Sunday, August 30, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাটকলকাতায় কিডনি পাচার চক্রের হদিশ! বাগুইআটি থেকে বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেফতার, উদ্ধার ‘রেট...

কলকাতায় কিডনি পাচার চক্রের হদিশ! বাগুইআটি থেকে বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেফতার, উদ্ধার ‘রেট চার্ট’

কলকাতা ও তার সংলগ্ন এলাকায় কিডনি পাচার ঘিরে এক চাঞ্চল্যকর তদন্তে উঠে এল আন্তর্জাতিক যোগসূত্রের অভিযোগ। বাগুইআটি থেকে বাংলাদেশি নাগরিক রাসেল আহমেদকে গ্রেফতার করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। পুলিশের দাবি, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিস্তৃত একটি কিডনি পাচারচক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি।

তদন্তকারীদের হাতে এসেছে একটি কথিত ‘রেট চার্ট’ এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বেসরকারি হাসপাতাল সংক্রান্ত নথি। সেখানে কিডনির প্রয়োজন ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের উল্লেখ রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। গোটা ঘটনায় আরও কারা যুক্ত, সেই খোঁজেই তদন্ত এগোচ্ছে।

কীভাবে সামনে এল কিডনি পাচারের অভিযোগ?

ঘটনার সূত্রপাত ১৮ অগস্ট ২০২৬। বিধাননগর দক্ষিণ থানায় এক যুবকের পরিবারের তরফে অভিযোগ দায়ের হয়। পরিবারের বক্তব্য ছিল, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ওই যুবককে অন্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং পরে জানা যায়, তাঁর একটি কিডনি নেই।

তদন্তে পুলিশ প্রথমে প্রভাস মণ্ডল নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পরেই রাসেল আহমেদের নাম সামনে আসে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এরপর STF তদন্তে নামে এবং বাগুইআটির আটঘড়া-ফুলতলা এলাকা থেকে রাসেলকে গ্রেফতার করা হয়।

কাজের টোপ, তারপর কিডনি বাদ—কীভাবে চলত চক্র?

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, এই চক্রের নিশানায় থাকত আর্থিকভাবে দুর্বল যুবক ও পরিবার। তাঁদের ভালো চাকরি বা আর্থিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হত।

অভিযোগ, এরপর তাঁদের অন্য রাজ্যে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢোকানো হত। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের কিডনি অপসারণের পর তাঁদের সামান্য টাকা দেওয়া হয়েছিল বলেও পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

এখন তদন্তকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন—এই নেটওয়ার্ক শুধু মধ্যস্থতাকারী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি এর সঙ্গে আরও বড় কোনও সংগঠিত চক্র জড়িত?

প্রভাস মণ্ডল কে?

তদন্তের এই পর্বে প্রভাস মণ্ডলের ভূমিকাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, প্রথমে তিনিও প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন এবং পরে চক্রটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রভাসের নিজেরও একটি কিডনি অপসারণ করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ঠিক কী কী অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তা তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াতেই স্পষ্ট হবে।

বাগুইআটি থেকে গ্রেফতার রাসেল আহমেদ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পুলিশের দাবি অনুযায়ী, রাসেল কোনও নতুন মুখ নন। ২০২৪ সালেও দিল্লি পুলিশ তাঁকে কিডনি পাচার সংক্রান্ত মামলায় গ্রেফতার করেছিল। সেই সময় তাঁর বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে ভারতে প্রবেশ এবং ভুয়ো ভারতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের অভিযোগ ওঠে।

পরবর্তী সময়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসে ফের একই ধরনের কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। তাঁর কাছে আধার ও প্যান কার্ড-সহ ভুয়ো নথি পাওয়া গিয়েছিল বলেও পুলিশ সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

তবে আগের মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের চূড়ান্ত আইনি ফল হয়েছিল, তা আলাদা আদালত ও তদন্ত নথির বিষয়। তাই পুরনো অভিযোগকে বর্তমান মামলার প্রমাণ হিসেবে সরাসরি ধরে নেওয়া উচিত নয়।

‘রেট চার্ট’ থেকে কী সূত্র মিলেছে?

এই মামলায় তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হচ্ছে একটি ‘রেট চার্ট’

পুলিশের দাবি, ওই নথিতে কিডনি সংক্রান্ত মূল্য বা চাহিদার তথ্য ছিল। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতালের কিছু নথিও উদ্ধার হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন হাসপাতালের কিডনির প্রয়োজনের উল্লেখ রয়েছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

এই নথিগুলিই এখন তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। এর মাধ্যমে পাচারচক্রের সঙ্গে অন্য শহর, মধ্যস্থতাকারী বা হাসপাতাল-সংক্রান্ত কোনও যোগাযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

চিকিৎসা জগতের কেউ কি জড়িত?

