সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে কলকাতা-মুম্বই?
তবে কি অদূর ভবিষ্যতেই এই দুই শহরের অস্তিত্ব মুছে যাবে?
সোশ্যাল মিডিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এমন আতঙ্কজনক দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রসংঘের সাম্প্রতিক রিপোর্টের তথ্য।
কিন্তু বাস্তব ছবিটা কি সত্যিই এতটা ভয়াবহ? সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যে বাড়ছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু কলকাতা বা মুম্বই শিগগিরই সমুদ্রের নিচে চলে যাবে—রাষ্ট্রসংঘ এমন কোনও ঘোষণা করেনি।
বরং ৩১ আগস্ট ২০২৬-এ রাষ্ট্রসংঘের প্রকাশিত তথ্য বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির গতি দ্রুত বাড়ছে এবং এর প্রভাব ইতিমধ্যেই উপকূলীয় বসতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ছে।
২০২৪ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির রেকর্ড কত?
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা WMO-র তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বৈশ্বিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি হার ছিল প্রায় ৩.৪ মিলিমিটার প্রতি বছর। ২০১৪ থেকে ২০২৩-এর দশকে সেই হার বেড়ে হয়েছিল প্রায় ৪.৭ মিলিমিটার প্রতি বছর।
আর ২০২৪ সালে এক বছরে বিশ্ব সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয় ৫.৯ মিলিমিটার। রাষ্ট্রসংঘও ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যায় এই ৫.৯ মিলিমিটারের রেকর্ড বৃদ্ধির কথা তুলে ধরেছে।
অর্থাৎ বিপদের জায়গাটি বাস্তব—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির গতি কমার বদলে দ্রুততর হচ্ছে।
কেন বাড়ছে সমুদ্রের জল?
এর প্রধান কারণ দু’টি।
প্রথমত, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের জলও উষ্ণ হচ্ছে। উষ্ণ জল প্রসারিত হয় এবং তার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে।
দ্বিতীয়ত, স্থলভাগের বরফ—বিশেষ করে হিমবাহ এবং গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর—গলে অতিরিক্ত জল সমুদ্রে যোগ করছে। WMO জানিয়েছে, সমুদ্রের উষ্ণতা এবং স্থলভাগের বরফ গলে যাওয়া—দুটিই সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির প্রধান চালক।
এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্র উষ্ণ হয়ে ওঠার প্রভাব শুধু জলস্তর বাড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং উপকূলীয় অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ছে।
৭৭ কোটি মানুষ কি সত্যিই ডুবে যাওয়ার মুখে?
এই দাবির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ৭৭ কোটি মানুষ বা আনুমানিক প্রতি ১০ জনে একজন উচ্চ জোয়ারের রেখা থেকে পাঁচ মিটারের কম উচ্চতায় বসবাস করেন।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই ৭৭ কোটি মানুষ নিশ্চিতভাবে সমুদ্রের জলে ডুবে যাবেন বা শিগগিরই সবাইকে ঘরছাড়া হতে হবে।
এটি মূলত বোঝায় যে বিপুল সংখ্যক মানুষ এমন নিচু উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করছেন, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জলোচ্ছ্বাস, উপকূলীয় বন্যা এবং লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অর্থাৎ “৭৭ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে চলেছেন” বলা তথ্যটির অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা।
কলকাতা কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
কলকাতার ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির কারণে নয়।
শহরটি বৃহত্তর গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত। বদ্বীপ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, নদীর জলস্তর বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং স্থানীয়ভাবে ভূমি বসে যাওয়ার মতো একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
IPCC জানিয়েছে, বদ্বীপ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় ভূমি অবনমন বা subsidence একসঙ্গে ঘটলে আপেক্ষিক সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির ঝুঁকি আরও বাড়ে। কোথাও কোথাও স্থানীয় ভূমি বসে যাওয়ার হার জলবায়ুজনিত সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির তুলনায় আরও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই কলকাতার ক্ষেত্রে প্রশ্নটা শুধু “সমুদ্র কবে শহরে ঢুকবে?” নয়। বরং শহরের ড্রেনেজ, অতিবৃষ্টি, নদী ও বদ্বীপের ভূপ্রকৃতি, ভূমি অবনমন এবং উপকূলীয় জলস্তরের পরিবর্তন—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
মুম্বই কি কলকাতার মতোই বিপদের মুখে?
মুম্বইও একটি ঘনবসতিপূর্ণ নিম্নভূমি উপকূলীয় মহানগর। তাই সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি এবং চরম জোয়ার বা উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।
IPCC-র মূল্যায়নে মুম্বইকে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির কারণে উচ্চ অর্থনৈতিক ঝুঁকির শহরগুলির একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি মডেলভিত্তিক মূল্যায়নে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির কারণে মুম্বইয়ের ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল। তবে এগুলি ঝুঁকি ও ক্ষতির মডেলিং, শহরটি নির্দিষ্ট কোনও বছরে পানির নিচে চলে যাবে—এমন ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
সাম্প্রতিক ভারতীয় গবেষণাতেও মুম্বই ও কলকাতাকে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধিজনিত বন্যার ঝুঁকিতে থাকা প্রধান উপকূলীয় শহরগুলির মধ্যে রাখা হয়েছে। তবে সেই গবেষণার ফলাফলও বিভিন্ন জলবায়ু পরিস্থিতি, নির্গমন এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতির উপর নির্ভরশীল।
শুধু সমুদ্রের জলই কি বিপদ?
একেবারেই নয়।
উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি হলে নোনা জল মাটির নিচের মিষ্টি জলের উৎসে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর ফলে কৃষি, পানীয় জল এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। WMO এবং IPCC—দুই সংস্থাই সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির সঙ্গে লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশ ও জলসম্পদ সংক্রান্ত সমস্যার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে।
বিশেষ করে বদ্বীপ ও নিচু উপকূলীয় এলাকায় এই সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।
বাড়বে কি জলবাহিত রোগ?
উপকূলীয় বন্যা ও অতিবৃষ্টির সঙ্গে নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যা তৈরি হলে জনস্বাস্থ্যের উপর চাপ বাড়তে পারে। বন্যার জল ও দূষিত নিকাশি পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেলে পানীয় জলের গুণমান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে “সমুদ্র বাড়লেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে”—এমন নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করা ঠিক নয়। প্রকৃত ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে স্থানীয় নিকাশি ব্যবস্থা, পানীয় জলের পরিকাঠামো, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির উপর।
উপকূলীয় অর্থনীতির উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
উপকূলীয় শহরগুলির অর্থনীতি সমুদ্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বন্দর, মৎস্য, পর্যটন, পরিবহন এবং উপকূলীয় শিল্প—সবকিছুই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।
WMO জানিয়েছে, সমুদ্র উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।
কলকাতা ও মুম্বইয়ের মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরের ক্ষেত্রে তাই বিপদের মূল্যায়ন শুধু জনসংখ্যা দিয়ে নয়, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য ক্ষতি দিয়েও করতে হয়।
তাহলে কি কলকাতা-মুম্বই একদিন পুরোপুরি ডুবে যাবে?
বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য থেকে এমন কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
IPCC-র বক্তব্য হল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় শহরগুলির ঝুঁকি ক্রমশ বাড়াবে এবং এই ঝুঁকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যৎ ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন, স্থানীয় ভূমি অবনমন, নগর পরিকল্পনা এবং মানুষ কতটা দ্রুত অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা নেয় তার উপর।
অর্থাৎ, “কলকাতার শেষ দিন ঘনিয়ে এসেছে”—এই ধরনের শিরোনাম আতঙ্ক তৈরি করতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রস্তুতি কতটা?
সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি থামানো কঠিন হলেও ঝুঁকি কমানোর উপায় রয়েছে।
শহরে উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাধার ও জলাভূমি সংরক্ষণ, উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলের সঠিক ভূমি ব্যবহার, বন্যা-সহনশীল পরিকাঠামো, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ।
IPCC-র মতে, বর্তমান অভিযোজন ও প্রশমনমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট না হলে শতাব্দীর শেষের দিকে উপকূলীয় শহরগুলিতে বন্যা ও ক্ষতির ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে।
তাই লড়াইটা শুধু “সমুদ্রের সঙ্গে” নয়—শহর কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছে, তার সঙ্গেও।
শেষ কথা: আতঙ্ক নয়, সতর্ক হওয়াই জরুরি
রাষ্ট্রসংঘের সাম্প্রতিক বার্তা সত্যিই সতর্কবার্তা বহন করছে। ২০২৪ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির রেকর্ড হার, ক্রমবর্ধমান সমুদ্রের উষ্ণতা এবং উপকূলীয় জনবসতির বিপুল ঝুঁকি—সবই দেখাচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আর ভবিষ্যতের কোনও দূরের সমস্যা নয়।
কিন্তু সেই তথ্যকে “কলকাতা ও মুম্বই শিগগিরই পুরোপুরি জলের নিচে চলে যাবে” অথবা “৭৭ কোটি মানুষ নিশ্চিতভাবে ঘরছাড়া হতে চলেছেন”—এভাবে উপস্থাপন করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
বরং সত্যিটা আরও গুরুত্বপূর্ণ। জলস্তর বাড়ছে, ঝুঁকি বাড়ছে, এবং কলকাতা-মুম্বইয়ের মতো ঘনবসতিপূর্ণ উপকূলীয় শহরগুলিকে এখন থেকেই আরও শক্তিশালী নগর পরিকল্পনা ও জলবায়ু অভিযোজনের পথে যেতে হবে।
কারণ ভবিষ্যৎ শহরকে বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর সময় সমুদ্রের জল রাস্তায় উঠে আসার পর নয়—তার অনেক আগেই।



