মায় পানি বৃদ্ধির হারও কিছুটা কমতে শুরু করেছিল।

রাজশাহীতেও পদ্মার জলস্তর দ্রুত বেড়ে চরাঞ্চল ও নিচু এলাকাগুলিতে পানি ঢোকার খবর এসেছে। ১২ সেপ্টেম্বর সকালে রাজশাহী পয়েন্টে জলস্তর ছিল প্রায় ১৭.৩০ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ১৮.০৫ মিটার।

অর্থাৎ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও রাজশাহী পয়েন্টে তখনও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।

কুষ্টিয়াতেও বাড়ছে দুর্ভোগ

পদ্মার জলবৃদ্ধির প্রভাব কুষ্টিয়ার দৌলতপুরেও স্পষ্ট।

রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার জলস্তরও বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

অর্থাৎ, ফারাক্কার জলপ্রবাহের সঙ্গে স্থানীয় বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল মিলিয়ে বাংলাদেশের নদী অববাহিকায় বাস্তবেই চাপ তৈরি হয়েছে।

তাহলে কি গোটা বাংলাদেশ ডুবে যাবে?

এই মুহূর্তে এমন কোনও তথ্য নেই যার ভিত্তিতে বলা যায় যে ফারাক্কার জলেই বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অংশ একযোগে ডুবে যাবে।

বরং বর্তমানে যে ছবিটা পাওয়া যাচ্ছে, তা হল—পদ্মা অববাহিকার নির্দিষ্ট নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকায় প্লাবন তৈরি হয়েছে এবং কয়েকটি জায়গায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। কিন্তু নদীর জলস্তর, প্রবাহের গতি এবং বিপৎসীমার সঙ্গে দূরত্ব সব জায়গায় এক নয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে যেমন পানি বৃদ্ধির হার কমার খবর এসেছে, তেমনই কুষ্টিয়ার কিছু এলাকায় জলস্তর আরও বাড়ছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি অঞ্চলভেদে আলাদা।

আগামী কয়েক দিনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

বন্যার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় উজান থেকে পানির প্রবাহ কেমন থাকে তার উপর।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, ওই এলাকায় নদীর পানি বৃদ্ধির হার কমতে শুরু করেছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার তাৎক্ষণিক আশঙ্কা নেই বলে তাঁরা মনে করছেন। তাঁদের পূর্বাভাস ছিল, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে দু’দিন পর জলস্তর কমতে শুরু করতে পারে।

তবে একই সময়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পানি বাড়ছিল। তাই কোনও একটি জেলার পরিস্থিতি দেখে গোটা পদ্মা অববাহিকার পূর্বাভাস দেওয়া ঠিক হবে না।

ফারাক্কার গেট খোলা মানেই কি ‘বাংলাদেশে জল ছেড়ে দেওয়া’?

এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ফারাক্কা ব্যারেজের গেট খোলার অর্থ হল অতিরিক্ত জলকে downstream-এ প্রবাহিত হতে দেওয়া। কিন্তু সব গেট একই উচ্চতায় খোলা হয়েছে—এমন নয়। ২০২৪ সালের অনুরূপ পরিস্থিতিতেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে জল নিয়ন্ত্রিতভাবে ছাড়া হয়েছিল।

এবারও বিভিন্ন রিপোর্টে অতিরিক্ত জল সরিয়ে উজানের চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।

তাই ঘটনাটিকে শুধু “ভারত সব গেট খুলে বাংলাদেশকে ডুবিয়ে দিল” হিসেবে দেখানো তথ্যগতভাবে অতিরঞ্জিত হবে।

এখন নজর কোথায়?

এই মুহূর্তে নজর রয়েছে মূলত—

  • ফারাক্কা ও গঙ্গার জলস্তর
  • পদ্মায় উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ
  • রাজশাহী পয়েন্টের জলস্তর
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা ও মহানন্দা
  • কুষ্টিয়ার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্ট
  • নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে কি না
  • নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করছে কি না

কারণ শুধু ফারাক্কার গেট খোলা নয়, উজানের ঢল + স্থানীয় বৃষ্টিপাত + নদীর বর্তমান জলস্তর—এই সবকটি বিষয় একসঙ্গে বন্যার মাত্রা নির্ধারণ করে।

শেষ কথা

ফারাক্কার ১০৯টি গেট খোলা এবং বিপুল পরিমাণ জলপ্রবাহ নিঃসন্দেহে পদ্মা অববাহিকার জন্য বড় সতর্কবার্তা। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে একাধিক নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং বহু মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন।

কিন্তু “এবার গোটা বাংলাদেশ ভেসে যাবে”—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনোর মতো তথ্য নেই।

বরং আগামী এক-দুই দিনে উজানের পানির প্রবাহ কমে কি না এবং পদ্মার জলস্তর কোন দিকে যায়, সেটাই পরিস্থিতির আসল দিক নির্ধারণ করবে। আপাতত সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে নদী সংলগ্ন চর ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের।

FACT CHECK

দাবি: ফারাক্কার সব ১০৯টি গেট খোলা হয়েছে এবং প্রায় ১৬ লক্ষ কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে।
মূল্যায়ন: সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে এই তথ্যের সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে।

দাবি: এর ফলে বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই বড় বন্যা হয়েছে।
মূল্যায়ন: আংশিক সত্য। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুষ্টিয়ার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, বহু মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন; তবে সব নদীপয়েন্টে এখনও বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।

দাবি: গোটা বাংলাদেশ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা নিশ্চিত।
মূল্যায়ন: এমন দাবি করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও অঞ্চলভেদে জলস্তরের পরিবর্তন আলাদা এবং কয়েকটি জায়গায় পানি বৃদ্ধির হার কমেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments