Tuesday, July 14, 2026
Google search engine
Homeপ্রযুক্তিবিদ্যুৎ বা ডিজেল নয়, এবার হাইড্রোজেনে ছুটবে ভারতীয় রেল! পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে নতুন...

বিদ্যুৎ বা ডিজেল নয়, এবার হাইড্রোজেনে ছুটবে ভারতীয় রেল! পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে নতুন যুগের সূচনা

ভারতীয় রেল গত কয়েক বছরে আধুনিকীকরণের পথে একের পর এক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। বন্দে ভারত এক্সপ্রেস, অমৃত ভারত, সেমি-হাইস্পিড করিডর এবং দ্রুত গতিতে বিদ্যুতায়নের পর এবার দেশের রেলব্যবস্থায় যুক্ত হতে চলেছে আরও একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি—হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন। পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে ভারতীয় রেল বহুদিন ধরেই এই প্রকল্পের উপর কাজ করছে। সেই পরিকল্পনাই এবার বাস্তবের পথে এগোচ্ছে।

রেল মন্ত্রকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনটি হরিয়ানার সোনপত থেকে জিন্দ পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হবে। এই প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে দেশের আরও একাধিক রুটে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব লাইনে সম্পূর্ণ বিদ্যুতায়ন এখনও সম্ভব হয়নি অথবা পরিবেশগত কারণে বিকল্প জ্বালানির প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে হাইড্রোজেন ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

এই বিশেষ ট্রেনে থাকবে প্রায় ছয় থেকে আটটি কোচ এবং এর সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণ ডিজেল ইঞ্জিনের পরিবর্তে এখানে ব্যবহৃত হবে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তি। এই ব্যবস্থায় হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, যা মোটরকে চালানোর জন্য শক্তি সরবরাহ করে। ফলে আলাদা করে ডিজেল পোড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ট্রেন চলার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড বা অন্যান্য ক্ষতিকর দূষিত গ্যাস নির্গত হয় না। ফুয়েল সেলের উপজাত হিসেবে মূলত জলীয় বাষ্প এবং অল্প পরিমাণ জল উৎপন্ন হয়। তাই পরিবেশ দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে এটি ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইড্রোজেন ট্রেনে ব্যবহৃত ব্যাটারি এবং ফুয়েল সেল একসঙ্গে কাজ করে। ট্রেন চলাকালীন অতিরিক্ত উৎপন্ন শক্তি ব্যাটারিতে সঞ্চিত হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেই শক্তি পুনরায় ব্যবহার করা যায়। এর ফলে জ্বালানির দক্ষতা বাড়ে এবং দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করাও সহজ হয়। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ভিত্তিতে একটি পূর্ণ ট্যাঙ্ক হাইড্রোজেন নিয়ে ট্রেনটি প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে সক্ষম হতে পারে, যদিও প্রকৃত দূরত্ব নির্ভর করবে রুট, যাত্রীসংখ্যা এবং পরিচালন ব্যবস্থার উপর।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে। জার্মানিতে বাণিজ্যিকভাবে হাইড্রোজেন ট্রেন চলাচল করছে এবং ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ একই পথে এগোচ্ছে। ভারতও সেই তালিকায় নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। দেশীয় প্রযুক্তি, নিজস্ব প্রকৌশলী এবং ভারতীয় রেলের গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থাগুলির যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের গণপরিবহনে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানোই এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতীয় রেলের এই উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। হাইড্রোজেন উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং নিরাপদ রিফুয়েলিং অবকাঠামো তৈরি করতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তিগত এই চ্যালেঞ্জগুলি সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারলে আগামী কয়েক বছরে ভারতের রেল পরিবহণ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

পর্যটন ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চল, ঐতিহ্যবাহী রেলপথ এবং পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকায় হাইড্রোজেন ট্রেন চালু হলে একদিকে যেমন দূষণ কমবে, তেমনই আধুনিক প্রযুক্তির অভিজ্ঞতাও পাবেন যাত্রীরা। ফলে দেশীয় পর্যটনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও ভারতীয় রেল আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

ভারতীয় রেল ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পরিবহণ নেটওয়ার্ক। সেই নেটওয়ার্ককে আরও আধুনিক, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব করে তোলার লক্ষ্যে হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। পরীক্ষামূলক যাত্রা সফল হলে ভবিষ্যতে দেশের আরও বহু রুটে এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতীয় রেলের আগামী দিনের যাত্রাপথে হাইড্রোজেন প্রযুক্তি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে, যা দেশের পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও সবুজ, আধুনিক এবং টেকসই করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments