Tuesday, October 13, 2026
Google search engine
Homeসিনেদুনিয়াবলি দুনিয়া‘DDLJ’, ‘মহব্বতে’-র জনকের নিজের প্রেমের গল্প কেমন ছিল? মিসড ফ্লাইট আর লুঙ্গি-কুর্তায়...

‘DDLJ’, ‘মহব্বতে’-র জনকের নিজের প্রেমের গল্প কেমন ছিল? মিসড ফ্লাইট আর লুঙ্গি-কুর্তায় বদলে গেল যশ-পামেলার সম্পর্ক!

বলিউডের রোম্যান্টিক সিনেমার কথা উঠলে যে নামটি আলাদা করে মনে পড়ে, তিনি যশ চোপড়া। ‘সিলসিলা’, ‘কভি কভি’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘বীর-জারা’—প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা আর সম্পর্কের আবেগকে বড় পর্দায় নতুন ভাষা দিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি পরিচালক। তাঁর তৈরি প্রেমের জগতের প্রভাব এতটাই গভীর যে, আজও তাঁকে বলিউডের রোম্যান্সের অন্যতম প্রধান নির্মাতা হিসেবে মনে করা হয়।

কিন্তু যে মানুষটি পর্দায় এত নিখুঁতভাবে প্রেমের গল্প বলতেন, তাঁর নিজের প্রেমের গল্পটা ছিল একেবারেই অন্যরকম।

সেখানে ছিল না কোনও বড়সড় সিনেম্যাটিক প্রপোজাল। বরং ছিল একটি ক্রিকেট ম্যাচ, একটি সঙ্গীতের আসর, একটি মিসড ফ্লাইট, আর লুঙ্গি-কুর্তা পরে মেঝেতে বসে গান-বাজনার আড্ডা।

আর এই অদ্ভুতভাবেই কাছে এসেছিলেন যশ চোপড়া ও পামেলা চোপড়া।

ক্রিকেট ম্যাচেই প্রথম দেখা

পামেলা চোপড়ার নিজের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, যশ ও তাঁর প্রথম দেখা হয়েছিল একটি ক্রিকেট ম্যাচে।

যশ কয়েক সারি সামনে বসেছিলেন। পামেলার সঙ্গে ছিলেন তাঁর কয়েকজন কাজিন। পামেলার মনে হয়েছিল, যশ বোধহয় তাঁর সুন্দরী কাজিনদের দিকেই তাকিয়ে আছেন।

কিন্তু পরে যশ নাকি তাঁকে জানিয়েছিলেন, তিনি আসলে পামেলার দিকেই তাকাচ্ছিলেন।

অর্থাৎ, প্রথম দেখাতেই দু’জনের মধ্যে যে সিনেমার মতো প্রেম হয়ে গিয়েছিল, তা কিন্তু নয়।

বরং আসল গল্প তখনও শুরু হয়নি।

সঙ্গীতের আসরে যশের নজর কাড়লেন পামেলা

এরপর তাঁদের আবার দেখা হয় একটি সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে। সেখানে পামেলা গান গেয়েছিলেন।

পামেলার গানের কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছিলেন যশ। যশ নিজেও পরবর্তীকালে বলেছিলেন, সেই অনুষ্ঠানে পামেলার গান তাঁর ভালো লেগেছিল।

এই পরিচয়ের পর দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের সম্ভাবনা নিয়ে কথাবার্তা এগোতে থাকে।

কিন্তু প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ ছিল বেশ অস্বস্তিকর।

প্রথম দেখা—‘খুব একটা খাস কিছু নয়!’

