একদিকে পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের নথির বাধ্যবাধকতা তুলে নিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার, অন্যদিকে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ নাগরিকদের উপর চাপ বাড়াচ্ছে নির্বাচন কমিশন—এই দ্বিমুখী নীতিই এখন তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রশ্ন উঠছে, নাগরিক স্বস্তি দেওয়ার বদলে কি হয়রানিকেই নীতির অংশ করে তুলেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্র সরকার? নাকি এর আড়ালে রয়েছে বৈধ ভোটারদের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুপরিকল্পিত কৌশল?
সম্প্রতি স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা SIR প্রক্রিয়ার আওতায় লক্ষ লক্ষ তথাকথিত ‘আনম্যাপড ভোটার’-কে ফের নোটিস পাঠানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, প্রথম দফার শুনানিতে যেসব ভোটার পাসপোর্টের কপি জমা দিয়েছিলেন, তাঁদের একটি বড় অংশের নথি এবার আর গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। কমিশনের যুক্তি, শুধুমাত্র ভোটারের নিজস্ব নথি যথেষ্ট নয়—বাবা-মায়ের পরিচয় ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথিও আবশ্যক।
এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই চরম বিভ্রান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কারণ SIR সংক্রান্ত প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাঁদের নিজের অথবা নিকট আত্মীয়ের নাম নেই, তাঁদের ‘আনম্যাপড ভোটার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। সেই সঙ্গে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য মোট ১৩ ধরনের নথির তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে পাসপোর্টকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নথি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু নতুন নির্দেশিকায় হঠাৎ করেই নিয়ম বদলে ফেলেছে কমিশন। বয়সভিত্তিক শর্ত আরও কঠোর করা হয়েছে। যেসব আনম্যাপড ভোটারের জন্ম ১৯৮৭ সালের এপ্রিলের পর থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে, তাঁদের ক্ষেত্রে বাবা অথবা মায়ের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর যাঁদের জন্ম ২০০৪ সালের পর, তাঁদের বাবা ও মা—দু’জনের নথিই জমা দিতে বলা হচ্ছে। অন্যথায় তাঁদের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এই অবস্থায় বহু বৈধ ভোটার দ্বিতীয়বার শুনানির নোটিস পেয়ে আতঙ্কিত। যাদবপুর বিধানসভার জয়া সেন, গৌরী সাহা কিংবা মুর্শিদাবাদের ভোটার জিয়াউল শেখের মতো অসংখ্য মানুষ একই প্রশ্ন তুলছেন—যদি পাসপোর্ট ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রামাণ্য দলিল হয়, তবে হঠাৎ করে সেটিকে অগ্রহণযোগ্য বলা হচ্ছে কেন? তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যেই প্রথম দফায় সমস্ত নথি জমা দিয়েছেন, তবু ফের শুনানিতে হাজিরা দিতে বলা হচ্ছে।
ইআরও বা নির্বাচনী আধিকারিকদের বক্তব্য, কমিশনের অনলাইন সিস্টেমে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের সেই অনুযায়ীই কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু এতে সাধারণ মানুষের হয়রানি যে কয়েক গুণ বেড়েছে, তা মানছেন প্রশাসনের একাংশও। বিশেষ করে যাঁদের বাবা-মা প্রয়াত, অথবা যাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় নথি নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন—এটি কি শুধুই প্রশাসনিক জটিলতা, নাকি পরিকল্পিতভাবে বৈধ নাগরিকদের ভোটাধিকার খর্ব করার চেষ্টা? কারণ পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিকে প্রথমে গ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করে পরে তার মান্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে কেন্দ্র সরকার পাসপোর্ট তৈরির নিয়ম শিথিল করে জানিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মায়ের নথি আর বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ একটি ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণ সহজ করা হচ্ছে, অন্য ক্ষেত্রে সেটাকেই আরও কঠিন করে তোলা হচ্ছে। এই দ্বৈত নীতি নিয়েই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সমালোচকদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যদি লক্ষ লক্ষ মানুষকে বারবার নোটিস, শুনানি এবং নথি জমা দেওয়ার ফাঁদে ফেলা হয়, তবে তা গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে। ভোটাধিকার কোনও অনুগ্রহ নয়, এটি সাংবিধানিক অধিকার—এই সত্য ভুলে গেলে চলবে না বলেই মত নাগরিক সমাজের।
সব মিলিয়ে SIR প্রক্রিয়া এখন আর শুধুই একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, বরং তা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন একটাই—এই প্রক্রিয়ার শেষ পরিণতি কী? সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবেন, না কি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিন আরও বড় চমকের অপেক্ষা করছে দেশ?



