জাপান মানেই ভূমিকম্পের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই। সেই লড়াইকে আরও নিরাপদ করতে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের প্রকৌশল প্রযুক্তির ওপর কাজ করছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে এমন এক অভিনব ব্যবস্থা, যা ভূমিকম্প শুরু হওয়ার মুহূর্তেই একটি বাড়িকে অল্প উচ্চতায় মাটি থেকে আলাদা করে দিতে পারে। এই প্রযুক্তিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তিটির নাম Levitation Base Isolation। এটি তৈরি করেছে জাপানের Air Danshin Systems। মূল ধারণা হলো, ভবনকে সাময়িকভাবে মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভূমিকম্পের কম্পনের সরাসরি প্রভাব কমিয়ে দেওয়া।
কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?
সাধারণ ভবনের ভিত সরাসরি মাটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ফলে ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পন ভবনের কাঠামোয় পৌঁছে যায়।
কিন্তু এই নতুন ব্যবস্থায় ভবনের নিচে বিশেষ ধরনের এয়ার চেম্বার তৈরি করা হয়। ভূমিকম্পের প্রাথমিক কম্পন শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উচ্চচাপের বাতাস সেই চেম্বারে প্রবেশ করে এবং পুরো ভবনকে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার উপরে তুলে দেয়। এর ফলে ভবন ও মাটির মধ্যে সরাসরি সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সেন্সর কীভাবে ভূমিকম্প শনাক্ত করে?
এই প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অত্যন্ত সংবেদনশীল সিসমিক সেন্সর।
সেন্সর মাটির নিচের প্রাথমিক কম্পন শনাক্ত করেই সঙ্গে সঙ্গে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এয়ার কম্প্রেসারকে সংকেত পাঠায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাতাস এয়ার চেম্বারে প্রবেশ করে এবং ভবনটি সামান্য ওপরে উঠে যায়।
কম্পন শেষ হলে নিয়ন্ত্রিতভাবে বাতাস বের করে ভবনটিকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।
বিদ্যুৎ না থাকলে কী হবে?
এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে।
সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় ব্যাকআপ জরুরি ব্যাটারি রাখা হয়, যাতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলেও প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত সিস্টেমটি কাজ করতে পারে।
পরীক্ষায় কী ফল মিলেছে?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে তৈরি শক্তিশালী কম্পনের সময় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা ভবনের ভেতরে রাখা আসবাবপত্র প্রায় স্থির অবস্থায় ছিল। এমনকি একটি কাঁচের গ্লাসও উল্টে যায়নি বলে সংস্থার দাবি।
তবে এই ফলাফল মূলত পরীক্ষাগারভিত্তিক প্রদর্শনের ওপর নির্ভরশীল।
ইতিমধ্যেই কোথায় ব্যবহার হচ্ছে?
Air Danshin Systems-এর তথ্য অনুযায়ী, জাপানে ৯০টিরও বেশি আবাসিক ভবনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
সংস্থার দাবি, প্রচলিত কিছু ভূমিকম্প-নিরোধক ব্যবস্থার তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল হওয়ায় ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সব ধরনের ভূমিকম্পে কি সমান কার্যকর?
এই প্রযুক্তি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা থাকলেও কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে এসেছে।
কিছু প্রকৌশল বিশেষজ্ঞের মতে, অত্যন্ত শক্তিশালী বা একাধিক দিক থেকে একসঙ্গে আঘাত হানা ভূমিকম্প এবং প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সময় এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আরও বিস্তৃত বাস্তব পরীক্ষা প্রয়োজন।
অর্থাৎ প্রযুক্তিটি আশাব্যঞ্জক হলেও, সব ধরনের দুর্যোগে একই রকম ফল দেবে—এমন দাবি এখনও নিশ্চিতভাবে করা যায় না।
কেন এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ?
জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে নতুন ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে পরীক্ষায় এই প্রযুক্তি সফল হয় এবং বাণিজ্যিক ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ভূমিকম্পে ভবনের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন।
তবে প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
সংক্ষেপে
- জাপানের Air Danshin Systems তৈরি করেছে ভাসমান ভিত্তিভিত্তিক ভূমিকম্প প্রতিরোধ প্রযুক্তি।
- ভূমিকম্প শনাক্ত হলে ভবনকে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার ওপরে তুলে দেয় এয়ার চেম্বার।
- পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করে সিসমিক সেন্সর ও উচ্চচাপের এয়ার কম্প্রেসার।
- ব্যাকআপ ব্যাটারির কারণে বিদ্যুৎ না থাকলেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবস্থা সচল থাকতে পারে।
- প্রযুক্তিটি ইতিমধ্যে জাপানের ৯০টিরও বেশি আবাসিক ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে বলে সংস্থার দাবি।
- তবে অত্যন্ত তীব্র বা বহুমুখী ভূমিকম্পে এর কার্যকারিতা নিয়ে এখনও আরও গবেষণার প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মত প্রকাশ করেছেন।



