দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর সাধারণত প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির জন্য নির্দিষ্ট কিছু সরকারি সুবিধা থাকার কথা। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় কেটে গেলেও এখনও নিজের সরকারি আবাসন পাননি প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়। বর্তমানে তিনি দিল্লির ছত্তরপুরে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লোকদল নেতা অভয় সিং চৌটালার পরিবারের একটি ফার্মহাউসে থাকছেন।
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত Hindustan Times-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধনকড়ের জন্য এখনও কোনও সরকারি বাড়ি বরাদ্দ হয়নি। তাঁর দফতরও এই বিষয়ে কোনও প্রস্তাব বা বরাদ্দ হয়েছে কি না, তা নিয়ে মন্তব্য করেনি। ফলে এক বছর আগে যেটিকে সাময়িক ব্যবস্থা বলা হয়েছিল, সেটিই এখনও তাঁর ঠিকানা হয়ে রয়েছে।
২১ জুলাই ২০২৫-এ হঠাৎ ইস্তফা
জগদীপ ধনকড় ২১ জুলাই ২০২৫-এ আচমকাই উপরাষ্ট্রপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন। নিজের পদত্যাগপত্রে তিনি স্বাস্থ্যগত কারণের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ইস্তফার পর প্রায় ছয় সপ্তাহ তিনি উপরাষ্ট্রপতির সরকারি আবাসনেই ছিলেন।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ তিনি দিল্লির চত্তরপুরের গাদাইপুর এলাকায় অভয় চৌটালার পরিবারের ফার্মহাউসে চলে যান। তখন বলা হয়েছিল, এটি ছিল অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা, যতদিন না তাঁর জন্য উপযুক্ত সরকারি আবাসন প্রস্তুত হয়। অভয় চৌটালাও জানিয়েছিলেন, তাঁদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্কের কারণেই তিনি ধনকড়কে সেখানে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
কিন্তু সেই ‘সাময়িক’ ব্যবস্থা এক বছর পেরিয়েও শেষ হয়নি।
কেন এখনও সরকারি বাংলো মেলেনি?
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের বক্তব্য—এখনও ধনকড়ের নামে কোনও সরকারি বাসস্থান বরাদ্দ হয়নি। তবে কেন হয়নি, তার কোনও স্পষ্ট সরকারি ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি। তাঁর দফতরও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ধনকড় ফার্মহাউসে যাওয়ার সময় সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছিল যে তাঁর জন্য একটি অবসরকালীন সরকারি আবাসন চিহ্নিত ও প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া চলছিল। এখন এক বছর পরেও সেই প্রক্রিয়ার ফলাফল সামনে না আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক প্রশ্ন উঠছে।
আইন কী বলছে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির সুবিধা নিয়ে?
এখানেই সোশ্যাল মিডিয়ার অনেক দাবিকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
The Vice-President’s Pension Act, 1997 অনুযায়ী, যে ব্যক্তি উপরাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর নেন বা পদত্যাগ করেন, তিনি জীবনের বাকি সময় পেনশনের অধিকারী। আইনের বর্তমান ব্যবস্থায় পেনশনের পরিমাণ উপরাষ্ট্রপতির বেতনের ৫০ শতাংশ হিসেবে নির্ধারিত।
একই আইনে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির জন্য নির্দিষ্ট কিছু অন্যান্য সুবিধার ব্যবস্থাও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি নির্ধারিত সজ্জিত বাসস্থান, টেলিফোন সুবিধা, নির্দিষ্ট সংখ্যক সচিবালয় কর্মী ও অফিস খরচ এবং চিকিৎসা সুবিধা। যাতায়াতের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে।
অর্থাৎ, ধনকড়ের সরকারি আবাসনের প্রশ্নটি কোনও নিছক উপকার বা রাজনৈতিক অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধির অধীনে নির্ধারিত সুবিধার অংশ।
তবে এর মানে এটাও নয় যে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির পছন্দমতো নির্দিষ্ট একটি বাংলো তাঁকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দিতে হবে। আইনে বাসস্থানের ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারণ করবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
তাহলে কি ধনকড় পেনশন পাচ্ছেন না?
এমন দাবি করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
বরং আইনে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির পেনশনের স্পষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। তাই “সরকারি বাড়ি পাননি মানেই পেনশন ও সব সুবিধা বন্ধ”—এই ধারণা সঠিক নয়। আবাসন না পাওয়ার বিষয়টি আলাদা এবং সেটিই বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কখনও কখনও বলা হচ্ছে, ধনকড় “কোনও সুবিধাই পাচ্ছেন না”। এই দাবিও প্রমাণিত নয়। বরং আইন অনুযায়ী প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির জন্য একাধিক সুবিধার কাঠামো রয়েছে।
অভয় চৌটালার ফার্মহাউসে কেন উঠেছিলেন?
এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে।
অভয় চৌটালা নিজেই জানিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের সঙ্গে ধনকড়ের বহুদিনের সম্পর্ক। ২০২৫ সালে যখন ধনকড় নিজের সরকারি আবাসন ছাড়ার পর নতুন জায়গার অপেক্ষায় ছিলেন, তখন চৌটালা তাঁকে তাঁদের ফার্মহাউসে থাকার প্রস্তাব দেন। এটিকে রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে নয়, অন্তত প্রকাশ্য বক্তব্যে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে দেওয়া একটি সাময়িক থাকার ব্যবস্থা হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।
চৌটালা পরিবার এবং ধনকড়ের সম্পর্কের সূত্র বহু বছর আগের। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রয়াত দেবী লালের সঙ্গে ধনকড়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল এবং সেই সূত্রেই চৌটালা পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল।
এক বছর পরেও সেই ‘অস্থায়ী’ ঠিকানাই কেন?
