Mamata Banerjee News : বাংলার রাজনীতিতে আবারও এমন এক সিদ্ধান্ত নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যা শুধু রাজ্য নয়, গোটা দেশের রাজনৈতিক পরিসরে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। রাজ্যসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেস যে নামগুলি সামনে এনেছে, তা নিঃসন্দেহে অভূতপূর্ব। অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক, প্রাক্তন শীর্ষ পুলিশ কর্তা রাজীব কুমারের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি চর্চায় রয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে, রাজ্যসভায় ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার কোনও সমকামী সাংসদ বসতে চলেছেন। আর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের নেপথ্যে থাকছে তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা।
রাজ্যসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূলের ‘বড় চমক’
২০২৬ সালের রাজ্যসভা নির্বাচনের আগে ফের একবার ‘মাস্টারস্ট্রোক’ খেললেন তৃণমূল নেত্রী। সামাজিক বার্তা ও রাজনৈতিক কৌশল— দুই দিক থেকেই এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মেনকা গুরুস্বামীর নাম ঘোষণার মাধ্যমে তৃণমূল স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে— তারা শুধু ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও সমানাধিকারের প্রশ্নেও অগ্রণী ভূমিকা নিতে প্রস্তুত।
২৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীতালিকা ঘোষণা করা হয়। তালিকায় মেনকার নাম আসতেই শুরু হয় জোর আলোচনা। কারণ, তিনি শুধু একজন আইনজীবী নন, বরং ভারতের সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের লড়াইয়ে একটি পরিচিত মুখ।
কে এই মেনকা গুরুস্বামী?
মেনকা গুরুস্বামী ভারতের সুপ্রিম কোর্ট-এর একজন প্রখ্যাত সিনিয়র অ্যাডভোকেট। আন্তর্জাতিক স্তরেও তাঁর খ্যাতি রয়েছে। বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একাধিক তালিকায় তাঁর নাম জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে সমকামিতা অপরাধমুক্ত করার ঐতিহাসিক মামলায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া পরিচিতি।
পারিবারিক দিক থেকেও মেনকা রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত। তিনি প্রয়াত বিজেপি কৌশলী ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যশবন্ত সিনহার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোহন গুরুস্বামীর কন্যা। তবে বাবার পরিচয়ের বাইরে বেরিয়ে নিজ যোগ্যতায় তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন— সেটাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
তৃণমূলের ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে মেনকা
শুধু সামাজিক আন্দোলন নয়, সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন মেনকা গুরুস্বামী। ইডি বনাম রাজ্য সরকার সংক্রান্ত একাধিক মামলায় তিনি তৃণমূল সরকারের হয়ে সওয়াল করেন। বিশেষ করে আইপ্যাক সংক্রান্ত মামলায় তাঁর ভূমিকা রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট আলোচিত।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কয়লা দুর্নীতি মামলায় ইডি যখন ভোট কুশলী সংস্থা আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালায়, তখন পরিস্থিতি চরমে ওঠে। তল্লাশির মাঝেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ ছিল, তদন্তের নামে তৃণমূলের ভোট কৌশল হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকার ও ইডি-র মধ্যে আইনি লড়াই শুরু হয়। সুপ্রিম কোর্টে সেই মামলায় রাজ্যের হয়ে জোরালো সওয়াল করেছিলেন মেনকা গুরুস্বামী। তিনি ইডি-র তদন্ত পদ্ধতি এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার ভূমিকা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলেছিলেন। সেই সময় থেকেই তৃণমূল শিবিরে তিনি ‘বিশ্বাসযোগ্য রক্ষাকবচ’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
অমিত শাহ প্রসঙ্গ ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
এই মামলার সময় মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের অভিযোগ তোলেন। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবল আলোড়ন তোলে। সেই প্রেক্ষাপটে মেনকার যুক্তি ও আইনি দক্ষতা তৃণমূলকে বড়সড় স্বস্তি দেয়।
রাজনৈতিক মহলের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন দক্ষ আইনজীবীকেই রাজ্যসভায় পাঠাতে চান না, বরং এমন এক মুখকে সামনে আনছেন যিনি আদর্শগত লড়াইয়েও দলের কণ্ঠস্বর হতে পারবেন।
সামাজিক বার্তা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
মেনকা গুরুস্বামীকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তৃণমূল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল— তারা সামাজিক বৈচিত্র্য ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন। ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথম সমকামী সাংসদ হওয়ার পথে এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে, তেমনই ঘরোয়া রাজনীতিতে তৃণমূলকে একটি প্রগতিশীল শক্তি হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত করবে।
উপসংহার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্ত শুধুই প্রার্থী ঘোষণা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। মেনকা গুরুস্বামীকে সামনে এনে তৃণমূল দেখিয়ে দিল— ক্ষমতার রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক ন্যায় ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নেও তারা ইতিহাস গড়তে প্রস্তুত।



