Tuesday, October 13, 2026
Google search engine
Homeসিনেদুনিয়াবলি দুনিয়া‘অমিতাভের কিছু হলে জয়া সাদা শাড়ি পরবে, তোমার বউও পরবে!’ কেন এমন...

‘অমিতাভের কিছু হলে জয়া সাদা শাড়ি পরবে, তোমার বউও পরবে!’ কেন এমন হুমকি দিয়েছিলেন বিগ বি-র মা?

অমিতাভ বচ্চন আর শ্রীদেবী—দু’জনেই তখন বলিউডের বিশাল তারকা। তাঁদের একসঙ্গে পর্দায় দেখার উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু সেই বহু প্রতীক্ষিত ছবির শুটিং করতে গিয়ে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল গোটা ইউনিটকে, তা কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানাতে পা

চারদিকে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি। রাস্তায় সশস্ত্র সেনা। আকাশে নজরদারি। আর শুটিং ইউনিটের সামনে-পিছনে সামরিক ট্যাঙ্ক!

ছবিটির নাম ‘খুদা গওয়াহ’।

১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল আফগানিস্তানে। তবে শুটিং হয়েছিল মূলত ১৯৯১ সালে, যখন দেশটি ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল।

আফগানিস্তানে যাওয়ার আগে প্রযোজককে কেন হুমকি দিয়েছিলেন তেজি বচ্চন?

আফগানিস্তানের পরিস্থিতি যে কতটা বিপজ্জনক ছিল, তা নিয়ে ছবির প্রযোজক মনোজ দেশাই নিজেই পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করেছেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অমিতাভকে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে পরিবার স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত ছিল।

অমিতাভ বচ্চনের মা তেজি বচ্চন নাকি মনোজ দেশাইকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছিলেন—অমিতাভের যদি কিছু হয় এবং জয়া বিধবা হন, তাহলে তাঁর নিজের স্ত্রীকেও সাদা শাড়ি পরতে হবে।

অর্থাৎ, ছেলেকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রযোজককে কার্যত ভয়াবহ সতর্কবার্তাই দিয়েছিলেন তিনি। এই ঘটনাটি মনোজ দেশাই নিজেই পরবর্তী সাক্ষাৎকারে বলেছেন এবং একাধিক সংবাদমাধ্যম সেই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে।

শুধু তেজি বচ্চন নন, মনোজ দেশাইয়ের দাবি অনুযায়ী শ্রীদেবীর মাও তাঁকে একইভাবে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল—শ্রীদেবীর কিছু হলে মনোজ যেন আফগানিস্তান থেকে ফিরে না আসেন।

কিন্তু এত ঝুঁকি নিয়ে আফগানিস্তানেই শুটিং কেন?

এর পেছনে ছিল ছবির গল্পের প্রয়োজন।

‘খুদা গওয়াহ’-এর কাহিনিতে আফগানিস্তানের পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী বুজকাশি খেলার দৃশ্য ছবির অন্যতম আকর্ষণ ছিল।

অমিতাভ বচ্চন নিজেই পরে জানিয়েছিলেন, তিনি আফগানিস্তানেই সেই দৃশ্যের শুটিং করতে চেয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তৎকালীন আফগান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ হিন্দি সিনেমার ভক্ত ছিলেন এবং ভারতীয় দলকে সেখানে শুটিংয়ের জন্য স্বাগত জানিয়েছিলেন।

তাই স্টুডিও বা অন্য কোনও দেশে সেট বানিয়ে আফগানিস্তানকে নকল করার বদলে বাস্তব লোকেশন বেছে নেওয়া হয়েছিল।

সামনে-পিছনে ট্যাঙ্ক, মাঝখানে সিনেমার ইউনিট!

এরপরই শুরু হয় অবিশ্বাস্য অধ্যায়।

প্রযোজক মনোজ দেশাইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, শুটিং চলাকালীন ইউনিটের সামনে এবং পিছনে সামরিক ট্যাঙ্ক থাকত।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, কখনও সামনে ৪-৫টি এবং পিছনেও ৪-৫টি ট্যাঙ্ক থাকত। অন্য একটি সাম্প্রতিক বর্ণনায় তিনি তিনটি ট্যাঙ্ক সামনে ও তিনটি পিছনে থাকার কথাও বলেছেন।

অর্থাৎ সংখ্যার বর্ণনায় তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু সামরিক নিরাপত্তার মধ্যে ট্যাঙ্কের পাহারায় শুটিং হয়েছিল—এই বিষয়টি একাধিক সূত্রে উঠে এসেছে।

আরও চমকপ্রদ বিষয়, মনোজ দেশাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সিনেমাটোগ্রাফার W.B. Rao কখনও ট্যাঙ্কের ওপর ক্যামেরা বসিয়েও শট নিয়েছিলেন।

অমিতাভ বচ্চনও পরে স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছিলেন, সেটের পাশে আর্মি ট্যাঙ্ক থাকত এবং আকাশে যুদ্ধবিমান নজরদারি করত। তাঁর কাছে গোটা পরিবেশটাই যেন বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের মতো মনে হয়েছিল।

রাষ্ট্রপতি নাজিবুল্লাহ কীভাবে সাহায্য করেছিলেন?