এটাই পুরো ঘটনার সবচেয়ে অস্বাভাবিক দিক।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফার্মহাউসে যাওয়ার সময় ধারণা ছিল, দ্রুতই সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা হবে। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও ধনকড় সেখানেই রয়েছেন। Hindustan Times জানিয়েছে, এক বছর পেরিয়েও কোনও সরকারি বাড়ি বরাদ্দের তথ্য পাওয়া যায়নি।
Outlook-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত উপরাষ্ট্রপতির জন্য Type-VIII শ্রেণির সরকারি আবাসনের অধিকার রয়েছে এবং ধনকড় এখনও সেই সরকারি বাসস্থান পাননি।
ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—যদি তাঁর জন্য সরকারি আবাসনের বিধান থাকে, তাহলে সেটি বাস্তবে বরাদ্দ হতে এতটা সময় কেন লাগছে?
কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর এখনও সরকারি ভাবে স্পষ্ট নয়।
‘রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়া বাংলো মেলে না’—এমন কোনও প্রমাণ আছে?
না, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে নেই।
বরং যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে প্রশাসনিক স্তরে আবাসন বরাদ্দের প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগ নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। Outlook জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কিছু প্রশাসনিক আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, ধনকড়ের আবাসনের বিষয়ে কোন স্তর থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল বা বর্তমান ব্যবস্থার কাছে তা পৌঁছেছিল কি না, সেটিও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
তাই এটিকে সরাসরি “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা” বা “সুপারিশ ছাড়া সরকারি বাড়ি মেলে না” বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়া এখনই ঠিক হবে না।
ধনকড়ের স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল
সরকারি আবাসন নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ধনকড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে খবর সামনে আসে।
৩ জুলাই ২০২৬-এ জয়পুরের Eternal Hospital-এ তাঁর অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করা হয় এবং চিকিৎসকেরা দুটি স্টেন্ট বসান। হাসপাতালের সূত্র অনুযায়ী, হাঁটার সময় বুকে ভারী লাগা, শ্বাসকষ্ট এবং মাঝেমধ্যে বুকে ব্যথার অভিযোগ নিয়ে তিনি হাসপাতালে গিয়েছিলেন।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি আবাসন না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, তাঁর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সঙ্গে সরাসরি জুড়ে দেওয়া ঠিক হবে না।
ধনকড়ের আগে ভেঙ্কাইয়া নাইডুর ক্ষেত্রে কী হয়েছিল?
ধনকড়ের বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে কারণ তাঁর পূর্বসূরি এম. ভেঙ্কাইয়া নাইডুর অবসর-পরবর্তী আবাসনের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
নাইডু ১১ আগস্ট ২০২২-এ উপরাষ্ট্রপতির পদ ছাড়েন। পরবর্তীতে তিনি দিল্লির ১, ত্যাগরাজ মার্গের বাংলোয় ওঠেন এবং ২০২২ সালের অক্টোবরের মধ্যে সেখানে চলে গিয়েছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দুই ক্ষেত্রের প্রশাসনিক পরিস্থিতি এক ছিল কি না, তা জানা নেই। তাই শুধুমাত্র সময়ের তুলনা থেকে উদ্দেশ্যমূলক বৈষম্যের সিদ্ধান্তে পৌঁছনোও ঠিক হবে না।
তাহলে আসল প্রশ্নটা কোথায়?
ঘটনাটি থেকে সবচেয়ে স্পষ্ট যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হল—একজন প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির জন্য আইনে যখন সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে, তখন তাঁর ক্ষেত্রে সেই আবাসন বরাদ্দে এত দীর্ঘ বিলম্ব কেন?
আজ পর্যন্ত প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর কোনও নির্দিষ্ট সরকারি ব্যাখ্যা নেই।
একদিকে আইন প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির জন্য পেনশন, বাসস্থান এবং অন্যান্য সুবিধার কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে। অন্যদিকে বাস্তবে ধনকড় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অন্যের মালিকানাধীন ফার্মহাউসে বসবাস করছেন।
‘কাজ ফুরোলেই নাম ফুরোয়’—প্রশ্ন উঠতেই পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নয়
ধনকড়ের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে রাজনৈতিক বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাঁর আচমকা পদত্যাগ, তারপর সরকারি আবাসন না পাওয়া এবং দীর্ঘদিন ফার্মহাউসে থাকা—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনও সরকারি প্রমাণ সামনে আসেনি যার ভিত্তিতে বলা যায় যে কেন্দ্র ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে আবাসন দিচ্ছে না, কিংবা রাজনৈতিক কারণে তাঁর অধিকার আটকে রাখা হয়েছে।
তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভুল কথা হল—
জগদীপ ধনকড় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির জন্য সরকারি আবাসন পাননি। তিনি বর্তমানে অভয় চৌটালার পরিবারের ফার্মহাউসে থাকছেন। আইনে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির জন্য আবাসন ও একাধিক সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ বিলম্বের কারণ এখনও সরকারি ভাবে স্পষ্ট করা হয়নি।
এখন নজর থাকবে—কবে ধনকড়ের জন্য সরকারি আবাসন বরাদ্দ হয় এবং এতদিনের এই প্রশাসনিক জটিলতার কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা সামনে আসে কি না।



