মা কালীর পায়ের নীচে শুয়ে রয়েছেন মহাদেব—এই চিরপরিচিত দৃশ্যের সঙ্গেই আমরা অভ্যস্ত। কালীমূর্তি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই ছবি।
কিন্তু যদি দৃশ্যটাই একেবারে উল্টো হয়?
যদি দেখা যায়, মা কালীর বুকের উপর পা রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন স্বয়ং মহাদেব! শুনতে অবাক লাগলেও উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের একটি মন্দিরে বছরের পর বছর ধরে এমনই ব্যতিক্রমী রূপে পুজিত হয়ে আসছেন শিব ও কালী।
মন্দিরটির নাম বাবা মহাকাল মন্দির। আর এই অদ্ভুত মূর্তিকে ঘিরে রয়েছে একাধিক স্থানীয় বিশ্বাস, জনশ্রুতি এবং প্রতীকী ব্যাখ্যা।
কোথায় রয়েছে এই ব্যতিক্রমী মন্দির?
উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের বাদু রোডে রয়েছে বাবা মহাকাল মন্দির। মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে বাদু রোড ধরে মন্দিরে পৌঁছনো যায়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরে এই বিশেষ মহাকাল-কালী মূর্তিই মূল আকর্ষণ।
সাধারণ কালীমূর্তিতে যেখানে দেবীর পায়ের নীচে শিবকে দেখা যায়, এখানে তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি।
এখানে নীলবর্ণা, চতুর্ভুজা দক্ষিণাকালিকার দেহের উপর পা রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন চতুর্ভুজ মহাদেব। ফলে প্রথম দর্শনেই মূর্তিটি নজর কাড়ে।
কীভাবে তৈরি হল এমন অদ্ভুত মূর্তি?
এই মন্দিরের সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটি এসেছে স্থানীয় জনশ্রুতি থেকে।
মন্দিরের সেবাইতের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের দিকে একটি বিশেষ ছবি-সহ ক্যালেন্ডার মন্দির প্রতিষ্ঠাতার কাছে এসে পৌঁছয়। সেই ক্যালেন্ডারে শিব ও কালীর এই উল্টো অবস্থানের ছবি ছিল।
এরপর থেকেই এই বিশেষ রূপে পুজোর ভাবনা শুরু হয় বলে মন্দিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। প্রথমদিকে ক্যালেন্ডারের ছবিকেই সামনে রেখে পুজো করা হত। পরবর্তীকালে সেই রূপ অনুসরণ করে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
তবে ক্যালেন্ডারটি কোথা থেকে এসেছিল, কেনই বা এমন ছবি সেখানে ছিল—এসব নিয়ে যে গল্প প্রচলিত, সেগুলি স্থানীয় জনশ্রুতি, নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য নয়।
স্বপ্নে দেবীর নির্দেশ—কী বলে লোককথা?
মন্দিরকে ঘিরে প্রচলিত আরেকটি কাহিনি হল, প্রতিষ্ঠাতা নাকি স্বপ্নে এই বিশেষ মূর্তির রূপ দেখতে পেতেন।
সেই স্বপ্ন ও ক্যালেন্ডারের ছবিকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে মন্দিরে এই ব্যতিক্রমী রূপের আরাধনা শুরু হয় বলে স্থানীয়ভাবে বলা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই কাহিনির উল্লেখ রয়েছে।
তবে এখানেও মনে রাখা দরকার—এটি মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত লোকবিশ্বাস; এর ঐতিহাসিক প্রমাণ আলাদা বিষয়।
তাহলে কেন উল্টো এই মূর্তি?
