Mamata Banerjee News : আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচনের আগে ভবানীপুরকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে ফের তুঙ্গে উত্তেজনা। ভোটের আগে একপ্রকার ঘোষণা করেই দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—ভবানীপুর থেকেই তিনি প্রার্থী হচ্ছেন এবং সেখান থেকেই জয়ী হবেন। শুধু তাই নয়, আত্মবিশ্বাসের সুরে তিনি জানিয়ে দিলেন, “একটা ভোটে হলেও আমি জিতব।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
সোমবার ভবানীপুরে এক জনসভা থেকে বিরোধীদের উদ্দেশে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তৃণমূল সুপ্রিমো। স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমাকে আটকানোর ক্ষমতা কারও নেই। ভবানীপুরে কোনও বিরোধী শক্তির জায়গা হবে না।” তাঁর এই বক্তব্যের পরই বিজেপির তরফে পালটা কটাক্ষ শুরু হয়েছে।
ভবানীপুরেই কেন এত আত্মবিশ্বাস?
ভবানীপুর দীর্ঘদিন ধরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শক্ত ঘাঁটি। অতীতে একাধিকবার এই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই হয়তো এবারও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “এই কেন্দ্রের মানুষ আমাকে চেনেন, জানেন। তাই কোনও ষড়যন্ত্রই আমাকে আটকাতে পারবে না।”
তবে এবারের লড়াই যে আগের মতো সহজ নয়, তার ইঙ্গিত মিলেছে ভোটার তালিকা ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে।
ভোটার তালিকা বিতর্ক ও নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ
সম্প্রতি এসআইআর (Special Intensive Revision)-এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর রাজ্য জুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সেই তালিকা অনুযায়ী, গোটা রাজ্যে প্রায় ৬৩ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। যার মধ্যে শুধু ভবানীপুর কেন্দ্রেই বাদ গিয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার ভোটারের নাম। এই তথ্য সামনে আসতেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন মুখ্যমন্ত্রী।
মমতার অভিযোগ, ভোটের আগে পরিকল্পিত ভাবে ভোটারদের নাম ‘ভ্যানিশ’ করা হচ্ছে। নাম না করে তিনি জাতীয় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন,
“দেশের সংবিধান আজ বিপদের মুখে। সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা পালন করছে।”
‘ভবানীপুরে ভোটার থাকবে কোথায়?’
নিজের কেন্দ্র নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
“ভবানীপুর খুব বড় কেন্দ্র নয়। এখানে মোট ভোটার প্রায় ২ লক্ষ ৬ হাজার। সেখানে প্রথমে ৪৪ হাজার, পরে আরও হাজার হাজার ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাহলে ভোটার থাকল কোথায়?”
তবুও আত্মবিশ্বাসে কোনও ঘাটতি নেই তাঁর কণ্ঠে। স্পষ্ট ঘোষণা,
“ভবানীপুরে আমিই জিতব। এক ভোটে হলেও জিতব। এই বিশ্বাস কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।”
‘বিচারাধীন’ ভোটার ও মানবিক প্রশ্ন
এসআইআর তালিকায় এখনও প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে ‘বিচারাধীন’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে আরও তীব্র আক্রমণ শানান মমতা।
তিনি বলেন,
“আমি কোনও সম্প্রদায়ের কথা বলছি না। যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁরা সাধারণ মানুষ। প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দেওয়ার পরও তাঁদের নাম কাটা হয়েছে। এতে তাঁদের কোনও দোষ নেই।”
ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় বা বিচারাধীন অবস্থায় থাকার কারণে অনেক জায়গায় মানুষের মৃত্যুর খবর সামনে আসছে বলেও দাবি করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন,
“যদি নাম না থাকায় মানুষ মারা যায়, তার দায় কার?”
বিজেপি ও কেন্দ্রকে কটাক্ষ
মমতার অভিযোগ, ভোটের আগে ভোট করিয়ে নিতে চাইছে নির্বাচন কমিশন। তাঁর দাবি, বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন,
“ওরা গণতান্ত্রিক ভাবে লড়াই করতে পারছে না। তাই পক্ষপাতদুষ্ট সংস্থার মাধ্যমে কাজ করাতে চাইছে। কিন্তু বাংলার মানুষ এই অত্যাচার মেনে নেবে না।”
রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?
ভবানীপুরে মমতার প্রার্থী হওয়া এবং এই আগ্রাসী বার্তা নিঃসন্দেহে রাজ্য রাজনীতিতে বড় ইঙ্গিত। একদিকে ভোটার তালিকা বিতর্ক, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা—সব মিলিয়ে এই উপনির্বাচন যে শুধু একটি আসনের লড়াই নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার মঞ্চ হতে চলেছে, তা স্পষ্ট।
বিরোধীদের কটাক্ষ, কমিশনের ভূমিকা এবং কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত—সবকিছুর মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিলেন, ভবানীপুর থেকে তাঁর লড়াই শুধুই জয় নয়, বরং ‘অধিকার রক্ষার’ লড়াই।



