পাহাড়ের নির্জন পরিবেশ। চারপাশে বরফঢাকা শৃঙ্গ। আর সেই নীরবতার মাঝেই মেরুন পোশাকে ছুটে বেড়াচ্ছে একদল কিশোর। কারও হাতে বই, কেউ প্রার্থনায় ব্যস্ত, আবার কেউ ব্যস্ত বিশাল রান্নাঘরে।
সাধারণ স্কুলপড়ুয়া কিশোরদের থেকে তাঁদের জীবন অনেকটাই আলাদা। সংসারজীবনের বদলে তাঁরা বেছে নিয়েছেন মঠের নিয়মকানুন, পড়াশোনা, প্রার্থনা এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—এত অল্প বয়সে মঠে থাকা সন্ন্যাসীরা কী খান? তাঁদেরও কি বিরিয়ানি, ফ্রায়েড রাইস বা মোমো খেতে ইচ্ছে করে? আর ইচ্ছে হলে মঠে সেসব রান্না হয় কি?
এই কৌতূহলের কিছুটা উত্তর পাওয়া গিয়েছে হিমাচল প্রদেশের স্পিতি উপত্যকার একটি বৌদ্ধ মঠের রান্নাঘরের ভিডিওতে। আবাসিক সন্ন্যাসী তেন জিনের ক্যামেরায় উঠে এসেছে মঠের অন্দরমহলের সেই অন্যরকম ছবি।
ভোরের আগেই শুরু রান্নাঘরের ব্যস্ততা
পাহাড়ি মঠের জীবন বাইরে থেকে যতটা শান্ত মনে হয়, রান্নাঘরের চিত্র কিন্তু একেবারেই আলাদা।
তেন জিনের শেয়ার করা দৃশ্য অনুযায়ী, অনেক রান্নার প্রস্তুতি শুরু হয় ভোর হওয়ার আগেই। বিপুল সংখ্যক আবাসিক সন্ন্যাসীর জন্য খাবার তৈরি করতে হলে রান্নাঘরে বড়সড় আয়োজন করতেই হয়।
কেউ আগুন জ্বালাচ্ছেন, কেউ খাবার তৈরি করছেন, আবার কেউ রান্নার অন্যান্য কাজে সাহায্য করছেন। অর্থাৎ এটি কোনও একজনের রান্নাঘর নয়—পুরো মঠের যৌথ পরিশ্রমের জায়গা।
প্রাতরাশে কী খান সন্ন্যাসীরা?
ভিডিওতে দেখানো হয়েছে, মঠের সকালের খাবারের তালিকায় থাকে পাহাড়ি রুটি এবং গরম চা।
মোটা ধরনের এই রুটি দেখতে সাধারণ হলেও পাহাড়ি পরিবেশে এটি বেশ পরিচিত ধরনের খাবার। ভিডিওতে এই রুটির নাম ‘বোলেপ কোরকুন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সকালের ঠান্ডায় এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে সদ্য তৈরি রুটি—মঠের আবাসিকদের দিনের শুরুটা অনেকটা এমনই।
তবে প্রতিদিন একই খাবার থাকে না।
মঠে কি প্রতিদিন একই খাবার রান্না হয়?
না। তেন জিনের বক্তব্য অনুযায়ী, মঠের মেনু দিনে দিনে পরিবর্তিত হয়।
অর্থাৎ সন্ন্যাসীদের খাবার মানেই শুধু সাধারণ রুটি, চা বা নিরামিষ খাবার—এমন ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়।
বিশেষ দিন বা নির্দিষ্ট সময়ে রান্নাঘরে তৈরি হয় তুলনামূলকভাবে অন্য ধরনের খাবারও। আর সেই তালিকায় রয়েছে এমন একটি খাবার, যা শুনলে অনেকেরই অবাক লাগতে পারে।
মঠের রান্নাঘরে বিরিয়ানিও হয়!
হ্যাঁ, ভিডিওতে তেন জিন জানিয়েছেন, মঠের রান্নাঘরে কখনও কখনও বিরিয়ানিও রান্না হয়।
এছাড়াও মেনুতে থাকতে পারে ফ্রায়েড রাইসের মতো খাবার।
অর্থাৎ সন্ন্যাসজীবন মানেই যে সব ধরনের পছন্দের খাবার থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা, এই দৃশ্য তার একটি অন্য ছবি তুলে ধরে।
তবে কোনও মঠে কী খাবার পরিবেশন করা হবে, তা সেই নির্দিষ্ট মঠের রীতি, খাদ্যসংস্কৃতি ও স্থানীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
‘চুরা বাকলাপ’ কী?
ভিডিওতে উঠে এসেছে আরও একটি আকর্ষণীয় খাবারের নাম—‘চুরা বাকলাপ’।
এটি দেখতে অনেকটা পুরভরা মোমোর মতো। এর বিশেষত্ব হল, পুরের মধ্যে ব্যবহার করা হয় ‘চুরা’ নামে পরিচিত এক ধরনের চিজ বা শুকনো পনিরজাতীয় উপাদান।
পাহাড়ি ও তিব্বতি খাদ্যসংস্কৃতিতে চিজ বা স্থানীয় দুগ্ধজাত উপাদানের ব্যবহার নতুন নয়। মঠের রান্নাঘরে সেই স্থানীয় স্বাদের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয় এই ধরনের খাবার।
এত বড় রান্নাঘরে রান্না করেন কারা?
