Khamenei Death : ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়—একজন রাষ্ট্রনেতার মৃত্যুর খবরে শোক নয়, বরং উল্লাসে ফেটে পড়ছে সেই দেশেরই সাধারণ মানুষ। কিন্তু বর্তমানে ইরানে ঠিক এমনই এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির ছবি সামনে এসেছে। ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-এর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে প্রকাশ্য উদযাপন। ঢাকঢোল, নাচ-গান, স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছে রাস্তাঘাট। বহু মানুষের চোখে-মুখে একটাই অনুভূতি—দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর যেন তারা আবার ‘মুক্ত হাওয়ার’ স্বাদ পাচ্ছেন।
শোক নয়, আনন্দে ভাসছে তেহরান
সংবাদমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তেহরান-সহ ইরানের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছেন। কোথাও বাজছে গান, কোথাও উঠছে শাসনবিরোধী স্লোগান। বহু মহিলা প্রকাশ্যে হিজাব খুলে আনন্দ উদযাপন করছেন—যা ইরানের কট্টর ধর্মীয় শাসনের প্রেক্ষাপটে একেবারেই ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দৃশ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে খামেনেইয়ের শাসন ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কতটা গভীর ছিল। সাধারণভাবে কোনও মানুষের মৃত্যুতেই মানবিক শোক প্রকাশ পায়। কিন্তু এখানে উল্টো ছবি—একটি দেশের জনগণ প্রকাশ্যেই নাচছে, গান গাইছে, যেন বহুদিনের দমবন্ধ করা কষ্টের অবসান ঘটেছে।
কেন এত ক্ষোভ?
খামেনেইয়ের শাসনকাল জুড়ে ইরানে কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব, নারী অধিকার হ্রাস এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও মহিলাদের মধ্যে ক্ষোভ জমছিল বছরের পর বছর। অনেকের মতে, এই শাসনব্যবস্থা ইরানকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে দেয়নি।
এই কারণেই খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবরে একাংশ ইরানবাসীর প্রতিক্রিয়া এতটা তীব্র। তাঁদের কাছে এটি শুধুমাত্র একজন নেতার মৃত্যু নয়, বরং এক দমনমূলক অধ্যায়ের অবসান।
নেতানিয়াহুর বার্তা, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর ইরানের জনগণের উদ্দেশে সরাসরি বার্তা দিয়েছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। একটি ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন,
“ইরানের নাগরিকগণ, এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। এই ধরনের মুহূর্ত প্রতিটি প্রজন্মে একবারই আসে। আপনারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসী শাসনের অবসান ঘটান।”
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা শুধু নিজেদের জনগণের নয়, গোটা বিশ্বের জন্যও হুমকি ছিল। তাঁর বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
রাজতন্ত্র ফেরানোর দাবি?
খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। সমাজমাধ্যমে বহু মানুষ দাবি তুলছেন, নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি যেন দেশের নেতৃত্বে ফিরে আসেন। তাঁদের মতে, পাহলভি পরিবারের আমলে ইরান ছিল তুলনামূলকভাবে উদার ও আধুনিক রাষ্ট্র।
যদিও এই দাবি বাস্তবে কতটা রূপ পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এটুকু স্পষ্ট—ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ রয়েছে।
‘স্বাধীনতার গন্ধ’ পাচ্ছেন মানুষ?
অনেক ইরানবাসীর বক্তব্য, খামেনেইয়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা যেন আবার স্বাধীনতার সুবাস পাচ্ছেন। যদিও সামনে যে পথ সহজ নয়, তা সকলেই জানেন। ক্ষমতার শূন্যতা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত, আন্তর্জাতিক চাপ—সব মিলিয়ে ইরানের ভবিষ্যৎ এখন এক বড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে।
শেষ কথা
একজন রাষ্ট্রনেতার মৃত্যুর পর দেশের মানুষ যদি প্রকাশ্যে উৎসবে মেতে ওঠে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে ইতিহাসে বিরল ঘটনা। খামেনেইয়ের মৃত্যু ঘিরে ইরানে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়—বরং একটি দীর্ঘ দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এই উল্লাস শেষ পর্যন্ত ইরানকে কোন পথে নিয়ে যায়, তা জানতে তাকিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব।



