দুর্গাপুজো মানেই ষষ্ঠী থেকে দশমী—পাঁচ দিনের উৎসব। কিন্তু ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর ক্যালেন্ডার দেখলে চোখ আটকে যেতে পারে সপ্তমীর তারিখে। কারণ, কিছু পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৭ অক্টোবর শনিবার থেকে শুরু হওয়া সপ্তমী তিথি ১৮ অক্টোবর রবিবার সকাল পর্যন্ত চলবে।
ফলে কোথাও ১৭ অক্টোবরই সপ্তমীর মূল পুজো ও নবপত্রিকার আচার, আবার কোথাও ১৮ অক্টোবর সকালে সেই আচার পালনের বিধান দেখা যাচ্ছে।
তাহলে কি এবার সত্যিই দু’দিন সপ্তমী? পুজো কি একদিন বেড়ে গেল? এর পিছনে কি কোনও অশনি সংকেত রয়েছে?
না। এর সঙ্গে অশনি সংকেতের কোনও সম্পর্ক নেই। আসল কারণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তিথির হিসাব এবং উদয়তিথি।
সপ্তমী তিথি আসলে কতক্ষণ থাকছে?
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সপ্তমী তিথি শুরু হচ্ছে ১৭ অক্টোবর শনিবার ভোর ৫টা ৫৬ মিনিটে।
এই তিথি শেষ হবে ১৮ অক্টোবর রবিবার সকাল ৮টা ২৯ মিনিটে। অর্থাৎ সপ্তমী তিথি এক ক্যালেন্ডার দিনের মধ্যে শেষ হচ্ছে না; সেটি পরের দিন সকাল পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই কারণেই ১৭ অক্টোবরের পর ১৮ অক্টোবর সকালেও সপ্তমী তিথি চলতে দেখা যাচ্ছে।
তাহলে ১৮ অক্টোবরও সপ্তমী বলা হচ্ছে কেন?
এর পিছনে রয়েছে উদয়তিথির ধারণা।
সহজভাবে বললে, কোনও বিশেষ তিথি যদি সূর্যোদয়ের সময় বর্তমান থাকে, সেই দিনটিকে অনেক ধর্মীয় আচারের ক্ষেত্রে ওই তিথির দিন হিসেবে ধরা হয়।
২০২৬ সালে সপ্তমী তিথি ১৮ অক্টোবরের সূর্যোদয়ের সময়ও চলমান। ফলে কিছু পঞ্জিকা ও আচারপদ্ধতিতে ১৮ অক্টোবরকেও সপ্তমীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এটাই মূলত “দু’দিন সপ্তমী” নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তির কারণ।
তবে সব পঞ্জিকায় কি একই হিসাব?
না। এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত এবং গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার মধ্যে সপ্তমী ও নবপত্রিকা সংক্রান্ত আচারের সময়সূচিতে পার্থক্য রয়েছে।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তের হিসাবে ১৭ অক্টোবর ভোর ৫টা ৫৬ মিনিটে সপ্তমী শুরু হয়ে ১৮ অক্টোবর সকাল ৮টা ২৯ মিনিট পর্যন্ত থাকবে। সেই অনুযায়ী ১৮ অক্টোবর সকাল ৮টা ২৯ মিনিটের মধ্যে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন এবং সপ্তমীর বিধি পালনের সময় দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে গুপ্তপ্রেসের হিসাবে ১৭ অক্টোবরই অহোরাত্র সপ্তমী। সেখানে ১৭ অক্টোবর সকালেই নবপত্রিকা প্রবেশ, স্থাপন এবং সপ্তমীর মূল পুজোর বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ, কোন পঞ্জিকা অনুসরণ করা হচ্ছে তার উপর আচার পালনের তারিখ ও সময় বদলাতে পারে।
পুজো কি তাহলে একদিন বেড়ে গেল?
এখানে একটু সাবধান হওয়া দরকার।
সাধারণ কথায় বলা যায়, ২০২৬ সালে দুর্গাপুজোর উৎসবের দিনগুলো ক্যালেন্ডারে ছয়টি দিনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দেবীর মূল পূজার জন্য শাস্ত্রীয়ভাবে একটি অতিরিক্ত “ষষ্ঠ পুজোর দিন” যোগ হয়েছে।
তিথি এক ক্যালেন্ডার দিনের মাঝখানে শুরু বা শেষ না হয়ে একাধিক দিনে বিস্তৃত হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
২০২৬ সালের ক্যালেন্ডারেও ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীর তিথিগুলি পরপর কয়েকটি ইংরেজি তারিখকে স্পর্শ করছে।
অষ্টমী ও সন্ধিপুজোর ক্ষেত্রেও রয়েছে সময়ের হিসাব
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তের হিসাবে সপ্তমী শেষ হচ্ছে ১৮ অক্টোবর সকাল ৮টা ২৯ মিনিটে এবং তার পরেই অষ্টমী শুরু হচ্ছে ৮টা ৩০ মিনিটে।
অষ্টমী তিথি চলবে ১৯ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত। এরপর নবমী শুরু হবে।
অর্থাৎ, পঞ্জিকার এই সূক্ষ্ম তিথি-পরিবর্তনের কারণেই ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর দিনক্ষণ নিয়ে সাধারণ ক্যালেন্ডারের তুলনায় কিছুটা জটিলতা দেখা যাচ্ছে।
দেবীর আগমনেও কেন দুই পঞ্জিকায় মত আলাদা?
শুধু সপ্তমীর তারিখ নয়, দেবীর আগমন ও গমন নিয়েও পঞ্জিকা অনুসারে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
কিছু পঞ্জিকা অনুযায়ী ২০২৬ সালে দেবীর আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং অন্য হিসাব অনুযায়ী গজে বা হাতিতে। এই বাহনকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় পঞ্জিকা ও প্রচলিত বিশ্বাসে বিভিন্ন প্রতীকী ফলের ব্যাখ্যাও রয়েছে।
তবে এগুলিকে ধর্মীয়-পঞ্জিকাগত বিশ্বাস হিসেবেই দেখা উচিত। এগুলির ভিত্তিতে বাস্তবে কোনও অশনি সংকেত বা ভবিষ্যৎ বিপর্যয় নিশ্চিতভাবে ঘটবে—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
দেবীর গমন নিয়েও রয়েছে প্রচলিত বিশ্বাস
পঞ্জিকাগত ব্যাখ্যায় দেবীর গমনও একটি প্রতীকী বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৬ সালে দেবীর বিসর্জন বা গমন নিয়ে পঞ্জিকায় নৌকার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসে নৌকায় গমনকে শস্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
তবে এটিও ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রতীকী ব্যাখ্যা, কোনও বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নয়।
তাহলে কোন দিনে নবপত্রিকা স্নান করবেন?
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আপনার পাড়ার পুজো বা বাড়ির পুজো কোন পঞ্জিকা অনুসরণ করছে, সেটি আগে জেনে নিতে হবে।
যদি সংশ্লিষ্ট পুরোহিত বা পুজো কমিটি গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা অনুসরণ করে, তাহলে তাদের নির্ধারিত ১৭ অক্টোবরের সময়সূচি অনুসরণ করতে হবে।
আর বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসরণ করলে ১৮ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত সপ্তমী তিথির যে সময় দেওয়া হয়েছে, সেই অনুযায়ী নবপত্রিকা প্রবেশ ও সপ্তমীর বিধি পালন হতে পারে।
তাই শুধু ইন্টারনেট বা সাধারণ ক্যালেন্ডার দেখে পুজোর আচার নির্ধারণ না করে নিজেদের পঞ্জিকা ও পুরোহিতের দেওয়া সময়সূচিই অনুসরণ করা উচিত।
তাহলে “দু’দিন সপ্তমী”র রহস্য কী?
পুরো বিষয়টি খুব সহজ করে বললে—
সপ্তমী তিথি ১৭ অক্টোবর শুরু হয়ে ১৮ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত চলেছে।
তাই তিথিটি দুই ক্যালেন্ডার দিনে বিস্তৃত হয়েছে।
এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে উদয়তিথির নিয়ম এবং বিভিন্ন পঞ্জিকার গণনাপদ্ধতি। ফলে কোথাও ১৭ অক্টোবর সপ্তমীর মূল আচার, আবার কোথাও ১৮ অক্টোবর সকালে সপ্তমীর বিধান দেখা যাচ্ছে।
অর্থাৎ, এটি কোনও অশনি সংকেত নয়, কোনও অলৌকিক ঘটনাও নয়। এটি মূলত তিথি গণনার বিষয়।
আর বাঙালির কাছে সবচেয়ে আনন্দের খবর হল—২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর উৎসবের দিনগুলি ক্যালেন্ডারে এমনভাবে ছড়িয়েছে যে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত উৎসবের আমেজ দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে।
তবে “মা এবার একদিন বেশি বাপের বাড়িতে থাকছেন”—এটি অবশ্যই বাঙালির আবেগ ও লোকসংস্কৃতির সুন্দর ব্যাখ্যা; পঞ্জিকার আক্ষরিক অর্থ নয়।



