নতুন সরকার গঠন হতেই বড়সড় সিদ্ধান্ত! তামিলনাড়ু জুড়ে এক ধাক্কায় বন্ধ হতে চলেছে ৭১৭টি মদের দোকান। মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পরেই এমন কড়া পদক্ষেপে তোলপাড় রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ। কারণ, যে মদ বিক্রি থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আসে রাজ্যের কোষাগারে, সেই ক্ষেত্রেই এবার সরাসরি কাঁচি চালাল সরকার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— জনস্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার কৌশল?
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাসস্ট্যান্ডের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে থাকা সমস্ত মদের দোকান আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বন্ধ করে দিতে হবে। প্রশাসনের দাবি, জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব কমানো এবং সামাজিক পরিবেশকে আরও নিরাপদ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের আশেপাশে মদের দোকান থাকার কারণে পড়ুয়াদের উপর খারাপ প্রভাব পড়ছিল বলেই অভিযোগ উঠছিল দীর্ঘদিন ধরে। একইসঙ্গে মন্দির এলাকা এবং ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ডের কাছেও বহুবার সাধারণ মানুষের তরফে আপত্তি জানানো হয়েছিল।
জানা গিয়েছে, তামিলনাড়ু স্টেট মার্কেটিং কর্পোরেশন বা TASMAC-এর অধীনে বর্তমানে কয়েক হাজার মদের দোকান চালু রয়েছে। তার মধ্যে বহু দোকান সরকারি নিয়ম মেনে স্থাপন করা হয়নি বলেই অভিযোগ ছিল। নতুন সরকার সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখার পরই এই বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, বন্ধ হওয়া দোকানগুলির মধ্যে কয়েকশো দোকান মন্দিরের কাছাকাছি, বহু দোকান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে এবং বাকিগুলি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত।
সবথেকে বড় বিষয় হল, এই সিদ্ধান্ত সরাসরি রাজ্যের আয়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ শুধুমাত্র মদ বিক্রি থেকেই প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আসে সরকারি কোষাগারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় সংখ্যায় দোকান বন্ধ হয়ে গেলে সরকারের আয়ে বড়সড় ধাক্কা লাগতে পারে। তবে সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, শুধুমাত্র টাকার জন্য সমাজের ক্ষতি হতে দেওয়া যাবে না। প্রশাসনের বক্তব্য, মানুষের স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা রাজস্বের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই সিদ্ধান্তের পিছনে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে দুর্নীতির অভিযোগ। গত কয়েক বছরে TASMAC-কে ঘিরে একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছিল। তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্টে কোটি কোটি টাকার হিসাব বহির্ভূত লেনদেনের কথাও উঠে আসে। এমনকি সেই বিতর্ক আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। যদিও দীর্ঘদিনেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই গোটা ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত করার পথে হাঁটছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। একাংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, স্কুল বা ধর্মীয় স্থানের কাছে মদের দোকান থাকা কখনই উচিত নয়। এতে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে মহিলাদের নিরাপত্তা এবং এলাকার পরিবেশ খারাপ হওয়ার অভিযোগ বহুদিনের। তাই সরকার সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই মত তাঁদের।
অন্যদিকে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, শুধুমাত্র কিছু দোকান বন্ধ করলেই কি সমাজ বদলে যাবে? বরং অবৈধ মদের কারবার আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। কারণ বৈধ দোকান কমে গেলে কালোবাজারি মাথাচাড়া দিতে পারে। এছাড়াও হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যাঁরা এই দোকানগুলিতে কাজ করতেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মধ্যে বড় রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। নতুন সরকার নিজেদের “জনমুখী” ভাবমূর্তি তৈরি করতে চাইছে। বিশেষ করে নারী ভোটার এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। কারণ দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে সামাজিক ইস্যুগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে বাস্তবে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার। দোকান বন্ধের পর এলাকায় অপরাধ কমে কিনা, সামাজিক পরিবেশ উন্নত হয় কিনা কিংবা সরকারের রাজস্বে কতটা প্রভাব পড়ে— সেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই। কিন্তু এটা স্পষ্ট, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে। আর ৭১৭টি মদের দোকান বন্ধের সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনেরই সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।



