দুর্গাপুজোর আগে মদ কিনতে গিয়ে কি এবার বাড়তি টাকা গুনতে হবে? ১ অক্টোবর থেকেই কি বদলে যাচ্ছে বিয়ার, দেশি মদ ও বিদেশি মদের দাম?
পশ্চিমবঙ্গ স্টেট বেভারেজেস কর্পোরেশন লিমিটেড বা WBSBCL-এর নতুন মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া ঘিরে এখন এমনই জল্পনা তৈরি হয়েছে। কারণ ১ অক্টোবর থেকে নতুন মূল্য কার্যকর করার কথা জানানো হয়েছে। শুধু যে দাম বাড়বে এমন নয়—দাম অপরিবর্তিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট পণ্যকে নতুন করে নথিভুক্ত করতে হবে।
তাহলে কি পুজোর মুখে সুরাপ্রেমীদের পকেটে বড়সড় চাপ পড়তে চলেছে? কোন ব্র্যান্ডে কত টাকা বাড়বে? নাকি নতুন নিয়মের আড়ালে রয়েছে দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—চূড়ান্ত ব্র্যান্ডভিত্তিক দাম এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
১ অক্টোবর থেকেই বদলাচ্ছে মদের দামের কাঠামো
WBSBCL-এর সাম্প্রতিক প্রক্রিয়ায় বিদেশি মদ, ভারতে তৈরি মদ এবং বিয়ার—এই তিন ধরনের পণ্যের জন্য নতুন করে মূল্য নির্ধারণ ও রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর WBSBCL-এর সদর দফতরে প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে প্রি-বিড বৈঠক হয়। তার আগে ২৬ আগস্ট বিদেশি মদ, বিয়ার এবং India Made Liquor সরবরাহের জন্য EOI বা Expression of Interest প্রকাশ করা হয়েছিল।
এরপর ১০ সেপ্টেম্বরের নথিতে নতুন মূল্য কাঠামো অনুযায়ী পণ্যগুলিকে রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা জানানো হয়।
ফলে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে নতুন মূল্য কার্যকর করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
কোন কোন মদের দাম বদলাতে পারে?
নতুন মূল্য কাঠামোর আওতায় মূলত তিনটি বড় ক্যাটেগরি রয়েছে—
- বিদেশি মদ বা Foreign Liquor
- ভারতে তৈরি মদ বা Indian Made Liquor
- বিয়ার
অর্থাৎ শুধু হুইস্কি বা স্কচ নয়, বিয়ার এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট মদের ক্ষেত্রেও নতুন মূল্য কাঠামোর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
কোন ব্র্যান্ডে ঠিক কত টাকা বাড়বে—এই তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি।
তাই এখনই কোনও নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের বোতল পিছু ২০, ৫০ বা ১০০ টাকা বাড়বে বলে নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
তাহলে ১০ শতাংশ IMC-এর বিষয়টি কী?
নতুন মূল্য নির্ধারণের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে Inventory Management Charge বা IMC।
WBSBCL-এর প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে, এই খাতে নির্ধারিত খরচের সীমা Ex-Distillery Price বা EDP-এর ১০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
সহজ উদাহরণে বিষয়টি বোঝা যাক।
ধরা যাক কোনও নির্দিষ্ট পণ্যের EDP ১০০ টাকা। সেই ক্ষেত্রে IMC হিসাবে সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত ধরা যেতে পারে—অর্থাৎ ওই উপাদানের ক্ষেত্রে ১১০ টাকার সীমা তৈরি হয়।
তবে এটিকে বোতলের চূড়ান্ত MRP হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।
কারণ চূড়ান্ত দামের সঙ্গে আবগারি শুল্ক, কর এবং অন্যান্য প্রযোজ্য মূল্য উপাদান যুক্ত হতে পারে। তাই “১০০ টাকার মদ মানেই দোকানে ১১০ টাকা”—এমন সরল হিসাব ঠিক নয়।
আরও বড় নিয়ম: দেশের সর্বনিম্ন দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য
নতুন মূল্য কাঠামোর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।
নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের Declared Price নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন রাজ্যে প্রযোজ্য সর্বনিম্ন মূল্যের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল রাজ্যে নির্ধারিত দামের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সর্বভারতীয় ন্যূনতম মূল্যের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা।
এই নিয়মের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে।
যদি কোনও নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের দাম পশ্চিমবঙ্গে অন্য রাজ্যের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে, নতুন কাঠামোয় সেটির দাম কমার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অর্থাৎ, নতুন বিজ্ঞপ্তিকে শুধু “দাম বাড়ানোর নির্দেশ” হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না।
তাহলে কি সব মদের দাম বাড়ছে?
এখনই এমনটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
১ অক্টোবর থেকে নতুন মূল্য কাঠামো কার্যকর হবে—এটা স্পষ্ট। কিন্তু সেই কাঠামোয় কোনও নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের দাম কত হবে, সেটি এখনও চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়নি।
এমনকি কোনও পণ্যের দাম যদি অপরিবর্তিতও থাকে, সেটিকেও নতুন ব্যবস্থায় রেজিস্টার করতে হবে।
অর্থাৎ নতুন লেবেল বা নতুন রেজিস্ট্রেশন মানেই প্রত্যেকটি বোতলের দাম বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনো ঠিক হবে না।
পুরনো দামের মদের কী হবে?
এখানেও রয়েছে কিছুটা স্বস্তির খবর।
ইতিমধ্যেই বাজারে থাকা পুরনো MRP-র বোতলগুলি তাদের বিদ্যমান লেবেল রেজিস্ট্রেশনের বৈধতা অনুযায়ী পুরনো দামে বিক্রি করা যেতে পারে। ফলে ১ অক্টোবর এলেই দোকানে থাকা সমস্ত পুরনো স্টকের দাম রাতারাতি বদলে যাবে—এমন নয়।
একই সঙ্গে উৎসবের মরশুমে যাতে সরবরাহে সমস্যা না হয়, প্রস্তুতকারকদের নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সরকারের রাজস্ব বাড়ানোই কি আসল লক্ষ্য?
মদের বিক্রি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজস্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। রাজ্যের আবগারি দফতর নিজেই জানায়, তাদের অন্যতম লক্ষ্য হল নিয়ম মেনে মদ ও অন্যান্য নেশাজাতীয় পণ্যের বাজার পরিচালনার পাশাপাশি রাজ্যের প্রাপ্য রাজস্ব নিশ্চিত করা।
তাই নতুন মূল্য কাঠামোর ফলে সরকারের আবগারি রাজস্বে প্রভাব পড়তে পারে—এমন সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে দুর্গাপুজোর মতো উৎসবের আগে মদের বিক্রি বাড়লে মূল্য কাঠামোর সামান্য পরিবর্তনও রাজস্ব সংগ্রহে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে শুধু রাজস্ব বাড়ানোর জন্যই প্রতিটি ব্র্যান্ডের দাম বাড়ানো হচ্ছে—এমন নির্দিষ্ট সরকারি ঘোষণা এখনও পাওয়া যায়নি।
পুজোয় আপনার প্রিয় ব্র্যান্ডের দাম কত হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত অপেক্ষাতেই।
কারণ WBSBCL-এর বর্তমান প্রক্রিয়ায় নতুন দাম নির্ধারণ ও রেজিস্ট্রেশনের কাজ চলছে। সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, ব্র্যান্ডভিত্তিক চূড়ান্ত মূল্য তালিকা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত বোতল পিছু কত টাকা বাড়বে তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ফলে এখনই কোনও নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের দাম ধরে হিসাব করলে তা অনুমান হয়ে যাবে।
১ অক্টোবরের পরেই পরিষ্কার হবে আসল ছবি
এই মুহূর্তে পরিস্থিতিটা অনেকটা এমন—
নতুন মূল্য কাঠামো আসছে → নতুন করে রেজিস্ট্রেশন হবে → ১ অক্টোবর থেকে নতুন মূল্য কার্যকর হবে → তারপরই ব্র্যান্ডভিত্তিক আসল দাম স্পষ্ট হবে।
তাই “পুজোর আগেই মদের দাম বাড়ছে”—এই কথাটি একেবারে ভিত্তিহীন নয়। কিন্তু কোন ব্র্যান্ডে কতটা বাড়ছে, সেটি এখনও চূড়ান্তভাবে জানা যায়নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ, নতুন নিয়মের মধ্যে এমন কিছু শর্ত রয়েছে যার ফলে কোনও কোনও পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনাও থাকতে পারে।
অর্থাৎ সুরাপ্রেমীদের জন্য আসল উত্তর মিলবে ১ অক্টোবরের নতুন মূল্য তালিকা প্রকাশের পরেই।
FACT CHECK
দাবি: ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে মদের নতুন দাম কার্যকর হবে।
রায়: সত্য। WBSBCL-এর নতুন মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ১ অক্টোবর থেকে নতুন মূল্য কার্যকরের কথা জানানো হয়েছে।
দাবি: সব মদের দাম নিশ্চিত ভাবে বাড়ছে।
রায়: এখনও নিশ্চিত নয়। নতুন মূল্য কাঠামো কার্যকর হলেও কোন ব্র্যান্ডে কতটা পরিবর্তন হবে, তা এখনও প্রকাশিত হয়নি। এমনকি দাম অপরিবর্তিত থাকা পণ্যকেও নতুন করে রেজিস্টার করতে হবে।
দাবি: IMC সর্বোচ্চ EDP-এর ১০ শতাংশ হতে পারবে।
রায়: নতুন মূল্য কাঠামোয় এই সীমার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এটি সরাসরি বোতলের চূড়ান্ত MRP-এর ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সমান নয়।
দাবি: কোনও কোনও মদের দাম কমতেও পারে।
রায়: সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বভারতীয় ন্যূনতম দামের কাঠামোর কারণে পশ্চিমবঙ্গে আগে বেশি থাকা কোনও নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের দাম সংশোধিত হয়ে কমতে পারে। তবে চূড়ান্ত মূল্য তালিকা না আসা পর্যন্ত এটি নিশ্চিত নয়।



