আরজি কর কাণ্ডের সেই ভয়াবহ রাত শুধু একটি পরিবারকে নয়, নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা বাংলাকে। দীর্ঘদিন ধরে বিচার চেয়ে রাস্তায় নামা এক মায়ের কান্না, ক্ষোভ এবং লড়াই ধীরে ধীরে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহকেও বদলে দেয়। আর সেই আন্দোলনের মুখ হিসেবেই উঠে আসেন নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধুমাত্র বিচারপ্রার্থী মা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং রাজনৈতিক ময়দানেও প্রবেশ করেছেন। বর্তমানে তিনি উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটির নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক। আর এবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁর একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক।
“আমি আর মমতা দুজনেই সর্বহারা”
বৈঠক শেষে সামাজিক মাধ্যমে রত্না দেবনাথ যে পোস্টটি করেন, তার একটি লাইন ঘিরেই এখন রাজ্য রাজনীতি সরগরম। তিনি লেখেন,
“আজ আমি এবং মমতা দুজনেই সর্বহারা।”
এই একটি বাক্য নিয়েই শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক চর্চা। কারণ এর পরেই তিনি আরও লেখেন,
“তফাত শুধু একটাই— আমি আমার একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মানুষের জন্য কাজ করার শপথ নিয়েছি। আর উনি নিজের ক্ষমতার আসন হারিয়ে আজ সর্বহারা হয়েছেন।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরাসরি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই নিশানা করেছেন।
কড়া হুঁশিয়ারিও দিলেন রত্না দেবনাথ
শুধু রাজনৈতিক কটাক্ষেই থেমে থাকেননি পানিহাটির বিধায়িকা। তাঁর পোস্টে আরও একটি অংশ ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
তিনি লেখেন,
“অপেক্ষা করুন। আগামী দিনে আরও অনেকের করুণ পরিণতি সামনে আসবে।”
এই মন্তব্যকে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। বিশেষ করে আরজি কর কাণ্ডের তদন্ত এবং তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ফের নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজনৈতিক মহলে।
আরজি কর কাণ্ডের পর বদলে গিয়েছিল বাংলার রাজনীতি
আরজি করের ঘটনার পর রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একেবারে বদলে যায়। দীর্ঘদিন ধরে বিচার না মেলার অভিযোগ, প্রমাণ লোপাটের দাবি এবং প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের একের পর এক আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল তৎকালীন সরকারকে।
এই আবহেই নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথ প্রতিবাদের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। পরে বিজেপির টিকিটে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জয়ীও হন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর জয় শুধুমাত্র রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও আবেগের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিপুল ভোটে জয় পানিহাটিতে
নির্বাচনে রত্না দেবনাথ বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। সূত্র অনুযায়ী, তিনি প্রায় ২৮ হাজারেরও বেশি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে পরাজিত করেন।
এই জয়ের পর থেকেই বিজেপি শিবিরে তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে যায়। বিশেষ করে আরজি কর ইস্যুতে জনমত তৈরি করতে তাঁর ভূমিকা দলীয় স্তরেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শুভেন্দুর সঙ্গে বৈঠক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে রত্না দেবনাথের সাম্প্রতিক বৈঠককে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
কারণ নির্বাচনের সময় থেকেই বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করেছিল, ক্ষমতায় এলে আরজি কর কাণ্ডের তদন্ত নতুনভাবে শুরু করা হবে। সেই প্রতিশ্রুতির দিকেই এবার সরকার এগোচ্ছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
SIT তদন্ত ঘিরে বাড়ছে চাপ
হাইকোর্টের নির্দেশে ইতিমধ্যেই এই মামলায় বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠন করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, সিবিআইয়ের এক শীর্ষ আধিকারিকের নেতৃত্বে এই তদন্ত চলছে।
এছাড়া মামলার শুনানিও চলছে উচ্চ আদালতে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একাধিক প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও সূত্রের খবর।
এই পরিস্থিতিতে রত্না দেবনাথের সাম্প্রতিক পোস্ট নতুন করে রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দিল বলেই মনে করছেন অনেকে।
রাজনৈতিক কটাক্ষ নাকি আবেগের বহিঃপ্রকাশ?
রত্না দেবনাথের পোস্টকে ঘিরে এখন দু’ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
একাংশের মতে, এটি একজন সন্তানের বিচার চাওয়া মায়ের আবেগ এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, এই ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও, আরজি কর কাণ্ড যে এখনও বাংলার মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে, তা স্পষ্ট।
এখন নজর তদন্তের দিকে
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং আগামী দিনে আরও কী কী তথ্য সামনে আসে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আরজি কর মামলা আগামী দিনেও বাংলার রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়েই থাকবে। আর সেই কারণেই রত্না দেবনাথের প্রতিটি মন্তব্য এখন রাজনৈতিক মহলে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
একজন বিধায়ক হিসেবে নয়, বরং বিচার চাওয়া এক মায়ের পরিচয়ই এখনও তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি—এমনটাই মনে করছেন বহু মানুষ।



