সিনেমায় বন্দুক হাতে নায়ককে দেখে বিষয়টি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ভারতে আইনিভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা মোটেও সহজ নয়। দোকানে গিয়ে পছন্দের বন্দুক কিনে নেওয়ার সুযোগ নেই। তার আগে প্রয়োজন সরকারি লাইসেন্স এবং সেই লাইসেন্স পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ করতে হয়।
ভারতে আগ্নেয়াস্ত্রের মালিকানা ও ব্যবহার মূলত Arms Act, 1959 এবং Arms Rules, 2016-এর অধীনে নিয়ন্ত্রিত। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের NDAL-ALIS পোর্টালেও ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স সংক্রান্ত নিয়ম ও আবেদনপদ্ধতি দেওয়া রয়েছে।
সাধারণ নাগরিক কি বন্দুকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন?
হ্যাঁ, পারেন। তবে শুধু ‘আমার বন্দুক রাখার ইচ্ছা আছে’—এটি যথেষ্ট কারণ নয়।
Permissible category-এর অস্ত্রের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর জীবন বা সম্পত্তি সুরক্ষার genuine requirement রয়েছে কি না, সেটি বিবেচনা করা হয়। আবেদনকারীর পেশা, ব্যবসা বা পরিস্থিতির ভিত্তিতেও বিষয়টি দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি পুলিশ রিপোর্ট ও লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের নিজস্ব মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, লাইসেন্স পাওয়া অধিকার হিসেবে স্বয়ংক্রিয় নয়; আবেদনটি যাচাই করে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়।
কোন কোন কারণে লাইসেন্সের আবেদন করা যায়?
১. আত্মরক্ষার প্রয়োজন
কারও জীবন বা সম্পত্তির প্রতি বাস্তব ও যুক্তিসঙ্গত ঝুঁকি থাকলে আবেদন বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মী, জনপ্রতিনিধি বা অন্য কোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়।
তবে শুধু সাধারণ ভয় বা আশঙ্কা দেখালেই লাইসেন্স মঞ্জুর হবে—এমন নিয়ম নেই। কর্তৃপক্ষকে আবেদনকারীর প্রয়োজন সম্পর্কে সন্তুষ্ট হতে হয় এবং পুলিশ রিপোর্টও বিবেচনায় আসে।
২. ব্যবসা বা পেশাগত কারণে নিরাপত্তা
কোনও ব্যক্তির ব্যবসা, পেশা বা কাজের প্রকৃতির কারণে জীবন বা সম্পত্তি রক্ষার জন্য অস্ত্রের প্রয়োজন রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করলে আবেদন বিবেচনা করতে পারে।
অর্থাৎ, শুধুমাত্র ‘আমি ব্যবসা করি’ বললেই লাইসেন্স পাওয়া যায় না। নিরাপত্তার প্রকৃত প্রয়োজন এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
৩. স্পোর্টস শুটিং
শুটিং খেলায় অংশগ্রহণকারীদের জন্যও আলাদা বিধান রয়েছে। Arms Rules অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শুটিং ক্লাব বা রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় সদস্য এবং কাঠামোবদ্ধভাবে sport shooting চালিয়ে যেতে চান—এমন খেলোয়াড়ের আবেদন বিবেচনা করা যেতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন দরকার: ‘ঠিক দুই বছর প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেই লাইসেন্স নিশ্চিত’—এমন সরল নিয়ম নেই। সংশ্লিষ্ট নিয়মে গত দুই বছর সক্রিয় সদস্য থাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে এবং আবেদনকারীর sport shooting-এর প্রমাণও প্রয়োজন।
লাইসেন্স থাকলেই কি যেকোনও বন্দুক কেনা যায়?
