গণেশ চতুর্থী এলেই দেশজুড়ে শুরু হয় সিদ্ধিদাতা গণেশের আরাধনা। ঘর থেকে পুজোমণ্ডপ—সর্বত্রই বিঘ্নহর্তার মূর্তি স্থাপন করে ভক্তিভরে পুজো করেন মানুষ।
কিন্তু সনাতন যোগ ও আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি গভীর ব্যাখ্যায় বলা হয়, গণেশের উপস্থিতি শুধু মন্দিরের প্রতিমা বা পুজোর আসনেই সীমাবদ্ধ নয়। মানবদেহের মধ্যেও তাঁর একটি প্রতীকী ও আধ্যাত্মিক অবস্থানের কথা বলা হয়েছে।
আর সেই অবস্থানটি কোথায়?
যোগশাস্ত্রের চক্রতত্ত্ব অনুযায়ী, উত্তরটি হল মূলাধার চক্র।
মানবদেহের সাত চক্রের প্রথমটি কোনটি?
যোগ ও তন্ত্রের বিভিন্ন ধারায় মানবদেহের সাতটি প্রধান চক্রের কথা বলা হয়। এগুলি হল—
- মূলাধার
- স্বাধিষ্ঠান
- মণিপুর
- অনাহত
- বিশুদ্ধি
- আজ্ঞা
- সহস্রার
এই চক্রগুলিকে সাধারণত শারীরিক অঙ্গ হিসেবে নয়, বরং সূক্ষ্ম শক্তি, চেতনা ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতীকী কেন্দ্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে নিচের কেন্দ্রটির নাম মূলাধার। ‘মূল’ অর্থ শিকড় বা ভিত্তি এবং ‘আধার’ অর্থ আশ্রয় বা ভিত্তি। অর্থাৎ নামের মধ্যেই এর ধারণাগত গুরুত্ব ফুটে ওঠে।
কেন গণেশের সঙ্গে মূলাধার চক্রের সম্পর্ক?
যোগ-তান্ত্রিক ঐতিহ্যের ব্যাখ্যায় মূলাধারকে মানুষের স্থিতি, ভিত্তি এবং কুণ্ডলিনী শক্তির প্রাথমিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
এই কারণেই বিভিন্ন যোগ ও তান্ত্রিক ব্যাখ্যায় গণেশকে মূলাধারের অধিষ্ঠাত্রী/অধিষ্ঠাতা দেবতা হিসেবে দেখা হয়।
গণেশ হলেন বিঘ্নহর্তা এবং সিদ্ধিদাতা। কোনও শুভ কাজ শুরু করার আগে তাঁর পুজো করার যে ঐতিহ্য, তার সঙ্গে মূলাধারের এই প্রতীকী ধারণারও একটি যোগ তৈরি করা হয়।
অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় কোনও উচ্চতর সাধনা বা চেতনার পথে এগিয়ে যাওয়ার আগে মানুষের ভিতকে স্থির ও সুসংহত করার প্রয়োজন রয়েছে। আর সেই ‘ভিত’-এর প্রতীক হিসেবেই মূলাধারকে দেখা হয়।
‘গণপতি অথর্বশীর্ষ’-এ কি মূলাধারের উল্লেখ রয়েছে?
গণেশ উপাসনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃত স্তোত্র ‘গণপতি অথর্বশীর্ষ’-এ একটি বহুল উদ্ধৃত পংক্তি রয়েছে—
“ত্বং মূলাধারস্থিতোऽসি নিত্যম্”
এর প্রচলিত অর্থ করা হয়—“তুমি নিত্য মূলাধারে অবস্থান করছ।”
এই পংক্তির ভিত্তিতেই গণেশের সঙ্গে মূলাধার চক্রের সম্পর্ক নিয়ে আধ্যাত্মিক ও যোগসাধনার বিভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—এই বক্তব্যটি যোগ-আধ্যাত্মিক দর্শনের ভাষ্য, আধুনিক শারীরবিদ্যার পরীক্ষিত দাবি নয়।
মূলাধার চক্র কোথায় কল্পনা করা হয়?
যোগশাস্ত্রের প্রচলিত চক্রতত্ত্বে মূলাধারকে মেরুদণ্ডের একেবারে নিম্নপ্রান্তের অঞ্চল, অর্থাৎ পেলভিক বা ভিত্তি-অঞ্চলের সঙ্গে প্রতীকীভাবে যুক্ত করা হয়।
এটি কোনও নির্দিষ্ট শারীরিক অঙ্গ বা গ্রন্থির নাম নয়। বরং যোগসাধনায় এটি একটি সূক্ষ্ম শক্তিকেন্দ্রের ধারণা।
এই কারণেই ‘মানুষের শরীরের কোন অঙ্গে গণেশ থাকেন’—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নির্দিষ্ট কোনও অঙ্গের নাম বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, যোগশাস্ত্রের চক্রতত্ত্বে গণেশের অধিষ্ঠান মূলাধার চক্রে বলে বিবেচিত হয়।
কুণ্ডলিনী সাধনার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
যোগ ও তন্ত্রের কিছু ধারায় বলা হয়, কুণ্ডলিনী শক্তি মূলাধার অঞ্চলে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। সাধনার মাধ্যমে সেই শক্তির জাগরণ ও ঊর্ধ্বগমনকে আধ্যাত্মিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
এই ধারণার সঙ্গে গণেশের মূলাধারে অবস্থানের বিশ্বাসটিও যুক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ, গণেশ এখানে শুধুমাত্র একটি দেবমূর্তি নন; স্থিতি, ভিত্তি, বাধা অতিক্রম এবং নতুন যাত্রার সূচনার প্রতীক হিসেবেও তাঁকে ব্যাখ্যা করা হয়।
তাহলে গণেশ চতুর্থীর আসল বার্তা কী?
গণেশ চতুর্থীতে আমরা বাইরে গণেশের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করি, পুজো করি, মন্ত্রপাঠ করি এবং তাঁর কাছে বাধা দূর করার প্রার্থনা জানাই।
কিন্তু যোগদর্শনের এই ব্যাখ্যা আরও একটি প্রতীকী বার্তা দেয়—বাইরের পুজোর পাশাপাশি নিজের ভিতকেও শুদ্ধ ও স্থির করার প্রয়োজন রয়েছে।
মনকে স্থির রাখা, নিজের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং জীবনের বাধাগুলিকে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করা—এই বিষয়গুলিকেও গণেশ উপাসনার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক বার্তা হিসেবে দেখা যায়।
তাই গণেশের অবস্থানকে শুধু মন্দির বা পুজোমণ্ডপে সীমাবদ্ধ না রেখে, ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতীকী ভাষায় নিজের অন্তর্জগতের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।
শেষ কথা
‘মানবদেহে গণেশ কোথায়?’—এই প্রশ্নের যোগশাস্ত্রভিত্তিক উত্তর হল মূলাধার চক্র।
তবে এটি কোনও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত শারীরিক অবস্থান নয়; বরং যোগ, তন্ত্র ও আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি প্রাচীন প্রতীকী ধারণা।
গণেশ চতুর্থীর আবহে এই তত্ত্ব তাই একটি গভীর বার্তাই মনে করিয়ে দেয়—জীবনের বড় কোনও যাত্রা শুরু করার আগে যেমন গণেশকে স্মরণ করা হয়, তেমনই নিজের ভিতকেও শক্ত ও স্থির করা জরুরি।