এ মুহূর্তে এই প্রশ্নই সবচেয়ে সংবেদনশীল।

পুলিশের হাতে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের নথি এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু নথি পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটা বলা যাবে না।

তদন্তকারীরা এখনও চক্রের পরিধি, অপারেশন কোথায় হয়েছে, কে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল এবং হাসপাতালের ভিতরে কোনও বেআইনি যোগসূত্র ছিল কি না—এসব খতিয়ে দেখছেন। এই পর্যায়ে হাসপাতাল বা চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে তুলে ধরা অনুচিত।

যে যুবককে কেন্দ্র করে তদন্ত শুরু

মামলার প্রাথমিক অভিযোগে যে যুবকের কথা উঠে এসেছে, তাঁর নাম মঙ্গল মণ্ডল। তিনি কলকাতায় একটি গ্লাভস কারখানায় কাজ করতেন বলে জানা গিয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ, বেশি উপার্জনের সুযোগের কথা বলে তাঁকে পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয়। হাসপাতালে পরীক্ষার পর তাঁর পরিবারের কাছে জানা যায়, শরীরে একটি কিডনি নেই বলে দাবি করা হয়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রামেও বাম কিডনি অনুপস্থিত থাকার কথা চিকিৎসকদের নজরে আসে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

তবে কিডনি কীভাবে অপসারণ করা হয়েছিল, কে অপারেশন করেছিল এবং এতে কারা সরাসরি যুক্ত ছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও তদন্তাধীন।

বাংলাদেশ যোগ কতটা গভীর?

রাসেল আহমেদের গ্রেফতারের পর পুলিশের তদন্তে ভারত-বাংলাদেশ আন্তঃসীমান্ত যোগসূত্রের সম্ভাবনা সামনে এসেছে।

তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই চক্রের নেটওয়ার্ক শুধু কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশে ঠিক কতজন বা কোন কোন ব্যক্তি এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত, সে বিষয়ে এখনও কোনও পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক যোগের ইঙ্গিত মিলেছে, কিন্তু গোটা নেটওয়ার্কের কাঠামো এখনও তদন্তাধীন।

রাসেলকে জিজ্ঞাসাবাদে এখন পুলিশের লক্ষ্য কী?

রাসেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা তাঁর স্থানীয় সহযোগী, দালাল, ভুক্তভোগী এবং অন্য রাজ্যের যোগাযোগ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে চাইছেন।

কোন পথে ভুক্তভোগীদের বাছাই করা হত, তাঁদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হত, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হত এবং হাসপাতাল-সংক্রান্ত নথির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

সাধারণ মানুষের জন্য বড় সতর্কবার্তা

এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—চক্রটি নাকি চাকরি ও আর্থিক উন্নতির স্বপ্ন দেখিয়ে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষদের টার্গেট করত। তাই কেউ অস্বাভাবিক বেশি বেতনের চাকরি, দ্রুত টাকা পাওয়ার সুযোগ বা বিদেশে/ভিনরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে নথিপত্র ও নিয়োগকারী সংস্থা যাচাই না করে এগোনো উচিত নয়।

কোনও ব্যক্তিকে চিকিৎসার নামে অন্য শহরে নিয়ে যাওয়া হলে হাসপাতাল, চিকিৎসক, চিকিৎসার কারণ এবং সম্মতিপত্র সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য থাকা জরুরি। অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিবারকে বিষয়টি দ্রুত পুলিশকে জানানো উচিত।

তদন্ত এখন কোন পর্যায়ে?

রাসেল আহমেদকে গ্রেফতারের পর তাঁকে বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চক্রের পরিধি এবং আরও অভিযুক্তদের সন্ধান করার চেষ্টা চলছে। পুলিশ তাঁকে রবিবার উত্তর ২৪ পরগনার একটি আদালতে পেশ করেছে।

এই মামলায় আরও গ্রেফতার বা নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন। তবে এখনই পুরো চক্রের আকার বা চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে এর যোগ কতটা গভীর, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

এক নজরে

মামলার সূত্রপাত: ১৮ অগস্ট ২০২৬
প্রথম গ্রেফতার: প্রভাস মণ্ডল
STF-এর গ্রেফতার: রাসেল আহমেদ
গ্রেফতারের স্থান: বাগুইআটি, আটঘড়া-ফুলতলা এলাকা
অভিযোগের ধরন: কিডনি পাচার ও প্রতারণার অভিযোগ
উদ্ধার: কথিত ‘রেট চার্ট’ ও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের নথি
আন্তর্জাতিক যোগ: ভারত-বাংলাদেশের সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক
তদন্তের বর্তমান লক্ষ্য: অন্যান্য সহযোগী ও চক্রের বিস্তার চিহ্নিত করা

কলকাতার বুকে এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হল—অভাব ও চাকরির প্রয়োজনকে হাতিয়ার করে কেউ যদি মানুষকে কিডনি পাচারের ফাঁদে ফেলেই থাকে, তাহলে শুধু কয়েকজন দালালকে গ্রেফতার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এই নেটওয়ার্কের অর্থের উৎস, মধ্যস্থতাকারী এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত যোগাযোগ পর্যন্ত পৌঁছনোই তদন্তের বড় পরীক্ষা। আর সেই কারণেই এখন নজর STF ও বিধাননগর পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments