নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের পর কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটি দিন। কিন্তু এখনও কোনও খোঁজ নেই কাঁচরাপাড়ার বাসিন্দা শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায়ের। প্রয়াত রাজনীতিক মুকুল রায়ের পুত্রবধূ এবং প্রাক্তন বিধায়ক শুভ্রাংশু রায়ের স্ত্রী শর্মিষ্ঠা ২১ আগস্ট একটি তীর্থযাত্রী দলের সঙ্গে কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।
২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর থেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তাঁর সঙ্গে থাকা দলের অন্য সদস্যদেরও কোনও সন্ধান মিলছিল না। প্রথম দিকে ৩২ সদস্যের গোটা দলটিকেই নিখোঁজ হিসেবে ধরা হয়েছিল। পরে একজনকে উদ্ধারের খবর আসে। ফলে দলের কতজন এখনও নিখোঁজ, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংখ্যা সামনে এসেছে।
এরই মধ্যে নতুন করে আশার কথা জানিয়েছেন শুভ্রাংশু রায়। তাঁর দাবি, স্ত্রী শর্মিষ্ঠা-সহ ওই ৩২ জন হয়তো এখনও জীবিত এবং চীন-তিব্বত সীমান্তের কোনও অজ্ঞাত এলাকায় রয়েছেন।
তবে এই দাবি এখনও পরিবারের আশা ও বিশ্বাসের জায়গায় রয়েছে। সরকারি ভাবে শর্মিষ্ঠা বা বাকি নিখোঁজ পর্যটকদের জীবিত অবস্থান নিশ্চিত করা হয়নি।
কীভাবে নিখোঁজ হলেন শর্মিষ্ঠা?
শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায় ২১ আগস্ট কলকাতা থেকে একটি পর্যটক দলের সঙ্গে নেপালের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা। দলের আয়োজনের সঙ্গে কলকাতার ‘চলো যাই’ নামের একটি ভ্রমণ সংস্থার নাম উঠে এসেছে।
নেপাল হয়ে দলটির তিব্বতের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। বিপর্যয়ের ঠিক আগে তাঁরা কেরুং বা কেরুং সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি ছিলেন বলে পরিবারের তরফে জানানো হয়েছিল।
শুভ্রাংশু রায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, শেষবার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বিপর্যয়স্থলের কাছাকাছি এলাকায় ছিলেন। এরপরই ভয়াবহ বন্যা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে ফোনে আর যোগাযোগ করা যায়নি।
হড়পা বানের পর সীমান্তে কী হয়েছিল?
২৬ আগস্ট নেপালের রাসুয়া অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ধস আঘাত হানে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কেরুং-গিরং করিডরও বিপর্যস্ত হয়।
বন্যার জলের স্রোতে রাস্তা, সেতু এবং সীমান্ত পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে ওই অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টেও সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং বহু মানুষের নিখোঁজ হওয়ার কথা উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতেই নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তথ্যের অভাব।
৩২ জন কি সত্যিই চীন-তিব্বত সীমান্তে আটকে?
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
শুভ্রাংশু রায় সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেছেন, তাঁর বিশ্বাস শর্মিষ্ঠা-সহ ৩২ জনই সুস্থ রয়েছেন এবং চীন-তিব্বত সীমান্তের কোনও অজ্ঞাত স্থানে থাকতে পারেন। তিনি পর্যটকদের প্রকৃত অবস্থান এবং সীমান্ত পারাপারের তথ্য যাচাই করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তথ্যপ্রবাহ স্বাভাবিক না থাকায় পরিবারগুলি সঠিক খবর পাচ্ছে না।
তবে চীনের কোনও গোপন শিবিরে ৩২ জন ভারতীয়কে আটকে রাখা হয়েছে—এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। একইভাবে তাঁদের চীনা কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকার দাবিও নিশ্চিত নয়।
কেন চীনের তথ্য যাচাইয়ের দাবি করছেন শুভ্রাংশু?
শুভ্রাংশুর মূল বক্তব্য হল, শুধু নেপালের বিপর্যয়স্থল বা প্রকাশ্যে আসা ভিডিও দেখে নিখোঁজ পর্যটকদের পরিণতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়।
তিনি জানতে চাইছেন, বিপর্যয়ের আগে সীমান্তে ঠিক কতজন ভারতীয় পর্যটক পৌঁছেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কতজন ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করেছিলেন এবং পরে তাঁদের কী অবস্থান হয়েছিল।
এই তথ্য প্রকাশ্যে এলে নিখোঁজ পর্যটকদের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে অনেকটাই পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে তাঁর মত।
তিনি ভারত সরকারের কাছেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখার আবেদন জানিয়েছেন।
ভ্রমণ সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
এই ঘটনায় পর্যটকদের পরিবারের প্রশ্নের মুখে পড়েছে সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ ব্যবস্থাপনাও।
শুভ্রাংশুর অভিযোগ অনুযায়ী, ‘চলো যাই’-এর মাধ্যমে তাঁর স্ত্রী নেপালে গিয়েছিলেন। এরপর নেপালে ‘সম্রাট ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস’ এবং সীমান্ত এলাকায় একটি চিনা সংস্থার মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা হওয়ার কথা ছিল।
তিনি জানতে চেয়েছেন, বিপর্যয়ের আগে এবং পরে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির মধ্যে কী যোগাযোগ হয়েছিল এবং পর্যটকদের সর্বশেষ অবস্থান কোথায় ছিল।
তাঁর আরও দাবি, প্রকাশ্যে আসা বাসের ভিডিও বা অন্যান্য নথি দিয়ে নিখোঁজ পর্যটকদের পরিচয় ও অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন। এসব অভিযোগের স্বাধীন সরকারি তদন্ত বা পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের ফল এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
৩২ জনের হিসাব নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি
নিখোঁজ পর্যটকদের সংখ্যা নিয়েও শুরু থেকেই কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে।
প্রথম দিকে পশ্চিমবঙ্গের ৩২ জনের একটি দল নিখোঁজ হওয়ার খবর সামনে আসে। ‘চলো যাই’-এর পক্ষ থেকেও ৩০ জন পর্যটক ও দুই কর্মী—মোট ৩২ জনের কথা বলা হয়েছিল। পরে একজনকে উদ্ধার করার খবর প্রকাশিত হয়, ফলে ৩১ জন নিখোঁজ থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়।
এ কারণেই এখন “৩২ জন এখনও নিখোঁজ” বলা হলে প্রেক্ষাপটটি স্পষ্ট করা জরুরি। পরিবারের বক্তব্যে ৩২ জনকে নিয়ে আশার কথা বলা হলেও সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন আপডেটে সংখ্যার পার্থক্য দেখা গিয়েছে।
ভারত সরকারের সামনে এখন কী করণীয়?
পরিবারগুলির প্রধান দাবি একটাই—নিখোঁজ প্রত্যেক ভারতীয়ের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য দ্রুত সামনে আনা।
এর জন্য নেপাল ও চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, সীমান্ত পারাপারের নথি যাচাই, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা মিলিয়ে দেখা এবং নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ।
নেপাল ও তিব্বত—দুই জায়গাতেই বিপর্যয়ের মাত্রা অত্যন্ত বড় হওয়ায় উদ্ধার ও শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক রিপোর্টে এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষ নিখোঁজ থাকার কথা উঠে আসছে।
শর্মিষ্ঠা কি ফিরবেন?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেটাই।
পরিবারের কাছে কোনও নিশ্চিত বার্তা না আসায় উৎকণ্ঠা কাটছে না। একই সঙ্গে শুভ্রাংশু রায়ের আশাবাদ পরিবারগুলিকে নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে।
তবে সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—আশা এবং নিশ্চিত তথ্যকে আলাদা রাখা।
শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায় জীবিত রয়েছেন—এটি এখনও নিশ্চিত খবর নয়। তিনি চীন-তিব্বত সীমান্তে রয়েছেন—এটিও সরকারি ভাবে নিশ্চিত হয়নি। আর ৩২ জন ভারতীয় পর্যটক কোনও গোপন শিবিরে আটকে রয়েছেন—এই দাবিরও এখনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
তাই এখন পরিবারের আশা, সরকারি অনুসন্ধান এবং ভারত-নেপাল-চীন কূটনৈতিক সমন্বয়ের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।
FACT CHECK
দাবি: শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায় জীবিত রয়েছেন।
ফ্যাক্টচেক: নিশ্চিত নয়। এটি তাঁর স্বামী শুভ্রাংশু রায়ের বিশ্বাস ও দাবি। সরকারি ভাবে তাঁর জীবিত থাকার প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
দাবি: ৩২ জন ভারতীয় পর্যটক চীন-তিব্বত সীমান্তের কোনও জায়গায় নিরাপদে রয়েছেন।
ফ্যাক্টচেক: প্রমাণিত নয়। শুভ্রাংশু রায় এমনটাই বিশ্বাস করেন বলে জানিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
দাবি: ৩২ জনকে চীন গোপন শিবিরে আটকে রেখেছে।
ফ্যাক্টচেক: এমন দাবির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। এটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
দাবি: ৩২ জনের গোটা দল এখনও নিখোঁজ।
ফ্যাক্টচেক: সংখ্যাটি নিয়ে সময়ভেদে ভিন্ন তথ্য এসেছে। প্রথমে ৩২ জনের দল নিখোঁজ হওয়ার খবর আসে; পরে একজন উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হওয়ায় ৩১ জন নিখোঁজ থাকার তথ্যও সামনে আসে।



