চিনের সামরিক আধুনিকীকরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই নজর রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা একটি স্যাটেলাইট ছবি সেই আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে। ছবিতে দেখা গিয়েছে, জিনজিয়াংয়ের একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে মার্কিন নৌবাহিনীর Arleigh Burke-class guided-missile destroyer-এর আদলে তৈরি একটি বড় আকারের রেপ্লিকা স্থাপন করা হয়েছে। এই অবকাঠামোর উদ্দেশ্য নিয়ে এখনও বেজিং আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে এটি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
কী দেখা গিয়েছে স্যাটেলাইট ছবিতে?
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে জিনজিয়াংয়ের রুওকিয়াং (Ruoqiang) এলাকার একটি সামরিক পরীক্ষাকেন্দ্রে মার্কিন ডেস্ট্রয়ারের আকৃতির একটি কাঠামো দেখা যায়। আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এর নকশা যুক্তরাষ্ট্রের Arleigh Burke শ্রেণির যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে বেশ মিল রয়েছে।
তবে এটি কার্যকর যুদ্ধজাহাজ নয়, বরং পরীক্ষামূলক উদ্দেশ্যে তৈরি একটি স্থলভিত্তিক রেপ্লিকা বলেই মনে করা হচ্ছে।
কেন তৈরি করা হতে পারে এই রেপ্লিকা?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা, চলমান বা বাস্তবসম্মত লক্ষ্যবস্তুর উপর জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা যাচাই করতেই এই ধরনের কাঠামো ব্যবহার করা হতে পারে।
আধুনিক নৌযুদ্ধে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নয়, দ্রুতগতির লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও নির্ভুলভাবে আঘাত করার ক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাস্তব যুদ্ধজাহাজের অনুরূপ কাঠামো তৈরি করে পরীক্ষা চালানো অনেক দেশের সামরিক গবেষণায় দেখা যায়।
রেললাইনের উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
স্যাটেলাইট ছবিতে রেপ্লিকার নিচে একটি সরু রেললাইনও দেখা গিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে কাঠামোটিকে সীমিত পরিসরে সরিয়ে চলমান জাহাজের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
যদি এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে স্থির লক্ষ্য নয়, বরং চলন্ত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা মূল্যায়নের উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই বিষয়ে চিনের পক্ষ থেকে কোনও সরকারি ব্যাখ্যা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
কেন Arleigh Burke শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ গুরুত্বপূর্ণ?
Arleigh Burke শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান যুদ্ধজাহাজ। এগুলি আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ, সাবমেরিনবিরোধী অভিযান এবং দূরপাল্লার আক্রমণসহ একাধিক কৌশলগত দায়িত্ব পালন করে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতিতে এই শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এই ধরনের নকশার রেপ্লিকা সামরিক গবেষণার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
চিন কী বলেছে?
এখনও পর্যন্ত চিন সরকার বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই কাঠামো নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
ফলে এটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, সেন্সর মূল্যায়ন, ড্রোন প্রশিক্ষণ নাকি অন্য কোনও গবেষণামূলক প্রকল্পের অংশ—সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চিন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে নতুন প্রযুক্তি ও অস্ত্র ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে জিনজিয়াংয়ে যুদ্ধজাহাজের আদলে তৈরি এই রেপ্লিকা আন্তর্জাতিক সামরিক মহলের নজর কেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের নৌযুদ্ধের প্রস্তুতিতে লক্ষ্যভিত্তিক পরীক্ষার গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে, আর সেই কারণেই এই অবকাঠামো নিয়ে এত আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এখন কী জানা বাকি?
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, এই রেপ্লিকা ঠিক কোন প্রকল্পের অংশ এবং এর মাধ্যমে কী ধরনের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। সরকারি ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ সামনে এলেও, সেগুলিকে এখনও নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ধরা যায় না।
তবে স্যাটেলাইট ছবির ভিত্তিতে এটুকু স্পষ্ট যে, চিন তাদের সামরিক গবেষণা ও পরীক্ষামূলক অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ অব্যাহত রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।



