দুর্গা প্রতিমার পেটে কাটা দাগ, মুখের কাছে শাড়ির আঁচল, আর পায়ে লোহার শিকল! বাংলার এক বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় দেবীর এমন ব্যতিক্রমী রূপ দেখলে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে—কেন এই বিশেষ সাজ? কীসের স্মৃতি ধরে রেখেছে এই প্রতিমা?
এই পুজো হয় মুর্শিদাবাদ জেলার রঘুনাথগঞ্জের কাছে গদাইপুর গ্রামে। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের আরাধ্যা দেবী এখানে পরিচিত ‘পেটকাটি দুর্গা’ নামে। কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক রহস্যময় লোককাহিনি, বিশেষ কিছু আচার এবং বিসর্জনের অভিনব রীতি।
কেন দেবী দুর্গার পেট কাটা থাকে?
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, বহু বছর আগে এই পুজোর দায়িত্বে ছিলেন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ। সন্ধিপুজোর সময় তাঁর কিশোরী মেয়ে পুজোর কাজে সাহায্য করছিল। আচমকাই সে নিখোঁজ হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তার সন্ধান না পেয়ে অসহায় বাবা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন।
লোককথায় বলা হয়, সেই রাতে পুরোহিত স্বপ্নে দেবীর নির্দেশ পান। পরদিন প্রতিমার পেট কাটার পর নিখোঁজ কিশোরীকে জীবিত অবস্থায় ফিরে পাওয়া যায় বলে প্রচলিত বিশ্বাস। সেই ঘটনার স্মৃতি থেকেই দেবীর নাম হয় ‘পেটকাটি দুর্গা’ এবং প্রতিমার পেট কাটা রাখার রীতি শুরু হয়।
তবে এই ঘটনাকে প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে দেখার মতো নির্ভরযোগ্য নথি নেই। এটি মূলত স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে চলে আসা কাহিনি, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজোর ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
দেবীর পায়ে লোহার শিকল কেন?
পেটকাটি দুর্গার প্রতিমার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল পায়ে বাঁধা শিকল। এই রীতির ব্যাখ্যা নিয়েও স্থানীয় লোকবিশ্বাস রয়েছে।
কিছু বর্ণনায় বলা হয়, দেবীকে প্রতীকীভাবে বেঁধে রাখার রীতি সেই রহস্যময় ঘটনার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। আবার মুর্শিদাবাদের প্রাচীন দুর্গাপুজো নিয়ে প্রকাশিত একটি ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, অতীতে প্রতিমা পড়ে যাওয়ার ঘটনার পর দেবীকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার রীতি চালু হয়েছিল।
অর্থাৎ, শিকল পরানোর পিছনে একাধিক লোককথা প্রচলিত। কোন ব্যাখ্যাটি ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত, তা স্পষ্ট নয়। তবে প্রতিমার এই বিশেষ রূপই পেটকাটি দুর্গাপুজোকে অন্য অনেক বনেদি পুজোর থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
পঞ্চমীতে পাঁচ জোড়া পায়রা আসার গল্প কি সত্যি?
এই পুজোকে ঘিরে আরও কিছু আশ্চর্যজনক কাহিনি স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। তার মধ্যে রয়েছে পঞ্চমীর সকালে মন্দিরে পাঁচ জোড়া পায়রার উপস্থিতি এবং দশমী পর্যন্ত তাদের থাকার গল্প।
তবে প্রতি বছর নিয়ম করে পায়রা আসে এবং নির্দিষ্ট দিনে অদৃশ্য হয়ে যায়—এই দাবির স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায় না। তাই এটিকে প্রমাণিত ঘটনা না বলে পুজোকে ঘিরে প্রচলিত জনশ্রুতি হিসেবেই দেখা উচিত।
বিসর্জনেও রয়েছে আলাদা ঐতিহ্য
পেটকাটি দুর্গার বিসর্জনও এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, দশমীর দিন প্রতিমাকে নৌকায় করে নদীপথে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর একাদশীর সকালে নির্দিষ্ট ঘাটে বিসর্জনের আচার সম্পন্ন হয়।
এই দীর্ঘ নদীপথের যাত্রাকে ঘিরে ভক্তদের সমাগম হয়। বহু মানুষের কাছে এটি শুধু প্রতিমা বিসর্জন নয়, বরং বংশপরম্পরায় চলে আসা একটি ঐতিহ্যের অংশ।
কত বছরের পুরোনো পেটকাটি দুর্গাপুজো?
গদাইপুরের এই পুজোর বয়স নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। কোথাও ৪০০ বছরের বেশি, কোথাও প্রায় ৪২০ বছর, আবার কোথাও ৫০০ বছরেরও বেশি পুরোনো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে একমত তথ্য না থাকায় পুজোটিকে শতাব্দীপ্রাচীন বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের এই পুজো আজও বাংলার বনেদি দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যে একটি স্বতন্ত্র স্থান ধরে রেখেছে। প্রতিমার ব্যতিক্রমী রূপ, শিকল পরানোর রীতি, বিসর্জনের বিশেষ আয়োজন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকা লোককাহিনি—সব মিলিয়ে পেটকাটি দুর্গা বাংলার লোকসংস্কৃতির এক আকর্ষণীয় অধ্যায়।
এই পুজোর আসল আকর্ষণ শুধু তার রহস্যময় নাম নয়, বরং ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্থানীয় ঐতিহ্য কীভাবে একসঙ্গে একটি প্রাচীন উৎসবকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই গল্প।