পরিবারের পরিচিত অভিনেতা রোমেশ শর্মার মাধ্যমে দু’জনের আনুষ্ঠানিক দেখা করার ব্যবস্থা হয়।

কিন্তু সেই সাক্ষাতে দু’জনেই প্রায় চুপচাপ ছিলেন।

বাড়ি ফিরে পামেলাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যশকে তাঁর কেমন লেগেছে, তিনি মোটামুটি বলেছিলেন—“ঠিকঠাক, খুব একটা অসাধারণ কিছু নয়।”

অন্যদিকে যশও তাঁর পরিবারকে জানিয়েছিলেন—“ঘণ্টি বাজেনি।” অর্থাৎ, তাঁর মনেও তখন বিশেষ কোনও অনুভূতি তৈরি হয়নি।

যে মানুষ পরবর্তীকালে প্রেমের অসংখ্য গল্প তৈরি করবেন, নিজের প্রেমের শুরুটা যে এমন নিরস হতে পারে, তা সত্যিই অবাক করার মতো!

তারপরই এল সেই ‘মিসড ফ্লাইট’

কিন্তু গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিল একেবারে সিনেমার মতো একটি ঘটনা।

দিল্লি থেকে বম্বে ফেরার ফ্লাইট মিস করে ফেলেছিলেন যশ চোপড়া। ফলে তাঁকে আরও কিছুটা সময় দিল্লিতে থাকতে হয়।

এই সুযোগেই দ্বিতীয়বার দেখা করার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আর সেই দ্বিতীয় সাক্ষাৎই বদলে দেয় গোটা গল্প।

সুট নয়, লুঙ্গি-কুর্তায় যশ!

দ্বিতীয় সাক্ষাতের দৃশ্যটাই ছিল সবচেয়ে আলাদা।

পামেলার বর্ণনা অনুযায়ী, এবার তিনি সম্পূর্ণ অন্য রূপে দেখলেন যশকে। কোনও সুট-বুট নয়—লুঙ্গি ও কুর্তা পরে মেঝেতে বসে ছিলেন যশ।

সেখানে চলছিল গান-বাজনা। একজন দোলক বাজাচ্ছিলেন, পামেলা গান গাইছিলেন, আর যশ চামচ দিয়ে দোলকের তালে তাল দিচ্ছিলেন।

প্রথম সাক্ষাতের সেই অস্বস্তি কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল।

কারণ দু’জনেই তখন ধরে নিয়েছিলেন, বিয়েটা আর হচ্ছে না। ফলে একে অপরকে impress করার চাপও ছিল না।

আর সেই চাপহীন পরিবেশেই পামেলা যশের অন্য একটি দিক দেখতে পেলেন।

‘ঘণ্টি বাজল’—এবার সত্যিই!

অদ্ভুতভাবে, যে সাক্ষাতকে দু’জনেই ভেবেছিলেন সম্পর্কের শেষ দেখা, সেটাই হয়ে গেল সম্পর্কের শুরু।

পামেলার যশকে ভালো লাগতে শুরু করল। যশের মনেও তৈরি হল একই অনুভূতি।

মুম্বই ফিরে যশ পরিবারকে জানালেন—এবার “ঘণ্টি বেজে গেছে।”

অর্থাৎ, প্রথম সাক্ষাতে যে মানুষ বলেছিলেন ‘ঘণ্টি বাজেনি’, দ্বিতীয় সাক্ষাতের পর সেই তিনিই বুঝলেন—এই মানুষটির সঙ্গেই জীবন কাটাতে চান।

২০ আগস্ট ১৯৭০—বিয়ে হল যশ ও পামেলার

এরপর আর দেরি হয়নি।

২০ আগস্ট ১৯৭০ সালে নয়াদিল্লিতে বিয়ে করেন যশ চোপড়া ও পামেলা চোপড়া। যশের নিজের একটি পুরনো সাক্ষাৎকারেও এই তারিখের উল্লেখ রয়েছে।

বিয়ের পর তাঁদের সম্পর্ক শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পামেলা ধীরে ধীরে যশের সৃজনশীল জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।

তিনি গান গেয়েছেন, গল্প লিখেছেন, চিত্রনাট্যে সহযোগিতা করেছেন এবং YRF-এর একাধিক ছবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। Yash Raj Films-এর তথ্য অনুযায়ী, ‘কভি কভি’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’সহ বিভিন্ন ছবিতে তাঁর সৃজনশীল অবদান ছিল।

বিয়ের পরেই বদলে গেল যশের কর্মজীবন

বিয়ের পর যশ চোপড়ার জীবনে আরেকটি বড় পরিবর্তন আসে।

হানিমুন থেকে ফিরে তিনি বড় ভাই বি.আর. চোপড়ার প্রযোজনা সংস্থা থেকে আলাদা হয়ে নিজের প্রযোজনা সংস্থা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় ‘দাগ’, যা Yash Raj Films-এর প্রথম ছবি হিসেবে সংস্থার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ, ব্যক্তিগত জীবনে বিয়ের পর্ব আর পেশাগত জীবনে স্বাধীনভাবে পথ চলা—দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রায় একই সময়ে শুরু হয়েছিল।

যশের নায়িকাদের নিয়ে কি পামেলার হিংসে হতো?

এখানেও পামেলার একটি পুরনো বক্তব্য বেশ আলোচিত।

যশ চোপড়ার সিনেমায় একের পর এক জনপ্রিয় অভিনেত্রী তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন। বিশেষ করে তাঁর রোম্যান্টিক ছবির দৃশ্যায়ন নিয়ে দর্শকদের মধ্যে আলাদা আকর্ষণ ছিল।

পামেলা নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে, স্বামীকে সুন্দরী অভিনেত্রীদের সঙ্গে কাজ করতে দেখে তাঁর একটু হিংসে হতো।

কিন্তু তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝেছিলেন—যশের কাছে পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এই উপলব্ধিই তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে।

পর্দার প্রেমের জাদু, বাস্তবের সম্পর্ক ছিল অনেক সহজ

যশ চোপড়ার সিনেমায় প্রেম মানেই সুইজারল্যান্ডের বরফ, সর্ষের ক্ষেত, বৃষ্টিতে গান আর বিচ্ছেদের আবেগ।

‘সিলসিলা’ থেকে ‘চাঁদনি’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘বীর-জারা’—তাঁর চলচ্চিত্রে প্রেমের নানা রূপ দেখা গেছে। YRF-এর তথ্যেও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে তাঁর চলচ্চিত্রজগতের দীর্ঘ সম্পর্কের কথা উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু তাঁর নিজের প্রেমের গল্পে ছিল অনেক বেশি সাধারণ কিছু মুহূর্ত—একটি ক্রিকেট ম্যাচ, একটি গান, মিসড ফ্লাইট আর মেঝেতে বসে আড্ডা।

সম্ভবত এটাই এই সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক।

৪২ বছরের দাম্পত্য

১৯৭০ সালে বিয়ের পর থেকে ২০১২ সালে যশ চোপড়ার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁদের দাম্পত্য ছিল।

২১ অক্টোবর ২০১২ সালে যশ চোপড়া মারা যান। তাঁর শেষ পরিচালিত ছবি ছিল ‘Jab Tak Hai Jaan’।

পামেলা চোপড়া তাঁর স্বামীর দীর্ঘ কর্মজীবনের পাশাপাশি YRF-এর সৃষ্টিশীল জগতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০২৩ সালে পামেলা চোপড়ারও মৃত্যু হয়।

দু’জনেই আজ নেই। কিন্তু তাঁদের সম্পর্কের সেই অদ্ভুত সূচনাটা এখনও বলিউডের অন্যতম সুন্দর বাস্তব প্রেমকাহিনি হিসেবে ফিরে আসে।

শেষ কথা

যশ চোপড়া দর্শকদের শিখিয়েছিলেন, প্রেম কখনও মিলন, কখনও বিচ্ছেদ, কখনও অপেক্ষা।

কিন্তু তাঁর নিজের প্রেমের গল্প যেন আরও সহজ একটা কথা বলে—প্রথম দেখাতেই প্রেম হয়ে যেতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই।

কখনও কখনও প্রথম সাক্ষাতে “ঘণ্টি বাজে না”। তারপর একটি মিসড ফ্লাইট, একটি সাধারণ পোশাক, কিছু গান আর নির্ভার আড্ডা—সেখান থেকেই হয়তো শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেমের গল্প।

যশ ও পামেলার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments