ঋণের EMI বকেয়া পড়লেই রাত-বিরেতে ফোন, পরিবারের সদস্যদের কাছে খবর দেওয়া কিংবা বারবার হুমকির অভিযোগ—রিকভারি এজেন্টদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নতুন নয়। এবার ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়ায় গ্রাহকের অধিকার এবং ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষায় আরও কড়া নিয়মের কথা সামনে এসেছে।
প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থায় রিকভারি এজেন্টদের ফোন করার সময়সীমা থেকে শুরু করে গ্রাহকের পরিবারকে যোগাযোগ করা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং বাড়িতে গিয়ে চাপ তৈরির মতো বিষয়গুলিতে একাধিক বিধিনিষেধ আনার কথা বলা হয়েছে। নিয়ম কার্যকর হলে ঋণ বকেয়া থাকলেও গ্রাহককে হেনস্থা করার সুযোগ অনেকটাই কমবে।
সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা—ফোনের সময়ও বেঁধে দেওয়া হচ্ছে
নতুন নির্দেশিকায় রিকভারি এজেন্টদের যোগাযোগের সময় নিয়ে স্পষ্ট সীমা রাখার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সকাল ৮টার আগে এবং সন্ধ্যা ৭টার পরে ঋণগ্রহীতাকে ফোন করা যাবে না। অর্থাৎ বকেয়া EMI আদায়ের জন্য ইচ্ছেমতো সময়ে ফোন করে চাপ তৈরি করার সুযোগ থাকবে না।
শুধু ফোনের সময় নয়, যোগাযোগের ধরন নিয়েও কঠোর বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
পরিবার বা আত্মীয়কে ফোন করে চাপ দেওয়া যাবে না
ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে তাঁর পরিবার, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের অযথা ফোন করে বিষয়টি জানানো কিংবা তাঁদের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করার প্রবণতা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ঋণগ্রহীতাকে অপমান করা, ভয় দেখানো, অশালীন ভাষা ব্যবহার করা কিংবা লাগাতার ফোন করে মানসিক চাপ তৈরি করা গ্রহণযোগ্য হবে না।
এর ফলে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়ায় গ্রাহকের গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বকেয়া ঋণের জন্য কি গ্রাহকের ফোন বন্ধ করে দেওয়া যাবে?
এই প্রশ্নটি নিয়েই অনেক ঋণগ্রহীতার উদ্বেগ থাকে।
প্রদত্ত নিয়ম অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তিগত ঋণের EMI বকেয়া থাকলেই তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তবে কোনও নির্দিষ্ট ডিভাইস কেনার জন্য ঋণ নেওয়া হয়ে থাকলে এবং চুক্তিতে সেই ধরনের ব্যবস্থা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলে, সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
অর্থাৎ ব্যক্তিগত ডিভাইসের উপর ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ নেওয়া আর নির্দিষ্ট ঋণের আওতায় কেনা সম্পদের চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা—দুটি বিষয়কে এক করে দেখা যাবে না।
ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে অপমান করা যাবে না
ঋণ আদায়ের নামে গ্রাহকের ব্যক্তিগত ছবি, অডিও, ভিডিও বা অন্য কোনও তথ্য প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়েও কড়া অবস্থানের কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে ঋণগ্রহীতাকে সামাজিকভাবে হেয় করা বা সম্মানহানি করার চেষ্টা নিষিদ্ধ করার কথা রয়েছে।
ঋণ বকেয়া থাকা একটি আর্থিক বিষয়। সেটিকে কেন্দ্র করে কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে এনে চাপ তৈরি করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়—নতুন ব্যবস্থায় এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাড়ি বা অফিসে গিয়ে আচমকা চাপ তৈরি নয়
রিকভারি এজেন্টের সরাসরি সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও নিয়ম আরও নির্দিষ্ট করার কথা বলা হয়েছে।
কোনও ফিজিক্যাল ভিজিটের প্রয়োজন হলে আগে থেকে ঋণগ্রহীতাকে জানাতে হবে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, কমপক্ষে এক দিন আগে নোটিস দিয়ে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে হবে এবং গ্রাহকের নির্ধারিত স্থানে দেখা করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
এর ফলে হঠাৎ বাড়ি বা কর্মস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার মতো ঘটনা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
প্রতিটি কল ও বার্তার রেকর্ড রাখতে হবে
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল রিকভারি প্রক্রিয়ার রেকর্ড সংরক্ষণ।
ঋণ আদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ফোনকল, সময় এবং বার্তার তথ্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এই রেকর্ড অন্তত ছয় মাস রাখা হবে।
এর ফলে কোনও গ্রাহক রিকভারি এজেন্টের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের তথ্য পর্যালোচনা করার সুযোগ তৈরি হবে।
তৃতীয় পক্ষের এজেন্ট হলেও দায় ব্যাঙ্কের
অনেক ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ আদায়ের কাজে বাইরের বা থার্ড-পার্টি রিকভারি এজেন্সির সাহায্য নেয়।
কিন্তু কোনও এজেন্সি নিয়ম ভাঙলে তার দায় এড়িয়ে যেতে পারবে না মূল ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান—এমন নীতিই এখানে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থাৎ, ব্যাঙ্ক নিজের হয়ে কাজ করার জন্য তৃতীয় পক্ষকে নিয়োগ করলেও গ্রাহকের সঙ্গে সেই এজেন্টের আচরণের দায় পুরোপুরি এড়াতে পারবে না।
এটি গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে ঋণ বকেয়া থাকলে ব্যাঙ্ক কী করতে পারবে?
নতুন নিয়মের উদ্দেশ্য ঋণগ্রহীতাকে বকেয়া ঋণ পরিশোধের দায় থেকে মুক্ত করা নয়।
EMI না দিলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান চুক্তি এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বৈধভাবে টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া চালাতে পারবে। তবে সেই প্রক্রিয়ায় হুমকি, অপমান, অযাচিত চাপ বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা যাবে না।
অর্থাৎ, নিয়মের মূল বক্তব্য হল—ঋণ আদায় করা যাবে, কিন্তু গ্রাহককে হেনস্থা করে নয়।
কবে থেকে কার্যকর হবে নতুন নিয়ম?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন নির্দেশিকাগুলি ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।
তবে পাঠকদের জন্য একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং নিয়মগুলির চূড়ান্ত ভাষা সম্পর্কে RBI-এর সর্বশেষ সরকারি সার্কুলার বা বিজ্ঞপ্তিই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। তাই কোনও আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক বা RBI-এর সরকারি নির্দেশিকা যাচাই করা উচিত।
সাধারণ ঋণগ্রহীতার জন্য এর অর্থ কী?
নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে EMI বকেয়া পড়ার পর রিকভারি প্রক্রিয়ায় গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও নির্দিষ্ট সীমা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে রাত-বিরেতে ফোন, পরিবারকে জানিয়ে চাপ সৃষ্টি, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ কিংবা ভয় দেখানোর মতো অভিযোগের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে EMI বকেয়া রাখলেও কোনও পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। ঋণ চুক্তির শর্ত মেনে বৈধ recovery process চলবেই।
একটি কথা মনে রাখা জরুরি
কোনও রিকভারি এজেন্ট নিয়মবহির্ভূত আচরণ করলে ফোন নম্বর, কলের সময়, মেসেজ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংরক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে অভিযোগ করা যেতে পারে।
ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব যেমন গ্রাহকের, তেমনই ঋণ আদায়ের সময় আইনসঙ্গত ও সম্মানজনক আচরণ করা ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। RBI-এর এই ধরনের নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য সেই ভারসাম্যই নিশ্চিত করা।



