Sunday, September 20, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাটনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় নতুন মোড়! অভিষেকের বিরুদ্ধে তথ্য দেওয়ার দাবি সন্তু গাঙ্গুলির

নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় নতুন মোড়! অভিষেকের বিরুদ্ধে তথ্য দেওয়ার দাবি সন্তু গাঙ্গুলির

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ফের নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। তদন্তের আওতায় থাকা ব্যবসায়ী সন্তু গাঙ্গুলি দাবি করেছেন, নিয়োগ দুর্নীতির নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। সেই তথ্য তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দিতে চান বলেও তাঁর তরফে আদালতে যাওয়ার খবর সামনে এসেছে।

আর এই দাবির মধ্যেই রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে।

তবে শুরুতেই পরিষ্কার করে দেওয়া প্রয়োজন—সন্তু গাঙ্গুলির বক্তব্য বা অভিযোগকে আদালত প্রমাণিত সত্য হিসেবে ঘোষণা করেনি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর দাবি এখনও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়।

কে এই সন্তু গাঙ্গুলি?

নিয়োগ দুর্নীতি তদন্তে সন্তু গাঙ্গুলির নাম অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে তাঁকে নিয়োগ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল CBI। সেই সময় তদন্তকারী সংস্থার সূত্রে তাঁর সঙ্গে তৎকালীন তৃণমূল নেতা কুন্তল ঘোষ, ব্যবসায়ী অয়ন শীল এবং সুজয়কৃষ্ণ ভদ্রের যোগাযোগের কথা উঠে এসেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

একই সময়ে তাঁর বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়েছিল বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল।

তদন্তকারীদের নজরে আসার অন্যতম কারণ ছিল অয়ন শীলকে ঘিরে ওঠা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ। অয়ন শীলের বক্তব্যের ভিত্তিতে সন্তুর সঙ্গে বিপুল অর্থের লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের অংশ হয়েছিল বলে তখন রিপোর্ট করা হয়।

এবার কেন নতুন করে সন্তুর নাম?

সাম্প্রতিক আইনি প্রক্রিয়ায় সন্তু গাঙ্গুলির নাম ফের সামনে এসেছে। কলকাতা হাইকোর্টের প্রকাশ্য cause list-এ CRM(M)/1325/2025, Santu Ganguly vs Central Bureau of Investigation মামলাটি নথিভুক্ত রয়েছে।

অর্থাৎ, সন্তু গাঙ্গুলির সঙ্গে নিয়োগ দুর্নীতি তদন্তের সম্পর্ক নিয়ে আদালত-সংক্রান্ত নথিও রয়েছে।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হল—তদন্তের আওতায় থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাঁর কাছে এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা তদন্তকারীদের কাজে লাগতে পারে।

‘সব দেখেছি’, দাবি সন্তুর

সন্তু গাঙ্গুলির বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়োগ দুর্নীতির নেপথ্যে থাকা কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ পরিসরে থাকার কারণে তিনি গোটা প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান রাখেন।

কীভাবে অর্থের লেনদেন হত, কারা মধ্যস্থতা করতেন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কী ধরনের অনিয়মের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল—এই সংক্রান্ত তথ্য তদন্তকারী সংস্থাকে দিতে তিনি প্রস্তুত বলে তাঁর দাবি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু শোনা কথা নয়, নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি তদন্তকারীদের সামনে তথ্য তুলে ধরতে চান।

তবে এখানেই আইনি দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ব্যক্তির কাছে তথ্য থাকা বা তিনি নিজেকে প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করলেই সেই তথ্য আদালতে প্রমাণিত হয়ে যায় না। তদন্তকারী সংস্থাকে তাঁর বক্তব্য যাচাই করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে নথি, আর্থিক লেনদেন ও অন্যান্য সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম কেন উঠছে?

সন্তুর সাম্প্রতিক দাবিতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও উঠে এসেছে বলে আপনার স্ক্রিপ্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু এটিকে “অভিষেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে” হিসেবে লেখা ঠিক হবে না।

কারণ কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে কারও অভিযোগ বা সাক্ষ্য দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ এবং সেই অভিযোগের তদন্তে প্রমাণ পাওয়া—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

এই মুহূর্তে নিরাপদ ও তথ্যনিষ্ঠ ভাষা হল—সন্তু গাঙ্গুলি অভিষেক-ঘনিষ্ঠ পরিসর বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার দাবি করেছেন এবং সেই তথ্য তদন্তকারীদের হাতে তুলে দিতে চান।

নিরাপত্তা নিয়ে কী অভিযোগ?

সন্তু গাঙ্গুলির আরও দাবি, দুর্নীতি নিয়ে মুখ খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি হুমকির আশঙ্কায় রয়েছেন।

এই কারণেই তিনি পুলিশি নিরাপত্তা চেয়েছিলেন বলে তাঁর পক্ষের বক্তব্য। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।

তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্যের মূল যুক্তি—যদি তিনি সত্যিই নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারেন, তাহলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তবে পুলিশ তাঁকে হুমকির বিষয়ে কী পদক্ষেপ করেছে, সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সরকারি অবস্থান না পাওয়া পর্যন্ত একতরফাভাবে “পুলিশ নিরাপত্তা দেয়নি” বা “পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল” বলাও সতর্কতার সঙ্গে লিখতে হবে।

২৬ কোটি টাকার অভিযোগের পুরনো সূত্র

সন্তু গাঙ্গুলির নাম নিয়োগ দুর্নীতি তদন্তে আগে থেকেই উঠে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল কথিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ।

২০২৪ সালে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যবসায়ী অয়ন শীল তদন্তকারীদের কাছে দাবি করেছিলেন যে তিনি সন্তু গাঙ্গুলিকে ২৬ কোটি টাকা দিয়েছিলেন। এই টাকা কোথায় গিয়েছিল এবং তার সঙ্গে নিয়োগ দুর্নীতির কোনও যোগ ছিল কি না—সেই বিষয়েই তদন্তকারীরা সন্তুকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন বলে রিপোর্ট হয়েছিল।

তবে এই ২৬ কোটি টাকার অভিযোগকে আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। এটি তদন্তের সময় উঠে আসা একটি অভিযোগ।

CBI-এর নজরে ছিলেন সন্তু

নিয়োগ দুর্নীতি তদন্তে CBI যে সন্তু গাঙ্গুলিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, তারও রিপোর্ট রয়েছে।

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকে নিজাম প্যালেসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তখন তদন্তকারীরা তাঁর সঙ্গে নিয়োগ মামলায় অভিযুক্ত বা তদন্তের আওতায় থাকা কয়েকজনের যোগাযোগের বিষয় খতিয়ে দেখছিলেন।

এর আগেও তাঁর একাধিক মোবাইল ফোন তদন্তের আওতায় এসেছিল বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল।

ফলে নতুন করে তিনি তদন্তকারীদের কাছে আরও তথ্য দেওয়ার কথা বলায় মামলার গতিপথে নতুন কোনও তথ্য যোগ হয় কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে কি অভিষেককে গ্রেফতার করা হবে?

এই প্রশ্নটিই রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে শুধু সন্তু গাঙ্গুলির বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রেফতার হবে—এমন কোনও সিদ্ধান্ত বা সরকারি ঘোষণা নেই।

কোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হবে কি না, তা নির্ভর করে তদন্তে পাওয়া প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট মামলার আইনগত অবস্থান এবং আদালতের নির্দেশের উপর।

তাই “বিদেশ থেকে ফিরলেই গ্রেফতার” বা “এবার আর বাঁচার উপায় নেই”—এই ধরনের দাবি তথ্যের বদলে রাজনৈতিক অনুমান হয়ে যাবে।

তদন্তে এখন কী হতে পারে?

সন্তু গাঙ্গুলি সত্যিই যদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেন, তাহলে তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসতে পারে—

  • তাঁর দাবির পক্ষে কোনও নথি রয়েছে কি না
  • কথিত আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না
  • তাঁর বক্তব্য অন্য সাক্ষ্য বা অভিযুক্তদের বয়ানের সঙ্গে মেলে কি না
  • কোনও ব্যাংক লেনদেন বা সম্পত্তির নথি তাঁর দাবিকে সমর্থন করে কি না
  • তিনি যাঁদের নাম করছেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের ডিজিটাল প্রমাণ রয়েছে কি না
  • তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নতুন কোনও তদন্তের দরজা খোলে কি না

অর্থাৎ, সন্তুর বক্তব্য তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু বক্তব্যের গুরুত্ব আর প্রমাণের আইনি মূল্য এক জিনিস নয়।

নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় নতুন মোড়?

নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ইতিমধ্যেই বহু ব্যক্তি, আর্থিক লেনদেন এবং মধ্যস্থতাকারীর নাম তদন্তে উঠে এসেছে।

সেই প্রেক্ষাপটে কোনও অভিযুক্ত বা তদন্তের আওতায় থাকা ব্যক্তি যদি নিজে থেকেই আরও তথ্য দেওয়ার কথা বলেন, তাহলে তদন্তের পরিধি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এখন দেখার বিষয়, সন্তু গাঙ্গুলির দাবির ভিত্তিতে তদন্তকারী সংস্থাগুলি আদৌ নতুন কোনও তথ্য উদ্ধার করতে পারে কি না।

আর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যে অভিযোগের কথা সামনে এসেছে, তার কোনও প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায় কি না—সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

FACT CHECK

দাবি: সন্তু গাঙ্গুলি নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে আগে থেকেই CBI-এর নজরে ছিলেন।
রায়: সত্য। ২০২৪ সালে তাঁকে CBI জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছিল।

দাবি: সন্তু গাঙ্গুলি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণ দিয়েছেন।
রায়: এখনও বলা যায় না। তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার দাবি করেছেন; তাঁর বক্তব্য তদন্তে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

দাবি: সন্তুর বক্তব্যে নিয়োগ দুর্নীতির পুরো ঘটনা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে।
রায়: ভুল/অতিরঞ্জিত। কোনও সাক্ষীর বক্তব্য বা দাবি আদালতে যাচাই ও প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলা যায় না।

দাবি: অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিদেশ থেকে ফিরলেই গ্রেফতার হবেন।
রায়: প্রমাণ নেই। এমন কোনও নিশ্চিত সরকারি ঘোষণা বা আদালতের নির্দেশ পাওয়া যায়নি।

দাবি: সন্তু গাঙ্গুলি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন।
রায়: আদালতের প্রকাশ্য cause list-এ তাঁর নামে Santu Ganguly vs Central Bureau of Investigation মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments