রাজনীতির ব্যস্ততা, একের পর এক বৈঠক এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—সবকিছুর মাঝেও নিজের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে এক অনুষ্ঠানে অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে ২০ কেজিরও বেশি ওজন কমিয়েছেন এবং তাঁর দাবি অনুযায়ী, সাড়ে চার বছর ধরে কোনও অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ বা ইনসুলিনের প্রয়োজন হয়নি।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—এগুলি অমিত শাহের নিজের বক্তব্য ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য-অভিজ্ঞতা। এটিকে সবার জন্য ডায়াবেটিসের ওষুধ বন্ধ করার পরামর্শ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
২০২০ সাল থেকেই জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন
২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল দিল্লির Institute of Liver and Biliary Sciences-এর ‘Healthy Liver–Healthy India’ অনুষ্ঠানে নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলেছিলেন অমিত শাহ। তিনি জানান, ২০২০ সালের মে মাস থেকে ঘুম, জল খাওয়া, খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শরীরচর্চার দিকে বিশেষ নজর দেন।
অমিত শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তনগুলি ধীরে ধীরে তাঁর ওজন কমাতে এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার উন্নতিতে সাহায্য করে। কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় তাঁর ওজন ২০ কেজির বেশি কমেছে বলেও তিনি জানান।
কী ছিল অমিত শাহের ফিটনেস মন্ত্র?
নিজের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মূলত চারটি বিষয়ের উপর জোর দিয়েছেন—
১. ঘুমের সময় ঠিক রাখা
ব্যস্ততার মধ্যেও পর্যাপ্ত ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। তরুণদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ ছিল, মস্তিষ্কের জন্য অন্তত ছয় ঘণ্টা ঘুমের সময় রাখা উচিত।
২. পর্যাপ্ত জল পান
নিজের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের অন্যতম অংশ হিসেবে পর্যাপ্ত জল খাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন অমিত শাহ। তাঁর বক্তব্যে ঘুম, জল, খাবার এবং ব্যায়াম—এই চারটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে।
৩. খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ
কী খাবেন এবং কীভাবে খাবেন, সেদিকেও নজর দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। অর্থাৎ দ্রুত ওজন কমানোর কোনও ক্র্যাশ ডায়েটের বদলে দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাত্রার পরিবর্তনের উপরই জোর দিয়েছেন।
৪. নিয়মিত শরীরচর্চা
তরুণ প্রজন্মকে তিনি প্রতিদিন শরীরের জন্য দুই ঘণ্টা ব্যায়ামের সময় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর কথায়, শরীর ও মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে শরীরচর্চা এবং ঘুম—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ে কী বলেছিলেন শাহ?
অমিত শাহ জানিয়েছেন, আগে তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের পর তাঁর স্বাস্থ্যগত অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাড়ে চার বছরের মধ্যে তিনি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ এবং ইনসুলিন থেকে মুক্ত হয়েছেন।
তবে ‘ডায়াবেটিস পুরোপুরি সেরে গেছে’—এভাবে বিষয়টিকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক নয়। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ওজন নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক সক্রিয়তা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, কারও ওষুধ বা ইনসুলিন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ ও নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
সরকারি স্বাস্থ্য-তথ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২০ কেজি ওজন কমানোর পর কী বললেন অমিত শাহ?
শুধু ওজন কমানো নয়, এই পরিবর্তনের ফলে তাঁর কাজের ক্ষমতা, চিন্তাভাবনা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে কোনও দ্রুত সমাধানের পিছনে না ছুটে প্রতিদিনের অভ্যাসে ধারাবাহিক পরিবর্তন আনা জরুরি।
তবে কি সবার জন্য একই ফর্মুলা?
একেবারেই নয়। অমিত শাহের অভিজ্ঞতা অনুপ্রেরণাদায়ক হতে পারে, কিন্তু একজনের শরীরে যে পদ্ধতি কাজ করেছে, তা অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশেষ করে ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করা বিপজ্জনক হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ, রক্তে শর্করার পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তির বয়স ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতেই চিকিৎসা পরিবর্তন করা উচিত।
অমিত শাহের স্বাস্থ্যযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তাই কোনও ‘জাদুকরী ফর্মুলা’ নয়—বরং দীর্ঘদিন ধরে ঘুম, খাবার, জলপান ও শরীরচর্চার মতো মৌলিক অভ্যাসে নিয়মিত থাকা।