চিরাচরিত কালীমূর্তির ব্যাখ্যায় মহাদেবের বুকে দাঁড়িয়ে থাকেন কালী। জনপ্রিয় ধর্মীয় ব্যাখ্যায়, দেবীর উন্মত্ত সংহাররূপের প্রলয় থামাতে শিব তাঁর পায়ের নীচে শুয়ে পড়েন। সেই মুহূর্তে শিবের উপর দেবীর পা পড়তেই দেবীর চেতনা ফিরে আসে—এই কাহিনিই কালীমূর্তির বহুল পরিচিত রূপের সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু মধ্যমগ্রামের এই মূর্তিতে গল্পের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ উল্টো।
এখানে মহাদেব দাঁড়িয়ে রয়েছেন কালীর উপর। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই রূপকে পুরুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক এবং ভারসাম্যের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে কালীকে প্রকৃতির প্রতীক এবং শিবকে পুরুষের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
‘নিগম’ পদ্ধতির সঙ্গে কি সম্পর্ক রয়েছে?
মন্দিরটির ব্যাখ্যা নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে তন্ত্রশাস্ত্রের ‘নিগম’ পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে এই মূর্তির মাধ্যমে প্রকৃতি ও পুরুষের সম্পর্ককে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
তবে এটিকে এমনভাবে বলা ঠিক হবে না যে, “হিন্দু শাস্ত্রে দুর্গা বা কালী সবসময় শিবের নীচে থাকবেন”—এমন কোনও সর্বজনীন নিয়ম ভেঙেই এই মূর্তি তৈরি হয়েছে।
বরং এটি একটি বিশেষ স্থানীয় উপাসনা-রীতি ও প্রতীকী মূর্তিরূপ, যা প্রচলিত কালীমূর্তির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
এই মূর্তি কি সত্যিই একমাত্র?
এই দাবি নিয়েও কিছুটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোথাও বলা হয়েছে, এই ধরনের মহাকাল মূর্তির প্রচলন বারাণসী ও উজ্জয়িনীসহ আরও কয়েকটি জায়গায় রয়েছে এবং মধ্যমগ্রামের মূর্তিটি পূর্ণাঙ্গ রূপে বিশেষ। আবার কিছু প্রতিবেদনে মধ্যমগ্রামকে এমন মূর্তির অন্যতম বিরল স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই “বিশ্বের একমাত্র” বা “ভারতের একমাত্র” বলে নিশ্চিতভাবে দাবি করার বদলে, “অত্যন্ত বিরল ও ব্যতিক্রমী” বলা তথ্যগতভাবে বেশি নিরাপদ।
মন্দিরে কীভাবে হয় পুজো?
মন্দিরে নিত্য পুজোর পাশাপাশি অমাবস্যায় বিশেষ পুজো ও হোম-যজ্ঞের প্রচলন রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গণে অন্যান্য দেবদেবীর উপাসনাস্থলও রয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু একটি অদ্ভুত মূর্তি দেখার জায়গা নয়—স্থানীয় ভক্তদের কাছে এটি একটি নিয়মিত উপাসনাক্ষেত্রও।
আসলে এই ‘উলটপুরাণ’-এর বার্তা কী?
মধ্যমগ্রামের মহাকাল মন্দিরের এই মূর্তিকে শুধু “উল্টো কালীমূর্তি” হিসেবে দেখলে হয়তো এর প্রতীকী দিকটি পুরোপুরি ধরা পড়বে না।
এখানে প্রচলিত ব্যাখ্যায় শিব ও কালী, পুরুষ ও প্রকৃতি, শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের সম্পর্ককে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়েছে।
তাই কারও কাছে এটি অলৌকিক বিশ্বাসের বিষয়, কারও কাছে তান্ত্রিক প্রতীকের ব্যাখ্যা, আবার কারও কাছে বাংলার লোকসংস্কৃতির এক বিরল নিদর্শন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—মন্দিরটির এই মূর্তি বাস্তব, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্বপ্ন, ক্যালেন্ডার বা অলৌকিকতার গল্পগুলি জনশ্রুতি হিসেবে দেখা উচিত।
আর সেই কারণেই কালীপুজোর মরশুমে মধ্যমগ্রামের এই মহাকাল মন্দির ফের কৌতূহলের কেন্দ্র হয়ে ওঠে—যেখানে সত্যিই যেন প্রচলিত ছবিটা একেবারে উল্টে যায়।



