আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল ভারত। এমন এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা করল দেশ, যা এতদিন শুধু চিনের মতো শক্তিধর দেশগুলির পরিকল্পনার খাতায় সীমাবদ্ধ ছিল বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু এবার সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখাল ভারত। শত্রু দেশের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ার আগেই শত্রুবিমান ধ্বংস করতে সক্ষম এক বিশেষ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে পরীক্ষা করেছে ভারতীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও। এই সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ নিরাপত্তার ভারসাম্যে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
সম্প্রতি ওড়িশার চাঁদিপুর উপকূল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে উৎক্ষেপণ করা হয় র্যামজেট শক্তিচালিত এক অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র। উৎক্ষেপণের পর ডিআরডিও জানায়, পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ সফল হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্রটি তার নির্ধারিত সব লক্ষ্য পূরণ করেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে সেনার হাতে চলে এলে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠবে অনেক বেশি শক্তিশালী ও অভেদ্য।
এই ক্ষেপণাস্ত্রের মূল আকর্ষণ হল এতে ব্যবহৃত র্যামজেট ইঞ্জিন প্রযুক্তি। র্যামজেট হল এমন এক ধরনের জেট ইঞ্জিন, যা সুপারসনিক গতিতে চলা ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশই এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পেরেছে। চিন দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চালালেও, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকরা। সেই জায়গাতেই ভারত বড়সড় চমক দিয়ে দিল।
র্যামজেট ইঞ্জিনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এতে কোনও জটিল টার্বাইন বা চলমান যন্ত্রাংশ থাকে না। ফলে ইঞ্জিনটি তুলনামূলকভাবে হালকা হয় এবং ক্ষেপণাস্ত্রের গতি অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। এই ইঞ্জিন সামনের দিক থেকে প্রবল গতিতে আসা বায়ুকে কাজে লাগিয়ে ‘থ্রাস্ট’ তৈরি করে, যার ফলে ক্ষেপণাস্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ গতি বজায় রাখতে পারে। ডিআরডিও-র তৈরি ‘সলিড ফুয়েল ডাক্টেড র্যামজেট’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্র শত্রু বিমানের জন্য কার্যত দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠতে পারে।
ডিআরডিও সূত্রে খবর, পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের সময় ক্ষেপণাস্ত্রটির গতি, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জ্বালানি দক্ষতা এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষমতা—সবকিছুই নির্ভুলভাবে কাজ করেছে। এর ফলে যে স্বল্প সংখ্যক দেশের হাতে এই ধরনের র্যামজেট প্রযুক্তি রয়েছে, সেই অভিজাত তালিকায় ভারতের নাম যুক্ত হল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে শত্রু যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে ভারতের প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর। আধুনিক যুদ্ধে শত্রুপক্ষের ফাইটার জেট, ড্রোন এবং ক্রুজ মিসাইল বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। র্যামজেট শক্তিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র এই সমস্ত আকাশপথের হুমকি দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। ফলে ভারতের আকাশসীমায় ঢোকার আগেই শত্রু বিমানের ধ্বংস নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, অপারেশন ‘সিঁদুর’ এবং সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনার পর থেকেই দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উপর বিশেষ জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি। সেই লক্ষ্যেই প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে প্রতিরক্ষা খাতে মোট ৭.৮৫ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ।
এর পাশাপাশি, ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রকে আরও উন্নত করে সুপারসনিক থেকে হাইপারসনিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। শব্দের গতির পাঁচ গুণেরও বেশি গতিতে ছুটতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লক্ষ্যে গবেষণা চালাচ্ছে ভারত। তারই মধ্যে র্যামজেট প্রযুক্তিসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী মাইলফলক বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আকাশ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ভারত যে দ্রুত গতিতে বিশ্বমানের শক্তিতে পরিণত হচ্ছে, এই সাফল্য তারই স্পষ্ট প্রমাণ। চিনসহ শত্রু দেশগুলির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলতে সক্ষম এই নতুন প্রযুক্তি আগামী দিনে ভারতের সামরিক কৌশলে বড় ভূমিকা নেবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



