ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে যখন গোটা বিশ্ব ফুটবল উন্মাদনায় মেতে উঠেছে, তখন ব্রাজিল শিবিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তারকা ফুটবলার নেইমার জুনিয়র। তবে মাঠের পারফরম্যান্সের জন্য নয়, বরং মাঠের বাইরে থাকায় এবং তাঁর চোট পরিস্থিতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এবার বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই নেইমারের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করে তাঁকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রেখেছেন। কিন্তু টুর্নামেন্টের প্রথম দুই ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি এই তারকা ফরোয়ার্ড। ফলে সমর্থকদের একাংশের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, আর সেই আবহেই প্রেসিডেন্টের মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
নেইমারকে নিয়ে প্রেসিডেন্টের কটাক্ষ
ব্রাজিলের একটি সরকারি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে লুলা রসিকতার ছলে বলেন, নেইমার যেন বিশ্বের প্রথম “ওয়ার্ক ফ্রম হোম ফুটবলার”। অর্থাৎ দলে থেকেও মাঠে খেলছেন না, এমন ইঙ্গিতই ছিল তাঁর কথার মধ্যে।
প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ফুটবলপ্রেমীদের একাংশ এই মন্তব্যকে মজার ছলে নিলেও অন্য অংশের মতে, দেশের অন্যতম সফল ফুটবলারের প্রতি এটি অপ্রয়োজনীয় কটাক্ষ।
লুলা শুধু নেইমারকেই নয়, দল নির্বাচনের বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে দল নির্বাচন করলে হয়তো আরও ভালো ফল পাওয়া যেত। তাঁর এই মন্তব্যও ব্রাজিলের ফুটবল মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
কেন খেলছেন না নেইমার?
নেইমারের অনুপস্থিতির মূল কারণ তাঁর দীর্ঘদিনের চোট সমস্যা। গত কয়েক বছরে একাধিক গুরুতর চোটের কারণে নিয়মিত মাঠে নামতে পারেননি তিনি। বিশেষ করে হাঁটুর চোট তাঁকে দীর্ঘ সময়ের জন্য মাঠের বাইরে রেখেছিল।
২০২৩ সালের পর থেকে ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে খুব বেশি ম্যাচ খেলতে পারেননি নেইমার। যদিও তিনি ধীরে ধীরে ফিটনেস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন, তবুও বিশ্বকাপের মতো উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতায় খেলতে গেলে সম্পূর্ণ শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন।
ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, নেইমার এখনও পূর্ণমাত্রার ম্যাচ ফিটনেস অর্জন করতে পারেননি। সেই কারণেই তাঁকে নিয়ে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না কোচিং স্টাফ।
আনচেলোত্তির পরিকল্পনা কী?
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ কার্লো আনচেলোত্তি নেইমারের অভিজ্ঞতাকে এখনও অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করেন। তাঁর মতে, বড় টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞ ফুটবলারের উপস্থিতি দলের মানসিক শক্তি বাড়ায়।
এই কারণেই চোট থাকা সত্ত্বেও নেইমারকে স্কোয়াডে রাখা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আনচেলোত্তির পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্পূর্ণ সুস্থ হলে নকআউট পর্বে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁকে ব্যবহার করা হতে পারে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, নেইমার মাঠে না নামলেও ড্রেসিংরুমে তাঁর উপস্থিতি তরুণ ফুটবলারদের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সমর্থকদের মধ্যে বিভক্ত মতামত
নেইমারকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট। একদল মনে করছেন, সম্পূর্ণ ফিট না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে মাঠে নামানো উচিত নয়। কারণ তাড়াহুড়ো করলে চোট আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে অনেকের মত, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে দলে জায়গা পাওয়ার অর্থ হলো তিনি অন্তত খেলার মতো অবস্থায় আছেন। ফলে প্রথম দুই ম্যাচে তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা অস্বাভাবিক নয়।
বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে নেইমারের সমালোচনা যেমন হয়েছে, তেমনই তাঁকে সমর্থন করেও বহু পোস্ট দেখা গেছে।
স্কটল্যান্ড ম্যাচে কি দেখা যাবে নেইমারকে?
ব্রাজিল শিবিরের রিপোর্ট অনুযায়ী, নেইমার ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ অনুশীলনে ফিরছেন। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তাহলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাঁকে সীমিত সময়ের জন্য মাঠে নামানো হতে পারে।
কোচিং স্টাফ চাইছে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুকূল হলে তাঁকে কিছু সময় খেলিয়ে ম্যাচ ফিটনেস যাচাই করতে। এতে পরবর্তী নকআউট পর্বে তাঁকে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখন নজর নেইমারের প্রত্যাবর্তনে
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে নেইমারকে ঘিরে জল্পনা। প্রেসিডেন্টের মন্তব্য, সমর্থকদের আলোচনা এবং মিডিয়ার নজর—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে এখন এই তারকা ফুটবলার।
তবে শেষ পর্যন্ত উত্তর একটাই—মাঠে ফিরে নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে সমালোচনার জবাব দিতে পারবেন কি না। যদি নেইমার দ্রুত ফিট হয়ে ওঠেন এবং বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রভাব ফেলতে পারেন, তাহলে বর্তমান বিতর্ক খুব দ্রুতই ইতিহাস হয়ে যেতে পারে।
এখন গোটা ফুটবল বিশ্বের অপেক্ষা, কবে আবার ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে মাঠ কাঁপাতে দেখা যাবে নেইমার জুনিয়রকে।



