সিঁথিতে সিঁদুর, অথচ জীবনে কোনওদিন বিয়ে করেননি—ভারতীয় সঙ্গীতের কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরকে ঘিরে এই প্রশ্ন বহু বছর ধরেই মানুষের কৌতূহলের বিষয়।
তাঁর সাদা শাড়ি, সাদামাটা সাজ আর সিঁথির সিঁদুর—সব মিলিয়ে লতা মঙ্গেশকরের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নানা জল্পনা। তবে সিঁদুরের সঙ্গে কোনও গোপন বিয়ের সম্পর্ক ছিল কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে একটি পুরনো সাক্ষাৎকারের স্মৃতি এবং তাঁর জীবনের এক বিশেষ সম্পর্কের গল্প।
বিয়ে না করেও কেন সিঁদুর পরতেন লতা?
লতা মঙ্গেশকর কখনও বিবাহিত ছিলেন না—এটি তাঁর জীবনের নথিভুক্ত তথ্য। কিন্তু অভিনেত্রী তবস্সুম এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন, তিনি একবার লতাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন, বিয়ে না করেও তিনি কেন সিঁদুর পরেন।
তবস্সুমের বর্ণনা অনুযায়ী, লতা তখন মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন—“এটা সঙ্গীতের নামে সিঁদুর।” অর্থাৎ, তাঁর কাছে সিঁদুরের সঙ্গে কোনও স্বামীর পরিচয় নয়, বরং সঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর নিবেদন জড়িয়ে ছিল বলে তবস্সুম স্মরণ করেছিলেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই বক্তব্যটি তবস্সুমের স্মৃতিচারণ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। লতা মঙ্গেশকরের নিজের কোনও প্রাথমিক সাক্ষাৎকার বা লিখিত নথি থেকে এই উক্তির স্বাধীন নিশ্চিতকরণ সহজে পাওয়া যায় না।
তাই এটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্যের বদলে তবস্সুমের বর্ণিত একটি স্মৃতি হিসেবে দেখা বেশি নির্ভুল।
তাহলে কি লতার জীবনে প্রেম এসেছিল?
লতা মঙ্গেশকরের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলির একটি হল রাজ সিংহ ডুঙ্গারপুর।
ডুঙ্গারপুরের রাজপরিবারের সন্তান রাজ সিংহ ছিলেন ক্রিকেটার এবং পরে ক্রিকেট প্রশাসক। তিনি রাজস্থান ও সেন্ট্রাল জোনের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছিলেন। পরবর্তীতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের ম্যানেজার এবং BCCI-এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
প্রকাশিত জীবনী ও সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, লতার ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরের সঙ্গে রাজ সিংহের বন্ধুত্বের সূত্রেই তাঁদের পরিচয় হয়। ষাটের দশকে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন সেই সম্পর্ক বিয়েতে পরিণত হল না?
এই সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরে নানা গল্প প্রকাশিত হয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত বর্ণনা হল, রাজ সিংহের রাজপরিবার তাঁদের সম্পর্ককে মেনে নেয়নি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। “লতার সাধারণ পরিবারের মেয়ে হওয়াই বিয়ে না হওয়ার একমাত্র কারণ”—এমন সরল সিদ্ধান্তের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক নথি নেই।
বরং পরবর্তী সংবাদ প্রতিবেদনগুলিতে বলা হয়েছে, রাজ সিংহের পরিবার এই সম্পর্কের বিরোধিতা করেছিল এবং লতার পরিবারও তাঁর জন্য অন্য ধরনের বিবাহের প্রত্যাশা করেছিল। শেষ পর্যন্ত দুজনেই বিয়ে করেননি।
অর্থাৎ, তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত রোম্যান্টিক গল্পের অনেকটাই সংবাদমাধ্যমের বর্ণনা ও স্মৃতিচারণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
লতা নিজে সম্পর্কটি নিয়ে কী বলেছিলেন?
