জম্মু ও কাশ্মীরে ভারী বৃষ্টির জেরে বাগলিহার বাঁধ থেকে জল ছাড়া হল, নিম্ন অববাহিকায় সতর্কতা জারি পাকিস্তানের
জম্মু ও কাশ্মীরে টানা বৃষ্টির ফলে চন্দ্রভাগা (চেনাব) নদীর জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বাগলিহার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একাধিক স্পিলওয়ে গেট খুলে দিতে হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে নদীর নিম্ন অববাহিকায়। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় বন্যার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে স্থানীয় প্রশাসন সতর্কতা জারি করেছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন চেনাব নদীর জলপ্রবাহ এবং সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলের নজরে রয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক কারণে নেওয়া এই পদক্ষেপও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
কেন খুলতে হল বাগলিহার বাঁধের গেট?
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরের ডোডা ও কিস্তওয়ার অঞ্চলে কয়েকদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে চন্দ্রভাগা নদীতে জলপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সেই কারণে বাগলিহার জলাধারের জলস্তর নির্ধারিত নিরাপত্তা সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
বাঁধের উপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে কর্তৃপক্ষ তিনটি স্পিলওয়ে গেট খুলে দেয়। সরকারি সূত্রের দাবি, এটি সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাজনিত সিদ্ধান্ত। বাঁধের কাঠামো সুরক্ষিত রাখা এবং উজানের এলাকায় অতিরিক্ত জল জমে ঝুঁকি তৈরি হওয়া রোধ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, গেট খোলার আগে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই পাকিস্তানকে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল যাতে নিম্নাঞ্চলে প্রশাসন আগাম প্রস্তুতি নিতে পারে।
বাগলিহার প্রকল্পের গুরুত্ব কী?
চন্দ্রভাগা নদীর উপর নির্মিত বাগলিহার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রান-অফ-দ্য-রিভার হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্প। এই ধরনের প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি নদীর জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণেও নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিবৃষ্টির সময়ে জলাধারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে জল ছাড়া ছাড়া বিকল্প থাকে না। অন্যথায় বাঁধের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
পাকিস্তানে কেন বাড়ল উদ্বেগ?
ভারত থেকে জল ছাড়ার পর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং উদ্ধারকারী সংস্থাগুলিকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, চন্দ্রভাগা নদীর জলস্তর কয়েক মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে শিয়ালকোট-সহ কয়েকটি নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতির উপর ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানো হচ্ছে।
তবে এখনও পর্যন্ত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কোনও সরকারি তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপট
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই পাকিস্তানের কিছু রাজনৈতিক নেতা এবং সংবাদমাধ্যমে চেনাব নদীর জলপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, নদীতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম জল পৌঁছাচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতীয় পক্ষ বরাবরই জানিয়ে এসেছে, জলপ্রবাহের পরিবর্তন মূলত আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত এবং জলাধার পরিচালনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় যে নিয়মগুলি প্রযোজ্য, সেগুলি মেনেই জল ব্যবস্থাপনা করা হয় বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ভারী বৃষ্টির কারণে হঠাৎ জল ছাড়ার ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সিন্ধু জলচুক্তির সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক কতটা?
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু জলচুক্তি দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের জল ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। যদিও সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উত্তেজনার আবহে এই চুক্তি নিয়েও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
তবে সরকারি সূত্রের দাবি, বাগলিহার বাঁধ থেকে জল ছাড়া কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি সম্পূর্ণরূপে আবহাওয়া পরিস্থিতি এবং বাঁধ পরিচালনার নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
নদীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা। কৃষিজমি, নিম্নাঞ্চলের বসতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেই কারণেই আগাম সতর্কতা জারি করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের ক্ষেত্রেও উজানের এলাকায় অতিবৃষ্টির পরিস্থিতিতে জলাধার নিরাপদ রাখা সমানভাবে জরুরি। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিতভাবে জল ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত একটি প্রক্রিয়া।
কী বলছে সরকারি অবস্থান?
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছে, অতিরিক্ত জলাধার চাপ কমানোর জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আবহাওয়ার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাঁধ পরিচালনার যে প্রযুক্তিগত নিয়ম রয়েছে, সেই অনুযায়ীই স্পিলওয়ে গেট খোলা হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানও সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে।
পরিস্থিতির উপর নজর দুই দেশেই
চন্দ্রভাগা নদীর জলস্তর এখন আবহাওয়ার উপর নির্ভর করছে। আগামী কয়েকদিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। সেই কারণে ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নদীর প্রবাহ এবং জলাধারের অবস্থার উপর নিয়মিত নজর রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত অতিক্রমকারী নদীগুলির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে তথ্য আদান-প্রদান, আগাম সতর্কতা এবং বৈজ্ঞানিক জল ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতেও একই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