তৎকালীন আফগান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ-র প্রশাসন ভারতীয় সিনেমার এই ইউনিটকে বিশেষ নিরাপত্তা দিয়েছিল—এ বিষয়ে অমিতাভ বচ্চন ও মনোজ দেশাই, দু’জনেরই বক্তব্য রয়েছে।

অমিতাভের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তাঁরা আফগানিস্তানে VVIP রাষ্ট্রীয় অতিথির মতো আতিথেয়তা পেয়েছিলেন। নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র এসকর্ট দেওয়া হয়েছিল এবং বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতেও বিশেষ ব্যবস্থা ছিল।

এমনকি কাবুল থেকে ফেরার আগে নাজিবুল্লাহ তাঁদের রাষ্ট্রপতির বাসভবনে ডেকে ‘Order of Afghanistan’ সম্মানে ভূষিত করেছিলেন বলে অমিতাভ জানিয়েছেন।

তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—রাষ্ট্রপতি নিজে ২১ দিন সেটে দাঁড়িয়ে থেকে শুটিং পরিচালনা করেছিলেন, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং সূত্রগুলো বলছে, তাঁর সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী ইউনিটকে সুরক্ষা দিয়েছিল।

রাজীব গান্ধীরও কি ভূমিকা ছিল?

এই গল্পের সঙ্গে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নামও উঠে আসে।

পরিচালক মুকুল আনন্দ ১৯৯৬ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, অমিতাভের সঙ্গে রাজীব গান্ধীর ঘনিষ্ঠতার কারণে রাজীব ব্যক্তিগতভাবে নাজিবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং অমিতাভ আফগানিস্তানে গেলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন।

মনোজ দেশাইও পরে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন—রাজীব গান্ধী নাজিবুল্লাহর সঙ্গে কথা বলে ভারতীয় সিনেমার শিল্পীদের নিরাপত্তার বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলে তাঁর দাবি।

অর্থাৎ, এই অংশটি শুধুই সিনেমার প্রচারকাহিনি নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরবর্তী সাক্ষাৎকারে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

সত্যিই কি ২১ দিন চলেছিল শুটিং?

এখানেও রয়েছে একটি আকর্ষণীয় তথ্য।

মনোজ দেশাই ২০২২ সালের সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আফগানিস্তানে শুটিং হয়েছিল ২১ দিন।

কিন্তু অন্য একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে সময়কাল ১৮ দিন বলা হয়েছে। এমনকি অমিতাভ বচ্চনের পুরনো স্মৃতিচারণও আফগানিস্তানে তাঁর সফর ও শুটিংয়ের সময়কার ঘটনাগুলিকে আলাদাভাবে বর্ণনা করে।

তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। নিরাপদভাবে বলা যায়, ১৯৯১ সালে ‘খুদা গওয়াহ’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আফগানিস্তানে সামরিক নিরাপত্তার মধ্যে শুট করা হয়েছিল।

‘তালিবান’ কি তখনই শুটিং আটকে দিতে চেয়েছিল?

এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ভুলভাবে বলা হয়।

১৯৯১ সালে ‘খুদা গওয়াহ’-এর শুটিংয়ের সময় আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ চলছিল। কিন্তু তালিবান ১৯৯৪ সালে গঠিত হয় এবং ১৯৯৬ সালে কাবুল দখল করে।

তাই ১৯৯১ সালের শুটিংকে সরাসরি ‘তালিবান-হুমকির মধ্যে’ হয়েছিল বলা ঐতিহাসিকভাবে ঠিক নয়।

তৎকালীন বিপদের মূল প্রেক্ষাপট ছিল মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে নাজিবুল্লাহ সরকারের সংঘাত এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের সামগ্রিক অস্থিরতা।

কিছু পরবর্তী প্রতিবেদনে শুটিংয়ের সময় স্থানীয় সংঘাত থামানোর কথাও বলা হয়েছে। তবে এই অংশের বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, তাই এটিকে নিশ্চিত সরকারি তথ্য হিসেবে না বলাই ভালো।

যুদ্ধের মাঝেও আফগানিস্তানে অমিতাভ-উন্মাদনা

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল স্থানীয় মানুষের মধ্যে অমিতাভ বচ্চনের জনপ্রিয়তা।

অমিতাভ নিজেই লিখেছিলেন, আফগানিস্তানে তাঁরা সাধারণ পর্যটকের মতো নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা পেয়েছিলেন। স্থানীয় মানুষজনের আতিথেয়তা এবং হিন্দি সিনেমার প্রতি তাঁদের আগ্রহ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

মনোজ দেশাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, শুটিং চলাকালীন আফগানিস্তানের সরকারি টেলিভিশনে অমিতাভ ও শ্রীদেবীর পুরনো সিনেমা সম্প্রচারের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

অর্থাৎ, যুদ্ধের উত্তাপের মাঝেও বলিউডের দুই জনপ্রিয় তারকাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক উন্মাদনা।

শেষ পর্যন্ত নিরাপদেই ফিরেছিলেন সবাই

সব ভয়, হুমকি এবং সামরিক নিরাপত্তার মধ্যেও ‘খুদা গওয়াহ’-এর আফগানিস্তান শুটিং শেষ হয়।

অমিতাভ, শ্রীদেবী এবং গোটা ইউনিট নিরাপদেই দেশে ফিরে আসে। আর পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯২ সালের ৮ মে, মুক্তি পায় ‘খুদা গওয়াহ’। ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে শ্রীদেবী, ড্যানি ডেনজংপা, নাগার্জুন, শিলপা শিরোদকর-সহ একাধিক তারকা অভিনয় করেছিলেন।

আজ এত বছর পরেও ছবিটির আফগানিস্তান শুটিংয়ের গল্প বলিউডের অন্যতম আলোচিত শুটিং-অভিজ্ঞতা হয়ে রয়েছে।

কারণ এখানে শুধু সিনেমার গল্প ছিল না—ছিল বাস্তব যুদ্ধের ভয়, পরিবারের উদ্বেগ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সামরিক ট্যাঙ্ক এবং তার মাঝখানে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একদল চলচ্চিত্রকর্মী।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments