Tuesday, July 14, 2026
Google search engine
Homeঅন্যান্যজামাইষষ্ঠীতে কেন তালপাতার পাখা ব্যবহার করা হয়? ‘ষাট ষাট ষাট’ বলার রহস্য...

জামাইষষ্ঠীতে কেন তালপাতার পাখা ব্যবহার করা হয়? ‘ষাট ষাট ষাট’ বলার রহস্য জানুন

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় একটি উৎসব হলো জামাইষষ্ঠী। জ্যৈষ্ঠ মাসের তীব্র গরমের মধ্যেও এই বিশেষ দিনকে ঘিরে বাঙালি পরিবারে তৈরি হয় এক আলাদা আবহ। জামাইকে নিমন্ত্রণ, পছন্দের খাবারের আয়োজন, নতুন পোশাক এবং নানা রকম রীতিনীতি—সব মিলিয়ে এটি শুধুমাত্র একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। এখন ঘরে ঘরে এসি, কুলার এবং আধুনিক বৈদ্যুতিক পাখা রয়েছে। তবুও জামাইষষ্ঠীর দিন বহু বাড়িতে দেখা যায় শাশুড়ি নিজের হাতে তালপাতার পাখা নেড়ে জামাইকে হাওয়া করছেন। একই সঙ্গে অনেকেই উচ্চারণ করেন—“ষাট ষাট ষাট”। প্রশ্ন উঠতেই পারে, আধুনিক যুগেও কেন এই রীতি টিকে রয়েছে? এর পিছনে কি শুধুই লোকাচার, নাকি রয়েছে গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য?

জামাইষষ্ঠীর সঙ্গে মা ষষ্ঠীর সম্পর্ক

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী ষষ্ঠী সন্তানদের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে পূজিত হন। বাঙালি সমাজে তিনি সন্তানসুখ, দীর্ঘায়ু ও পরিবারের কল্যাণের প্রতীক। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে তাঁর বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

এই দিন মায়েরা নিজেদের সন্তানদের পাশাপাশি জামাইয়ের মঙ্গল কামনাও করেন। কারণ বাঙালি সংস্কৃতিতে জামাইকে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দেখা হয়। তাই জামাইষষ্ঠী শুধুমাত্র আপ্যায়নের উৎসব নয়, এটি আশীর্বাদ ও শুভকামনারও একটি দিন।

কেন ব্যবহার করা হয় তালপাতার পাখা?

তালপাতার পাখা একসময় বাংলার গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বিদ্যুৎবিহীন যুগে গরমের হাত থেকে রেহাই পেতে মানুষ এই পাখার উপরই নির্ভর করত।

তবে জামাইষষ্ঠীর ক্ষেত্রে তালপাতার পাখার গুরুত্ব শুধুমাত্র ব্যবহারিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রতীকী অর্থও। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তালগাছ শক্তি, স্থায়িত্ব এবং মঙ্গলসূচকতার প্রতীক। সেই কারণে তালপাতার পাখা দিয়ে জামাইকে বাতাস করা মানে শুধু আরাম দেওয়া নয়, তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করাও।

অনেক গবেষক মনে করেন, এই রীতির মাধ্যমে বাঙালি সমাজে অতিথি আপ্যায়নের যে ঐতিহ্য রয়েছে, তারই প্রকাশ ঘটে। শাশুড়ির হাতে পাখা নাড়া আসলে স্নেহ, যত্ন এবং পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতার প্রতীক।

“ষাট ষাট ষাট” বলার অর্থ কী?

জামাইষষ্ঠীর সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক রীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো “ষাট ষাট ষাট” উচ্চারণ।

এই শব্দবন্ধের কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যা না থাকলেও লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, এটি মূলত অশুভ দৃষ্টি বা নজর থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রতীকী প্রার্থনা। গ্রামীণ বাংলায় বিশ্বাস করা হতো, বিশেষ দিনে অতিরিক্ত প্রশংসা বা মানুষের নজর কারও অমঙ্গল ডেকে আনতে পারে। তাই শুভ শক্তির আহ্বান এবং অশুভ শক্তিকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে এই ধরনের শব্দ উচ্চারণের প্রচলন তৈরি হয়।

আরও একটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যা হলো, “ষাট” শব্দটি “ষষ্ঠী” নামের সঙ্গেও ধ্বনিগতভাবে সম্পর্কযুক্ত। ফলে তিনবার “ষাট” বলার মাধ্যমে দেবী ষষ্ঠীর আশীর্বাদ কামনা করা হয় বলে অনেকের ধারণা।

৬ সংখ্যার বিশেষ তাৎপর্য

জামাইষষ্ঠীর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে ৬ সংখ্যার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অনেক পরিবারে ৬ রকম ফল, ৬ রকম মিষ্টি বা ৬ ধরনের উপহার দেওয়ার প্রথা রয়েছে। এর কারণ, এই উৎসবের মূল ভিত্তি হলো ষষ্ঠী তিথি।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সংখ্যা সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি এবং দীর্ঘ জীবনের প্রতীক। ফলে জামাইয়ের সুস্থতা ও কল্যাণ কামনায় এই সংখ্যার বিশেষ ব্যবহার দেখা যায়।

আধুনিক যুগেও কেন টিকে আছে এই রীতি?

বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে অভ্যস্ত হলেও জামাইষষ্ঠীর এই ঐতিহ্য এখনও হারিয়ে যায়নি। কারণ এটি শুধুমাত্র ধর্মীয় বা সামাজিক আচার নয়, বরং পারিবারিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ।

তালপাতার পাখা, “ষাট ষাট ষাট” উচ্চারণ কিংবা বিশেষ আপ্যায়ন—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে সম্পর্কের প্রতি সম্মান, আন্তরিকতা এবং ভালোবাসা। এই কারণেই এসি বা আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও জামাইষষ্ঠীর এই প্রাচীন রীতিগুলি বাঙালির সংস্কৃতির অংশ হয়ে আজও টিকে রয়েছে।

উপসংহার

জামাইষষ্ঠীতে তালপাতার পাখা ব্যবহার করা কিংবা “ষাট ষাট ষাট” বলা কোনও সাধারণ রীতি নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বাংলার লোকসংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন এবং শুভকামনার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য। আধুনিকতার ছোঁয়ায় জীবনযাত্রা বদলালেও এইসব ছোট ছোট প্রথাই আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে।

তাই পরেরবার জামাইষষ্ঠীতে যদি আপনার শাশুড়ি তালপাতার পাখা নেড়ে “ষাট ষাট ষাট” বলেন, তাহলে বুঝে নিন—এটি কেবল একটি শব্দ নয়, বরং ভালোবাসা, আশীর্বাদ এবং দীর্ঘ জীবনের এক আন্তরিক প্রার্থনা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments