২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। আর সেই নতুন সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে সরকার গঠনের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বেশি চর্চার বিষয়—নতুন মন্ত্রিসভায় কে কোন দফতরের দায়িত্ব পেতে চলেছেন।
নবান্নে একের পর এক বৈঠক, দিল্লিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রশাসনিক স্তরে জোর প্রস্তুতির মধ্যেই সামনে আসতে শুরু করেছে সম্ভাব্য মন্ত্রী তালিকা ও দফতর বণ্টনের নানা তথ্য। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই নতুন মন্ত্রিসভা শুধুমাত্র ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতও বহন করছে।
আপাতত বহু দফতর নিজের হাতেই রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী
সূত্রের খবর, নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক স্থিতি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ রাখতে আপাতত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতর নিজের হাতেই রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
জানা গিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৪৪টি দফতরের দায়িত্ব সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে রয়েছে। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, প্রশাসনিক সংস্কার এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ সংক্রান্ত একাধিক বিভাগ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক ভিত শক্ত করতে প্রথম পর্যায়ে এই কৌশল নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।
হেভিওয়েট মন্ত্রীদের ওপর বাড়ছে চাপ
বর্তমানে সরকারের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অগ্নিমিত্রা পাল, দিলীপ ঘোষ, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনিয়া এবং ক্ষুদিরাম টুডু।
কিন্তু একাধিক ভারী দফতর একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে তাঁদের ওপর প্রশাসনিক চাপ বাড়ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। সেই কারণেই খুব দ্রুত পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা ঘোষণা করার প্রস্তুতি চলছে বলে নবান্ন সূত্রে খবর।
কোন নেতা পেতে পারেন কোন দফতর?
রাজনৈতিক মহলে ঘোরাফেরা করা সম্ভাব্য তালিকা অনুযায়ী, অগ্নিমিত্রা পালের কাজের দক্ষতায় খুশি শীর্ষ নেতৃত্ব। তাই তাঁকে পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবেই রাখা হতে পারে।
তবে বর্তমানে তাঁর হাতে থাকা নারী ও শিশুকল্যাণ দফতরটি অন্য কারও হাতে যেতে পারে। সেই জায়গায় সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে পূর্ণিমা চক্রবর্তী এবং রত্না দেবনাথের নাম।
অন্যদিকে, পরিবহণ দফতরের দায়িত্ব পেতে পারেন অর্জুন সিং। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কারণেই তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ দফতর দেওয়া হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
শিক্ষা দফতরে কার নাম এগিয়ে?
নতুন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির মধ্যে একটি হতে চলেছে শিক্ষা দফতরের দায়িত্ব বণ্টন। কারণ গত কয়েক বছরে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা নিয়ে রাজ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
এই আবহে শিক্ষা দফতরের জন্য সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হচ্ছে স্বপন দাশগুপ্তের নাম। রাজনৈতিক মহলের মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফেরাতে তাঁকে বড় দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র দফতর আপাতত নিজের হাতেই রাখছেন শুভেন্দু?
আরজি কর কাণ্ডসহ একাধিক বিতর্কিত ঘটনার পর রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সেই কারণেই আপাতত স্বাস্থ্য এবং স্বরাষ্ট্র—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দফতর নিজের হাতেই রাখতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
তবে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তনের লক্ষ্যে শারদ্বত মুখোপাধ্যায়কে স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রমন্ত্রী করা হতে পারে বলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।
অশোক দিন্দা পেতে পারেন বড় দায়িত্ব
খেলাধুলা এবং যুবকল্যাণ দফতরেও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সূত্রের খবর, বর্তমানে নিশীথ প্রামাণিকের হাতে থাকা ক্রীড়া দফতরটি প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার অশোক দিন্দার হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে।
ক্রিকেটার হিসেবে জনপ্রিয়তা এবং যুবসমাজের সঙ্গে সংযোগের কারণেই তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে বলে দাবি রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
তথ্য ও সংস্কৃতি, আইন দফতরেও চমক
নতুন সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরে রুদ্রনীল ঘোষের নাম জোরালোভাবে উঠে আসছে। অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সংস্কৃতি ক্ষেত্রের দায়িত্বে তাঁকে দেখা যেতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে।
অন্যদিকে আইনমন্ত্রী হিসেবে তরুণজ্যোতি তিওয়ারি এবং কৌস্তভ বাগচীর নাম নিয়ে জল্পনা চলছে।
প্রশাসনিক ভারসাম্যই মূল লক্ষ্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে বিজেপি নেতৃত্ব মূলত দুইটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছে—অভিজ্ঞতা এবং তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
একদিকে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে তরুণ মুখদেরও সামনে আনার চেষ্টা চলছে।
এর মাধ্যমে প্রশাসনিক গতি বাড়ানো, স্বচ্ছতা আনা এবং নতুন সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করাই মূল লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
কবে প্রকাশ পেতে পারে পূর্ণাঙ্গ তালিকা?
নবান্ন সূত্রে খবর, দিল্লিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা শেষ হওয়ার পর আগামী ২৭ বা ২৮ মে-র মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা এবং দফতর বণ্টনের তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হতে পারে।
তবে শেষ মুহূর্তে কিছু নাম বা দফতরে পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এখন দেখার, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন এই নতুন “টিম বেঙ্গল” আগামী দিনে সত্যিই বাংলার প্রশাসনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।



