Sunday, September 20, 2026
Google search engine
Homeখেলাধুলা‘এই সিদ্ধান্তটা এখনও কষ্ট দেয়’—আর্জেন্টিনা থেকে বিদায় মেসির! ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোলের...

‘এই সিদ্ধান্তটা এখনও কষ্ট দেয়’—আর্জেন্টিনা থেকে বিদায় মেসির! ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোলের মহাকাব্যিক অধ্যায়ের সমাপ্তি

কিছু বিদায় শুধু একজন খেলোয়াড়ের অবসর নয়, একটি প্রজন্মের স্মৃতিরও ইতি। ৩৯ বছর বয়সে সেই কঠিন সিদ্ধান্তই নিলেন লিওনেল মেসি। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় জানিয়েছেন ফুটবলের মহাতারকা। ইনস্টাগ্রামে হাতে লেখা এক আবেগঘন বার্তায় জানালেন, সিদ্ধান্তটি নিতে তাঁর এখনও গভীর কষ্ট হচ্ছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মেসি ফুটবল থেকে অবসর নেননি। তাঁর বিদায় শুধুই আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি থেকে। ক্লাব ফুটবলে ইন্টার মায়ামির হয়ে তাঁর যাত্রা আপাতত অব্যাহত রয়েছে।

২১ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে শেষ অধ্যায়

২০০৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে অভিষেক করেছিলেন মেসি। সেই শুরু থেকে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ২০৭টি ম্যাচ, করেছেন ১২৫টি গোল এবং ৬৮টি অ্যাসিস্টের রেকর্ড গড়েছেন। জাতীয় দলের হয়ে ম্যাচ ও গোল—দুই ক্ষেত্রেই তিনি আর্জেন্টিনার সর্বকালের শীর্ষে।

শেষ পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালই হয়ে রইল আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ। নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সির মঞ্চে স্পেনের কাছে ১-০ হারের পরই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় করেন তিনি।

‘এই সিদ্ধান্তটা এখনও ভীষণ কষ্ট দেয়’

সোমবার, ৩১ অগস্ট ২০২৬ ইনস্টাগ্রামে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান মেসি। তাঁর বার্তার মূল সুর—এই সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য সহজ ছিল না। জাতীয় দলের হয়ে খেলা তাঁর জীবনের অন্যতম বড় গর্ব, এবং শেষ পর্যন্ত তিনি মনে করেছেন, এবার থামার সময় এসেছে।

মেসি আরও জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের ফাইনালের দুই দিন পরেই তিনি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাবার মৃত্যু সেই সিদ্ধান্তের মানসিক প্রেক্ষাপটকে আরও কঠিন করে তোলে।

৪৭ সেকেন্ডেই লাল কার্ড—সেখান থেকে শুরু

মেসির জাতীয় দলের গল্পের শুরুটা কিন্তু রূপকথার মতো ছিল না।

২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে অভিষেক ম্যাচে মাঠে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই, প্রায় ৪৭ সেকেন্ডের মাথায়, লাল কার্ড দেখেছিলেন তরুণ মেসি। কান্নাভেজা সেই দৃশ্য আজও তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় শুরু হিসেবে মনে করা হয়।

সেই মুহূর্ত থেকে পরের ২১ বছরে গল্পটা পুরোপুরি বদলে যায়। ব্যর্থতা, সমালোচনা, ফাইনালে হার—সবকিছুর মধ্য দিয়ে মেসি শেষ পর্যন্ত নিজেকে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবলারে পরিণত করেছেন।

২০১৬-র অবসর, তারপরই বদলে গেল ইতিহাস

২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন মেসি। কিন্তু খুব বেশিদিন দূরে থাকতে পারেননি তিনি। দেশ ও সমর্থকদের চাপে আবার ফিরে আসেন জাতীয় দলে।

সেই প্রত্যাবর্তনের পরই আসে আর্জেন্টিনার সাফল্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।

২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ, এবং ২০২৪ সালে ফের কোপা আমেরিকা—একটির পর একটি বড় ট্রফি জিতে জাতীয় দলের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটান মেসি।

২০২২ বিশ্বকাপ—অপূর্ণ স্বপ্নের পূর্ণতা

মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ছিল কাতার।

২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয়, কোপা আমেরিকার একাধিক ফাইনালে ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে ‘মেসি কি দেশের হয়ে বড় ট্রফি জিততে পারবেন?’ প্রশ্নটি একসময় তাঁর কেরিয়ারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।

২০২২ সালে সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন তিনি নিজেই। আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছরের অপেক্ষার পর বিশ্বকাপ জিতিয়ে কাপ হাতে তুলেছিলেন মেসি। সেই সাফল্য তাঁর জাতীয় দলের কেরিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকে।

২০২৬-এ ট্রফি নয়, শেষ হল যাত্রা

তবে তাঁর শেষ বিশ্বকাপের পরিণতি হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দুর্দান্ত লড়াই করে ফাইনালে উঠলেও স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্স-আপ হয়। আর সেই ম্যাচের পরই মেসি বুঝতে পারেন, জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর সময় প্রায় শেষের পথে।

তাই স্ক্রিপ্টে ‘বিশ্বজয়ের মুকুট মাথায় দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়’ বলা সঠিক নয়। তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল হারের ফাইনাল, যদিও তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি হয়ে থাকবে ২০২২-এর বিশ্বকাপ জয়।

‘নতুনদের জায়গা করে দেওয়ার সময় এসেছে’

মেসির অবসরবার্তার অন্যতম আবেগঘন অংশ ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা।

তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, জাতীয় দলে নতুন প্রতিভাবান ফুটবলারদের জায়গা করে দেওয়ার সময় এসেছে। তাঁর নিজের ভাষায়, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং নতুন অধ্যায় শুরু করার সময় এসে গেছে।

এটাই হয়তো মেসির বিদায়ের সবচেয়ে সুন্দর দিক—তিনি শুধু নিজের কেরিয়ারের শেষের কথা বলেননি, বরং পরবর্তী প্রজন্মের দিকে তাকিয়েছেন।

২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল—সংখ্যার বাইরেও এক ইতিহাস

পরিসংখ্যান তাঁর কেরিয়ারের বিশালত্ব বোঝাতে সাহায্য করে, কিন্তু মেসির প্রভাব শুধু সংখ্যায় আটকে নেই।

২০৭ আন্তর্জাতিক ম্যাচ
১২৫ গোল
৬৮ অ্যাসিস্ট
২ বার কোপা আমেরিকা জয়
১ বার বিশ্বকাপ জয়
৬ বার বিশ্বকাপের মূলপর্বে অংশগ্রহণ

এর পাশাপাশি রয়েছে ৮টি Ballon d’Or, অসংখ্য ব্যক্তিগত রেকর্ড এবং আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাসে এক অনন্য উত্তরাধিকার।

মেসি কি আর কোনওদিন আর্জেন্টিনার জার্সি পরবেন?

নিজের ঘোষণা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর ফিরবেন না। অর্থাৎ আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিতে তাঁকে আর প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক ম্যাচে দেখার সম্ভাবনা নেই।

তবে তিনি ফুটবল ছাড়ছেন না। ক্লাব পর্যায়ে এখনও তাঁর খেলা অব্যাহত থাকবে। তাই মাঠ থেকে একেবারে হারিয়ে যাচ্ছেন না ফুটবলের এই মহাতারকা।

বাবার মৃত্যুও কি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল?

হ্যাঁ। মেসি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের পরপরই অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবা জর্জ মেসির সাম্প্রতিক মৃত্যু তাঁর মানসিক অবস্থাকে আরও প্রভাবিত করে এবং সিদ্ধান্ত প্রকাশের সময়ও পিছিয়ে যায়।

ফলে বিদায়ের এই মুহূর্তটি শুধু ফুটবলের সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে ব্যক্তিগত শোকও মিশে আছে।

মেসির উত্তরাধিকার কী?

আর্জেন্টিনার হয়ে একসময় যিনি ‘মারাদোনার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন কি না’—এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই নিজের আলাদা ইতিহাস লিখেছেন।

বিশ্বকাপ জয়, কোপা আমেরিকা জয়, রেকর্ড গোল, রেকর্ড ম্যাচ এবং দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের মুখ হয়ে থাকা—সব মিলিয়ে মেসির জায়গা ইতিমধ্যেই আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে স্থায়ী।

তিনি নিজেও জানিয়েছেন, জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা তাঁর কাছে সবসময় গর্বের ছিল এবং তিনি প্রতিটি ম্যাচে নিজের সর্বস্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

এক নজরে মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ার

অভিষেক: ২০০৫
শেষ ম্যাচ: ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল
আন্তর্জাতিক ম্যাচ: ২০৭
গোল: ১২৫
অ্যাসিস্ট: ৬৮
কোপা আমেরিকা: ২০২১, ২০২৪
বিশ্বকাপ: ২০২২ চ্যাম্পিয়ন
২০২৬ বিশ্বকাপ: রানার্স-আপ
আন্তর্জাতিক অবসরের ঘোষণা: ৩১ অগস্ট ২০২৬

শেষ পর্যন্ত মেসির বিদায় কোনও হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। বহু বছরের সাফল্য, ব্যর্থতা, প্রত্যাবর্তন, ব্যক্তিগত শোক এবং শেষ বিশ্বকাপের পর দীর্ঘ ভাবনার মধ্য দিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত এটি।

আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে তাঁর অধ্যায় শেষ হয়েছে। কিন্তু মেসির গল্প শেষ হয়নি।
কারণ কোনও একটি ট্রফি, কোনও একটি ম্যাচ কিংবা কোনও একটি পরিসংখ্যান দিয়ে যে কিংবদন্তিকে মাপা যায় না—লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক বিদায় যেন তারই শেষ প্রমাণ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments