বিরাট কোহলি ও অনুষ্কা শর্মার বৃন্দাবন সফর নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে তুমুল চর্চা। এবার তাঁদের আধ্যাত্মিক সফরকে ঘিরেই উঠেছে ৫ কোটি টাকার বিস্ফোরক দাবি।
দাবি উঠেছে, প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমে বিরাট কোহলিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নাকি ৫ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল! কিন্তু সত্যিই কি এমন কোনও চুক্তি হয়েছিল? বিরাট কি আদৌ এই টাকা পেয়েছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসছে আরও একাধিক গুরুতর অভিযোগ এবং তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ—এই দাবিগুলির কোনওটি এখনও স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়।
কোথা থেকে এল ৫ কোটি টাকার দাবি?
সম্প্রতি শ্রীকৃষ্ণ জন্মভূমি সংঘর্ষ ন্যাসের সভাপতি তথা ফালাহারি মহারাজ নামে পরিচিত দীনেশ শর্মার একটি চিঠিকে ঘিরে এই বিতর্কের সূত্রপাত।
রিপোর্ট অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে লেখা ওই চিঠিতে প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ তোলা হয়েছে।
সেখানেই দাবি করা হয়েছে, রাজস্থানের একটি বেসরকারি সংস্থা বা প্রপার্টি-সংক্রান্ত গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি নাকি বিরাট কোহলিকে প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমে নিয়ে আসার জন্য ৫ কোটি টাকা খরচ বা প্রস্তাব করেছিলেন।
অভিযোগের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে আশ্রম ও প্রেমানন্দ মহারাজের জনপ্রিয়তা বাড়ানো হয়েছিল।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে।
এই ৫ কোটি টাকার লেনদেনের কোনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।
বিরাট কি সত্যিই ৫ কোটি টাকা নিয়েছিলেন?
এখন পর্যন্ত এমন কোনও প্রকাশ্য নথি পাওয়া যায়নি, যা প্রমাণ করে বিরাট কোহলি প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমে যাওয়ার জন্য ৫ কোটি টাকা নিয়েছিলেন।
কোনও যাচাই করা ব্যাংক ট্রানজ্যাকশন, চুক্তিপত্র, ইনভয়েস বা পেমেন্ট রেকর্ড প্রকাশ্যে আসেনি। বিরাট কোহলি বা অনুষ্কা শর্মার তরফ থেকেও এমন কোনও প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি।
ফলে এই মুহূর্তে “বিরাট ৫ কোটি টাকা নিয়ে আশ্রমে গিয়েছিলেন”—এমনভাবে বলা তথ্যগতভাবে ঠিক হবে না।
বরং বলা যায়, ৫ কোটি টাকার পেমেন্টের দাবি করেছেন ফালাহারি মহারাজ; কিন্তু দাবিটির স্বাধীন প্রমাণ এখনও মেলেনি।
তাহলে বিরাট-অনুষ্কার প্রেমানন্দ মহারাজের সঙ্গে সম্পর্ক কী?
এখানে অবশ্য একটি বিষয় নিশ্চিত—বিরাট কোহলি ও অনুষ্কা শর্মার প্রেমানন্দ মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনা বাস্তব এবং বহুবার প্রকাশ্যে এসেছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রথম তাঁদের বৃন্দাবন সফর ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। এরপরও তাঁরা একাধিকবার প্রেমানন্দ মহারাজের সঙ্গে দেখা করেছেন।
২০২৫ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণার পরও বিরাটকে মহারাজের সঙ্গে দেখা যায়। ২০২৬ সালেও তাঁদের একাধিক সাক্ষাতের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ বিরাটের আশ্রমে যাওয়া সত্যি—কিন্তু সেই সফরের বিনিময়ে ৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিই এখন অপ্রমাণিত দাবি।
শুধু বিরাট নয়, উঠেছে আরও গুরুতর অভিযোগ
ফালাহারি মহারাজের চিঠিতে শুধু বিরাট কোহলির প্রসঙ্গই নেই।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশ্রমের আশপাশে জমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত অনিয়ম, তথাকথিত প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কার্যকলাপ এবং আরও কিছু গুরুতর অভিযোগের কথা ওই চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে।
এমনকি শিশু নিখোঁজ এবং কিডনি পাচারের মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগেরও উল্লেখ করা হয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
এই কারণেই পুরো বিষয়টির CBI তদন্তের দাবি তোলা হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই অভিযোগগুলির স্বাধীন সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন তথ্য এখনই পাওয়া যাচ্ছে না।
তাই অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
প্রেমানন্দ মহারাজের বিরুদ্ধেই কি অভিযোগ?
বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।
ফালাহারি মহারাজের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর অভিযোগ সরাসরি প্রেমানন্দ মহারাজের বিরুদ্ধে নয়। বরং তাঁর দাবি, মহারাজের চারপাশে থাকা কিছু মানুষ তাঁর নাম ও জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করছেন।
প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রেমানন্দ মহারাজকে নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে গোবর্ধন গিরিরাজ এলাকায় রাখার আবেদনও করা হয়েছে। তাঁকে Z+ নিরাপত্তা দেওয়ার দাবিও তোলা হয়েছে।
অর্থাৎ, অভিযোগকারীর বক্তব্যের একটি অংশ হল—মহারাজ নিজে নন, বরং তাঁর আশপাশের কিছু ব্যক্তিকে নিয়েই সন্দেহ রয়েছে।
কেন এখন এত চর্চা?
এই বিতর্ক এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমকে ঘিরে অন্য একটি ঘটনাও আলোচনায় রয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শেষদিকে আশ্রমের এক শিষ্য, রসিক দুলারি শরণ ওরফে দীপক লোধির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু হয় বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরই আশ্রমকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ এবং পুরনো দাবি নতুন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াতে শুরু করে।
তবে একটি ঘটনার সঙ্গে অন্য অভিযোগের সরাসরি যোগ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ এখনও নেই।
তাহলে ৫ কোটি টাকার রহস্যের আসল সত্য কী?
এই মুহূর্তে তথ্যকে তিন ভাগে ভাগ করলে বিষয়টি অনেক পরিষ্কার।
প্রথমত, বিরাট কোহলি ও অনুষ্কা শর্মা প্রেমানন্দ মহারাজের সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছেন—এটি প্রকাশ্যে নথিভুক্ত ঘটনা।
দ্বিতীয়ত, ফালাহারি মহারাজ দাবি করেছেন যে বিরাটকে আশ্রমে নিয়ে আসার জন্য ৫ কোটি টাকা খরচ বা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তৃতীয়ত, সেই ৫ কোটি টাকার লেনদেনের কোনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
তাই আপাতত ৫ কোটি টাকার গল্পকে “প্রমাণিত সত্য” নয়, বরং একটি গুরুতর কিন্তু অপ্রমাণিত অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।
তদন্ত হলে হয়তো জানা যাবে, এই দাবির পেছনে সত্যিই কোনও আর্থিক লেনদেন ছিল কি না। আবার প্রমাণ না মিললে এটিও স্পষ্ট হবে যে ভাইরাল হওয়া দাবিটি কতটা ভিত্তিহীন।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল—অভিযোগ আর প্রমাণকে যেন এক করে না দেখা হয়।