মঠে যদি অনেক আবাসিক থাকেন, তাহলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার রান্না করাও বড় কাজ।
তেন জিনের বক্তব্য অনুযায়ী, আবাসিক সন্ন্যাসীদেরও রান্নাঘরের কাজে অংশ নিতে হয়। প্রত্যেকের পালা করে রান্নার দায়িত্ব পড়ে।
অর্থাৎ রান্নাঘরের কাজকে শুধুমাত্র কোনও নির্দিষ্ট কর্মীর দায়িত্ব হিসেবে না দেখে, মঠের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবেই দেখা হয়।
মাসে দু’বার রান্নার দায়িত্ব!
ভিডিওতে তেন জিন জানিয়েছেন, আবাসিকদের প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট সময় অন্তর রান্নাঘরে দায়িত্ব পড়ে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, একজনকে একা বিশাল রান্নাঘরের সব দায়িত্ব সামলাতে হয় না।
বরং অনেকেই একসঙ্গে কাজ করেন।
কেউ সবজি কাটছেন, কেউ রান্না করছেন, কেউ অন্য কাজে সাহায্য করছেন। কাজের ফাঁকে চলছে কথাবার্তাও।
এই সমবেত কাজের মধ্যেই তৈরি হয় মঠের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি—একসঙ্গে থাকা এবং একসঙ্গে দায়িত্ব নেওয়া।
তাহলে ছোট সন্ন্যাসীদের কি বিরিয়ানি বা আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করে না?
অবশ্যই মানুষের স্বাভাবিক খাবারের ইচ্ছা বা পছন্দ থাকতে পারে। কিন্তু মঠের জীবনযাপন যে সাধারণ কিশোরদের জীবন থেকে আলাদা, সেটিও মনে রাখা প্রয়োজন।
তাঁদের দৈনন্দিন রুটিনে প্রার্থনা, পড়াশোনা, মঠের বিভিন্ন দায়িত্ব এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কখনও বিশেষ খাবার রান্না হলে সেটি অবশ্যই সেই নিয়মের মধ্যেই ভাগ করে খাওয়া হয়। কিন্তু মঠের খাবারের সম্পূর্ণ তালিকা বা সব সন্ন্যাসীর ব্যক্তিগত পছন্দ সম্পর্কে একটি ভিডিও দেখে সার্বিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
মঠের জীবন কি শুধুই কঠোর?
বাইরে থেকে মঠের জীবনকে অত্যন্ত কঠোর মনে হতে পারে। নির্দিষ্ট সময় মেনে চলা, পড়াশোনা, ধর্মীয় অনুশীলন এবং বিভিন্ন দায়িত্ব—সবকিছুর জন্যই শৃঙ্খলা প্রয়োজন।
কিন্তু তেন জিনের ভিডিওর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল, সেই কঠোরতার পাশাপাশি সেখানে রয়েছে বন্ধুত্ব, হাসি-ঠাট্টা এবং একসঙ্গে কাজ করার আনন্দ।
বিশাল রান্নাঘরে একসঙ্গে রান্না করা, খাবার ভাগ করে নেওয়া এবং দায়িত্ব পালন—এই ছোট ছোট মুহূর্তই হয়তো তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও মানবিক করে তোলে।
পাহাড়ের মঠের এই জীবন কেন এত আলাদা?
শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পরিবেশে বেড়ে ওঠেন মঠের আবাসিকরা।
এখানে জীবনের গতি ধীর, নিয়ম নির্দিষ্ট এবং পারস্পরিক নির্ভরতা অনেক বেশি। ব্যক্তিগত পছন্দের পাশাপাশি গোষ্ঠীর প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে হয়।
তাই মঠের রান্নাঘর শুধু খাবার তৈরির জায়গা নয়। এটি তাঁদের সামাজিক জীবন, দায়িত্ববোধ এবং একসঙ্গে থাকার সংস্কৃতিরও একটি অংশ।
শেষ কথা
স্পিতির পাহাড়ে একটি বৌদ্ধ মঠের রান্নাঘরের এই ছবি আমাদের সামনে সন্ন্যাসজীবনের এক অন্য দিক তুলে ধরে।
প্রার্থনা, পড়াশোনা আর কঠোর নিয়মের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে গরম চা, পাহাড়ি রুটি, ফ্রায়েড রাইস, কখনও বিরিয়ানি, আবার কখনও স্থানীয় স্বাদের চিজভরা খাবার।
সবচেয়ে বড় কথা, খাবার তৈরি থেকে শুরু করে নানা দায়িত্ব—অনেক কিছুই সেখানে একসঙ্গে করার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত।
পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে তাই মঠের জীবন যতটা ত্যাগের, ততটাই হয়তো সহাবস্থান ও ভাগ করে নেওয়ারও।