এই গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ সম্ভবত এখানেই।
রাজ সিংহকে নিয়ে তাঁকে যখন ‘one true love’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, তখন লতার কাছে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়। Hindustan Times-এর একটি প্রতিবেদনে তাঁর উত্তর উদ্ধৃত করা হয়েছে—
“There are some things only for the heart to know. Let me keep it that way.”
বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়—কিছু বিষয় শুধু হৃদয়ের জানার জন্যই থাক; সেগুলো সেভাবেই থাকতে দেওয়া হোক।
এই উত্তর থেকেই বোঝা যায়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি তিনি প্রকাশ্যে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে চাননি।
তাহলে সাদা শাড়ি কি বিধবার পরিচয় ছিল?
এটিও একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা।
লতা মঙ্গেশকরকে জীবনের অধিকাংশ সময় সাদা শাড়িতে দেখা গেলেও, তিনি বিধবা ছিলেন বলে সাদা শাড়ি পরতেন—এমন তথ্য নেই।
বরং লতা নিজেই একাধিকবার সাদা রঙের প্রতি তাঁর ছোটবেলা থেকেই ভালো লাগার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ছোটবেলায় তাঁর পোশাকও সাদা থাকত। পরে কিছুদিন বিভিন্ন রঙের শাড়ি পরলেও শেষ পর্যন্ত সাদা রঙেই ফিরে আসেন।
অর্থাৎ তাঁর সাদা শাড়িকে সরাসরি বৈবাহিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়।
সাদা শাড়ি কেন হয়ে উঠেছিল তাঁর পরিচয়ের অংশ?
সময়ের সঙ্গে লতার সাদা শাড়ি তাঁর ব্যক্তিত্বেরই একটি অংশ হয়ে ওঠে।
সাদা সিল্কের শাড়ি, গলায় বা কাঁধে টানা আঁচল, সাধারণ সাজ—এই চেহারাই ধীরে ধীরে তাঁর জনসমক্ষে পরিচিতির অংশ হয়ে যায়।
আর তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, এর পিছনে কোনও রহস্যময় কারণের চেয়ে সাদা রঙের প্রতি ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যই বড় বিষয় ছিল।
সিঁদুরের সঙ্গে তাহলে রাজ সিংহের সম্পর্ক ছিল?
এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা দরকার।
তবস্সুমের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, লতা সিঁদুরকে “সঙ্গীতের নামে” বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। অন্যদিকে রাজ সিংহের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বহু প্রতিবেদনে এসেছে।
কিন্তু “লতা রাজ সিংহের নামে সিঁদুর পরতেন”—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
বরং লতার নিজের প্রকাশ্য অবস্থান ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং সংযত। রাজ সিংহের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত প্রকাশ করেননি।
তাই সিঁদুরকে সরাসরি কোনও পুরুষের সঙ্গে যুক্ত করা সাংবাদিকভাবে নির্ভুল হবে না।
প্রেমের গল্পের থেকেও বড় ছিল সঙ্গীত
লতা মঙ্গেশকরের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য তাঁর সঙ্গীত।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যতই জল্পনা থাকুক, তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, অসংখ্য গান এবং ভারতীয় সঙ্গীতে তাঁর প্রভাবই তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উত্তরাধিকার।
আর সিঁদুর নিয়ে তবস্সুমের সেই স্মৃতিচারণ সত্যিই যদি লতার বক্তব্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরে থাকে, তাহলে সেটির তাৎপর্যও হয়তো এখানেই—তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর সম্পর্ক হিসেবে সঙ্গীতকেই দেখতেন।
রাজ সিংহ ডুঙ্গারপুরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে ইতিহাসে নানা গল্প রয়েছে। কিন্তু দুজনের ব্যক্তিগত অনুভূতির সম্পূর্ণ সত্য তাঁরা নিজেরাই যতটা জানতেন, তার সবটা হয়তো কোনওদিন জনসমক্ষে আসেনি।
আর লতার নিজের সেই সংযত উত্তর—“কিছু বিষয় শুধু হৃদয়ের জানার জন্য”—হয়তো এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমাপ্তি।



