ভূমিকা
নিউ ইয়র্কের আকাশছোঁয়া এক ভবনের ১০৪ তলার চূড়ায় দাঁড়িয়ে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর তা দেখে আবেগে ভেসেছিলেন বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ঘটনাকে ঘিরে সামনে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীদের প্রাথমিক তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে, ভাইরাল হওয়া সেই ‘প্রোপজ’ আসলে একটি পরিকল্পিত স্টান্ট হতে পারে।
ঘটনাটি শুধু সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেনি, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বেআইনি অনুপ্রবেশ এবং জননিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
কেন ভাইরাল হয়েছিল এই ঘটনা?
সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের একটি বহুতল ভবনের সম্প্রচার অ্যান্টেনার বিপজ্জনক অংশে দাঁড়িয়ে এক যুবক তাঁর সঙ্গীকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। সেই মুহূর্তের ভিডিও দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
১০৪ তলার মাথায় দাঁড়িয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার দৃশ্য অনেকেই ‘বাস্তবের সিনেমা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে পরে সেই রোম্যান্টিক ছবির আড়ালের বাস্তবতা সামনে আসতে শুরু করে।
পরিবারের দাবি, এটি ছিল পরিকল্পিত অভিনয়
মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই তরুণীর বাবা দিমিত্রি নিকোলাউ দাবি করেছেন, ভাইরাল হওয়া প্রোপজটি বাস্তব কোনও বাগদান ছিল না।
তাঁর বক্তব্য, ইভান ও অ্যাঞ্জেলা অনেক আগেই আইনিভাবে বিবাহিত। ফলে ১০৪ তলায় দাঁড়িয়ে যে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেটি শুধুই একটি সাজানো পরিবেশনা বা স্টান্ট।
তবে তাঁদের প্রকৃত বিয়ে কোথায় বা কবে হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কোনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি।
কীভাবে পৌঁছালেন ভবনের চূড়ায়?
ঘটনার পর নিউ ইয়র্ক পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তে প্রাথমিকভাবে যা জানা গিয়েছে, তাতে পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ছিল।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি অনুযায়ী—
- আগের দিন পর্যটকের পরিচয়ে ভবনে প্রবেশ করেন ওই যুগল।
- ভবন বন্ধ হওয়ার পরও তারা ভিতরেই লুকিয়ে ছিলেন।
- গভীর রাতে নিরাপত্তার নজর এড়িয়ে উপরের দিকে ওঠেন।
- তদন্তে আরও অভিযোগ, পথে থাকা দুটি তালা কেটে তাঁরা সম্প্রচার অ্যান্টেনার অংশে পৌঁছে যান।
- এরপর দীর্ঘ সময় ওই বিপজ্জনক এলাকাতেই অবস্থান করেন।
এই সমস্ত তথ্য নিউ ইয়র্ক পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতে প্রকাশ্যে এসেছে।
কেন বন্ধ রাখতে হয়েছিল সম্প্রচার?
তদন্তকারী সূত্রের দাবি, সম্প্রচার অ্যান্টেনা থেকে নির্গত উচ্চক্ষমতার রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সে কারণে উদ্ধার অভিযানের সময় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রায় ৩০ মিনিটের জন্য সংশ্লিষ্ট সম্প্রচার ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
এরপর উদ্ধারকারী দল দু’জনকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনে।
কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে?
উদ্ধারের পর ওই যুগলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিকভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে—
- বেআইনিভাবে ভবনে প্রবেশ
- নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভাঙার অভিযোগ
- তালা কেটে সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ
- নিজের ও অন্যের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলা
- অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অপরাধ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট আটটি পৃথক অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে।
আদালতে কী ঘটেছে?
গ্রেপ্তারের পরের দিনই একই পোশাকে হাত ধরাধরি করে আদালতে হাজির হন ইভান ও অ্যাঞ্জেলা।
পরবর্তীতে তাঁরা জামিনে মুক্তি পান।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ইভান সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “We Love New York.”
যদিও মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
বিল্ডিং কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর ভবন কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছে।
তাদের বক্তব্যে রসিকতার সুরে বলা হয়েছে, প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য ভবনের নির্ধারিত অবজারভেশন ডেকই যথেষ্ট আকর্ষণীয় এবং নিরাপদ স্থান। সেই উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা ভেঙে সম্প্রচার অ্যান্টেনায় ওঠার কোনও প্রয়োজন ছিল না।
একই সঙ্গে ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
কেন এত আলোচনায় এই ঘটনা?
এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি ভাইরাল ভিডিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষ্যে অনেকেই চরম ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপজ্জনক স্টান্ট অনুকরণ করার প্রবণতা অন্যদেরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই এ ধরনের ভিডিও দেখার সময় বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
ভাইরাল ভিডিওর রোম্যান্টিক মুহূর্ত প্রথমে অনেকের মন জয় করলেও, তদন্তের পর উঠে আসা তথ্য সেই ছবিকে সম্পূর্ণ অন্য মাত্রা দিয়েছে।
পরিবারের দাবি, পুলিশের তদন্ত এবং আদালতের প্রক্রিয়া— সবকিছু মিলিয়ে এখন এই ঘটনাকে ঘিরে আলোচনা প্রেমের গল্পের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপত্তা, আইন এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
তবে মামলার তদন্ত এখনও চলমান। আদালতের চূড়ান্ত রায় এবং তদন্ত শেষ হওয়ার পরই পুরো ঘটনার সব দিক আরও স্পষ্ট হবে।