না।
ভারতের অস্ত্র আইনে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের জন্য আলাদা শ্রেণিবিন্যাস ও বিধিনিষেধ রয়েছে। Permissible এবং restricted category-এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে এবং লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে কোন ধরনের অস্ত্রের অনুমতি দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করতে পারে।
তাই ‘লাইসেন্স পেলেই ৯mm পিস্তল পাওয়া যায়’—এমন সাধারণীকরণও ঠিক নয়। আবেদনকারী যে ধরনের অস্ত্র চেয়েছেন, তার প্রয়োজন, অস্ত্রটির fire-power এবং প্রযোজ্য আইন দেখে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়।
ন্যূনতম বয়স কত?
সাধারণভাবে লাইসেন্স নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা বা বহনের ক্ষেত্রে ২১ বছর বয়সের সীমা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে sport shooting-এর জন্য ২১ বছরের কম বয়সীদের বিষয়ে বিশেষ বিধান রয়েছে। Arms Rules, 2016-এর Rule 36 অনুযায়ী, ১২ থেকে ২১ বছরের কম বয়সীরা প্রাপ্তবয়স্ক প্রশিক্ষক বা বৈধ লাইসেন্সধারীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে permissible category-এর অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারে। ২১ বছরের কম বয়সী কেউ নিজের মতো করে জনসমক্ষে অস্ত্র বহন করতে পারে না।
তাই ‘স্পোর্টস শুটার হলেই ১২ বছর বয়স থেকে নিজের বন্দুক বহন করা যায়’—এমন ধারণা ভুল।
কীভাবে আবেদন করবেন?
অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের NDAL-ALIS ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য নির্দিষ্ট আবেদনপত্র এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হয়।
সরকারের NDAL-ALIS Arms Licence Portal
আবেদনের সঙ্গে সাধারণত প্রয়োজন হয়—
- সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- জন্মতারিখের প্রমাণ
- পরিচয়পত্র
- প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিকানার প্রমাণ
- আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের FAQ-তে Form A-1 আবেদনের সঙ্গে ছবি, জন্মতারিখের প্রমাণ, Aadhaar বা বিকল্প পরিচয়পত্র এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে residence proof জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এরপর কী হয়?
আবেদন জমা দেওয়ার পরেই লাইসেন্স হাতে চলে আসে না।
আবেদনটি যাচাইয়ের জন্য পুলিশ রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ। এরপর সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর প্রয়োজন, যোগ্যতা এবং অন্যান্য তথ্য পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়। Permissible category-এর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে অস্ত্রের ধরন ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে।
নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আবেদন মঞ্জুর বা প্রত্যাখ্যানের কারণ লিখিতভাবে জানানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
তাহলে কি যে কেউ আবেদন করলেই লাইসেন্স পাবেন?
একেবারেই নয়।
আইন সাধারণ নাগরিককে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করার সুযোগ দেয়। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নির্ভর করে—
আবেদনকারীর প্রয়োজন + যোগ্যতা + পুলিশ রিপোর্ট + নথিপত্র + লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন
—এই সবকিছুর উপর।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, লাইসেন্স ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র রাখা বা বহন করা আইনত গুরুতর অপরাধ হতে পারে। তাই সিনেমা বা সামাজিক মাধ্যমে দেখা তথ্যের ভিত্তিতে কখনও অস্ত্র কেনা বা রাখার চেষ্টা করা উচিত নয়।
এক নজরে
লাইসেন্স ছাড়া বন্দুক? ❌ বেআইনি
সাধারণ নাগরিক আবেদন করতে পারেন? ✅ নির্দিষ্ট শর্তে
ন্যূনতম বয়স? সাধারণ ক্ষেত্রে ২১ বছর
আবেদন কোথায়? NDAL-ALIS
পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়? ✅
লাইসেন্স পেলেই যে কোনও অস্ত্র? ❌
স্পোর্টস শুটিংয়ের জন্য বিশেষ নিয়ম আছে? ✅
নোট: অস্ত্রের আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সর্বশেষ সরকারি নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অবশ্যই যাচাই করুন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বর্তমানে Arms Rules এবং NDAL-ALIS সংক্রান্ত সরকারি তথ্য প্রকাশ করে।



