আজ বলিউডের অন্যতম পরিচিত তারকা অক্ষয় কুমার। কোটি কোটি টাকার পারিশ্রমিক, একের পর এক বড় বাজেটের সিনেমা এবং ‘খিলাড়ি’ হিসেবে দীর্ঘদিনের পরিচিতি—সবটাই তাঁর বর্তমান পরিচয়। কিন্তু এই সাফল্যের অনেক আগে তাঁর জীবন ছিল একেবারেই অন্যরকম।
বলিউডে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করেছিলেন রাজীব ভাটিয়া, যে নামেই তখন তাঁকে চেনা হত। নিজের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে অভিনেতা জানিয়েছেন, জীবনের শুরুতে খুব অল্প বয়সেই কাজ শুরু করেছিলেন তিনি।
আর তাঁর সংগ্রামের তালিকা কলকাতাতেই শেষ হয়নি। কাজের সন্ধানে তিনি ঢাকায় হোটেলে এবং ব্যাংককে রেস্তরাঁয়ও কাজ করেছেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে এগিয়েছে তাঁর অভিনয়জীবনের পথ।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রথম উপার্জন
অক্ষয় কুমার জানিয়েছেন, মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রথম কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর প্রথম উপার্জনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার নাম।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কলকাতার একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করার সময়ই প্রথম বেতন পেয়েছিলেন। সেই সময় তাঁর মাসিক আয় ছিল মাত্র ১৫০ টাকা।
কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় তাঁর সেই কর্মস্থল ছিল। পরবর্তী সময়ে শহরে ফিরে এসে সেই পুরনো জায়গাটিও তিনি চিনিয়ে দিয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ, যে শহরে আজ তাঁর সিনেমার প্রচারে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন, সেই কলকাতাতেই একসময় সামান্য বেতনের চাকরি করতেন ভবিষ্যতের ‘খিলাড়ি’।
কলকাতার পর ঢাকা, তারপর ব্যাংকক
অক্ষয়ের জীবনের শুরুটা ছিল কাজ আর নতুন কিছু শেখার চেষ্টায় ভরা।
কলকাতায় ট্রাভেল এজেন্সির কাজের পর তিনি ঢাকায় যান। সেখানে একটি হোটেলে শেফ হিসেবে কাজ করেছিলেন বলে তাঁর জীবনী ও পুরনো সাক্ষাৎকারভিত্তিক রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর মার্শাল আর্ট শেখার আগ্রহ তাঁকে নিয়ে যায় থাইল্যান্ডের ব্যাংককে। সেখানে Muay Thai শেখার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য রেস্তরাঁয় রাঁধুনি ও ওয়েটার হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। নিজের কথাতেই, শুধু একটাই কাজ করতেন না—রান্না থেকে খাবার পরিবেশন, নানা ধরনের কাজ সামলাতে হত।
তাই ‘অক্ষয় কুমারের সংগ্রাম’ বলতে শুধু কলকাতার ছোট চাকরির গল্প নয়; এর মধ্যে রয়েছে বিদেশে গিয়ে নিজের খরচ চালিয়ে মার্শাল আর্ট শেখার অধ্যায়ও।
সত্যিই কি হোটেলের এঁটো বাসন মাজতেন?
অক্ষয়ের সংগ্রামের গল্পে এই ঘটনাটিও বহুবার এসেছে।
থাইল্যান্ডে কাজ করার সময় রান্না ও খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি তিনি রেস্তরাঁর বিভিন্ন কাজ করতেন বলে পুরনো জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। কিছু সূত্রে খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি বাসন পরিষ্কার করার কথাও রয়েছে।
তবে এটিকে ‘ঢাকার হোটেলে শুধু বাসন মাজতেন’—এভাবে বলা সঠিক হবে না। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় তিনি শেফ হিসেবে কাজ করেছিলেন, আর ব্যাংককে রেস্তরাঁয় রান্না ও ওয়েটারের কাজ করেছিলেন।
এই ছোট্ট পার্থক্যটিই গুরুত্বপূর্ণ—কারণ অক্ষয়ের নিজের স্মৃতিচারণে বিভিন্ন জায়গার কাজের ধরন আলাদা করে উঠে এসেছে।
মার্শাল আর্টই বদলে দিল জীবনের দিশা
ছোটবেলা থেকেই অক্ষয়ের মার্শাল আর্ট শেখার আগ্রহ ছিল। ভারতে তায়কোয়ান্দোতে ব্ল্যাক বেল্ট পাওয়ার পর তিনি আরও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যাংককে যান এবং সেখানে Muay Thai শেখেন।
দেশে ফেরার পরে তিনি মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। আর সেখানেই আসে জীবনের বড় মোড়।
তাঁর এক ছাত্রের বাবার পরামর্শে তিনি মডেলিংয়ের সুযোগ পান। প্রথম দিকের একটি মডেলিং অ্যাসাইনমেন্ট থেকেই তিনি বুঝতে পারেন, এই পেশায় তাঁর সামনে নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ফটোগ্রাফার জয়েশ শেঠের সঙ্গে কাজ করে নিজের পোর্টফোলিও তৈরি করেন।
রাজীব ভাটিয়া থেকে ‘অক্ষয় কুমার’ কীভাবে?
এখানে রয়েছে অক্ষয়ের জীবনের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যগুলির একটি।
তাঁর আসল নাম রাজীব ভাটিয়া। ১৯৮৭ সালে মহেশ ভাটের ‘Aaj’ ছবিতে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ছবিতে কুমার গৌরবের চরিত্রের নাম ছিল ‘অক্ষয়’। সেই নামটি তাঁর এতটাই পছন্দ হয় যে পরবর্তীকালে তিনি নিজের নাম বদলে ‘অক্ষয় কুমার’ রাখেন।
পরে এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা নিজেই স্পষ্ট করেছিলেন, কোনও জ্যোতিষী বা পুরোহিতের পরামর্শে তিনি নাম বদলাননি। ছবির নায়কের নাম ‘অক্ষয়’ ভাল লেগেছিল বলেই নামটি বেছে নিয়েছিলেন।
১৯৯১-এ ‘সৌগন্ধ’, তারপর ‘খিলাড়ি’
প্রধান চরিত্রে অক্ষয় কুমারের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘সৌগন্ধ’, ১৯৯১ সালে। ছবিটি তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে তারকা বানাতে পারেনি। কিন্তু এক বছর পর মুক্তি পাওয়া ‘খিলাড়ি’ তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
‘খিলাড়ি’-র সাফল্যের পর অ্যাকশন হিরো হিসেবে তাঁর আলাদা পরিচয় তৈরি হয় এবং সেখান থেকেই ‘খিলাড়ি’ তকমাটি স্থায়ী হয়ে যায়।
এর পর একের পর এক ছবিতে কাজ করে ধীরে ধীরে বলিউডের শীর্ষ সারির অভিনেতাদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি।
কলকাতার সঙ্গে অক্ষয়ের সম্পর্ক এত বিশেষ কেন?
অক্ষয় নিজেই কলকাতায় কাটানো সময়ের কথা বহুবার বলেছেন। একবার শহরে এসে তিনি নিউ মার্কেট এলাকার পুরনো কর্মস্থলটি খুঁজে বের করেছিলেন। সেই স্মৃতি তাঁর কাছে বিশেষ আবেগেরও ছিল।
তিনি একবার কলকাতায় বলেছিলেন, এই শহরে কাজ করার সময় অনেক কিছু শিখেছিলেন এবং সেই সময়কার কথা মনে করে তাঁর গর্ব হয়।
তাই কলকাতা অক্ষয় কুমারের জীবনে শুধু আর পাঁচটা শহরের মতো নয়। বলিউডে পৌঁছনোর অনেক আগে এই শহরের রাস্তাতেই তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছিল।
আজকের ‘খিলাড়ি’ আর সেই তরুণ রাজীব—দুই জীবনের দূরত্ব
আজ অক্ষয় কুমার বলিউডের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলির একটি। কিন্তু তাঁর নিজের বলা অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাফল্যের আগে তাঁকে নানা ধরনের কাজের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
কলকাতায় মাত্র ১৫০ টাকার প্রথম বেতন থেকে শুরু করে ঢাকা ও ব্যাংককে কাজ, মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ, দেশে ফিরে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ, তারপর মডেলিং এবং শেষ পর্যন্ত সিনেমা—এই পথটি মোটেই এক লাফে পাড়ি দেওয়া হয়নি।
তাই অক্ষয় কুমারের গল্পকে শুধু ‘তারকা হওয়ার গল্প’ বললে হয়তো পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না। এটি আসলে এক তরুণের কাজ শেখা, ব্যর্থতা সামলানো, নতুন সুযোগ খোঁজা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প।
যে রাজীব ভাটিয়া একসময় কলকাতায় সামান্য বেতনে কাজ করতেন, তিনিই পরবর্তীকালে হয়ে উঠলেন বলিউডের ‘খিলাড়ি’ অক্ষয় কুমার—আর সেই যাত্রায় কলকাতার অধ্যায়টিও তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অংশ।



