সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও ব্যক্তিগত জীবনকে বরাবরই প্রচারের আলো থেকে দূরে রেখেছেন শ্রেয়া ঘোষাল। মঞ্চে তাঁর কণ্ঠে মুগ্ধ হন কোটি কোটি শ্রোতা, কিন্তু ক্যামেরার আড়ালে কেমন তাঁর সংসার? স্বামী শিলাদিত্য মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ভিতটাই বা এত শক্ত কীভাবে?
সম্প্রতি এক খোলামেলা কথোপকথনে নিজের দাম্পত্য জীবন, স্বামীর সঙ্গে বোঝাপড়া এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন গায়িকা। তাঁর কথাতেই উঠে এসেছে এমন এক সম্পর্কের ছবি, যেখানে ভালোবাসার পাশাপাশি রয়েছে বন্ধুত্ব, স্বাধীনতা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সম্মান।
ছেলেবেলার বন্ধুত্ব থেকেই শুরু
শ্রেয়া ও শিলাদিত্যর সম্পর্কের গল্প কোনও হঠাৎ তৈরি হওয়া প্রেমকাহিনি নয়। তাঁদের পরিচয় বহু বছরের পুরনো। বন্ধুত্ব থেকেই ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক অন্য মাত্রা পায়।
দীর্ঘ সময় একে অপরকে জানার পর প্রায় এক দশক প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন তাঁরা। এরপর ২০১৫ সালে বাঙালি রীতি মেনে বিয়ে করেন শ্রেয়া ও শিলাদিত্য।
অর্থাৎ, বিয়ের আগেই একে অপরের স্বভাব, পছন্দ-অপছন্দ এবং জীবনযাপনের সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন দু’জন। আর সম্ভবত সেই দীর্ঘ বন্ধুত্বই তাঁদের দাম্পত্যের অন্যতম শক্ত ভিত।
শ্রেয়ার সাফল্যের নেপথ্যে শিলাদিত্যর ভূমিকা কতটা?
২০০২ সালে ‘দেবদাস’ ছবির হাত ধরে বলিউডে প্লেব্যাকের জগতে বড়সড় পরিচিতি পান শ্রেয়া। এরপর একের পর এক হিট গান তাঁকে নিয়ে যায় সাফল্যের শীর্ষে।
অন্যদিকে শিলাদিত্য নিজের পেশাগত জগতে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন। দু’জনের কর্মক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও একে অপরের পেশাকে সম্মান করার বিষয়টি তাঁদের সম্পর্কে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রেয়ার কথায়, সম্পর্কের ক্ষেত্রে একে অপরকে নিজের মতো করে বাঁচার জায়গা দেওয়াটাই অত্যন্ত জরুরি। তাঁর ব্যস্ত কেরিয়ারের কারণে দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হলেও সেই নিয়ে তাঁদের সম্পর্কে অবিশ্বাস বা অশান্তির জায়গা তৈরি হয়নি।
মাসের পর মাস দূরে থেকেও সম্পর্ক অটুট কেন?
একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীর জীবন মানেই নিয়মিত শুটিং, রেকর্ডিং, অনুষ্ঠান এবং দেশ-বিদেশে যাতায়াত। ফলে বছরের একটা বড় সময় শ্রেয়াকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়।
কিন্তু দূরত্বকে তাঁদের সম্পর্কের দুর্বলতা হতে দেননি দু’জন।
এখানেই সামনে আসে বিশ্বাসের বিষয়টি। শ্রেয়ার মতে, কোনও সম্পর্কে সবসময় জবাবদিহির চাপ তৈরি করে রাখলে সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে। তার বদলে একে অপরের কাজ ও ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঘরের কাজে ‘সেলিব্রিটি’ পরিচয়ের কোনও জায়গা নেই
শ্রেয়া ও শিলাদিত্যর সংসারের আরেকটি দিকও বেশ নজরকাড়া।
বাইরের দুনিয়ায় দু’জনেরই নিজস্ব পরিচয় রয়েছে। কিন্তু বাড়ির ভিতরে সেই পরিচয়ের কোনও বাড়তি গুরুত্ব নেই। সংসারের কাজ দু’জনেই নিজেদের মতো করে সামলান।
শ্রেয়ার বর্ণনায়, শিলাদিত্য নিজের কাজ নিজে করতে স্বচ্ছন্দ। রান্নাঘর পরিষ্কার করা কিংবা নিজের ব্যবহারের বাসনপত্র ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজও তিনি নিজেই করেন।
শ্রেয়া সাহায্য করতে চাইলে অনেক সময় তিনি তা করতেও দেন না। কারণ তাঁর কাছে ঘরের কাজ কোনও নির্দিষ্ট লিঙ্গের দায়িত্ব নয়—নিজের কাজ নিজে করাই স্বাভাবিক।
দাম্পত্যে ইগোর জায়গা নেই
দু’জনেই নিজেদের পেশায় প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তাঁদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কে বেশি সফল, কার পরিচিতি বেশি—এই হিসাব যেন কখনও জায়গা পায়নি।
বরং তাঁদের সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পারস্পরিক সম্মান।
একজন মঞ্চে হাজার হাজার দর্শকের সামনে গান করেন, অন্যজন নিজের পেশাগত জগতে ব্যস্ত থাকেন। দু’জনের সাফল্যের ক্ষেত্র আলাদা হলেও একে অপরের অর্জনকে সম্মানের চোখে দেখেন তাঁরা।
আর এই জায়গাটাই সম্ভবত তাঁদের দাম্পত্যকে অন্যরকম করে তুলেছে।
২০২১ সালে পরিবারে আসে নতুন সদস্য
দীর্ঘ দাম্পত্যের পর ২০২১ সালে শ্রেয়া ও শিলাদিত্যর পরিবারে আসে তাঁদের ছেলে দেবযান।
সন্তান আসার পর তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের ছবিও অনেকটাই বদলে যায়। এখন কাজের ব্যস্ততার পাশাপাশি ছেলেকে ঘিরেও তাঁদের জীবনের বড় একটি অংশ আবর্তিত হয়।
খ্যাতি, পুরস্কার কিংবা পেশাগত সাফল্যের বাইরে পরিবারই যে শ্রেয়ার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিভিন্ন সময়ে তাঁর কথাবার্তায় তার ইঙ্গিত মিলেছে।
তাহলে কেন নিজেকে এত ভাগ্যবতী মনে করেন শ্রেয়া?
শ্রেয়ার জীবনে সাফল্যের অভাব নেই। অসংখ্য জনপ্রিয় গান, পুরস্কার এবং কোটি শ্রোতার ভালোবাসা—সবই রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
কিন্তু তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সুখের সংজ্ঞাটা বোধহয় আরও সহজ।
এমন একজন জীবনসঙ্গী, যিনি তাঁর ব্যস্ততাকে বোঝেন, নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা দেন, পেশাগত পরিচয়কে সম্মান করেন এবং একইসঙ্গে জীবনের ছোট ছোট দায়িত্বও ভাগ করে নেন—এই সম্পর্ককেই নিজের সৌভাগ্য বলে মনে করেন শ্রেয়া।
তাই মঞ্চের আলো থেকে অনেক দূরে, প্রচারের আড়ালে তাঁদের সংসারের যে ছবিটা দেখা যায়, সেখানে তারকার ঝলকানির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস আর পারস্পরিক সম্মান।
প্রায় তিন দশকের পরিচয়, দীর্ঘ প্রেম এবং এক দশকেরও বেশি দাম্পত্য—সব মিলিয়ে শ্রেয়া ও শিলাদিত্যর সম্পর্ক যেন প্রমাণ করে, দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার জন্য শুধু প্রেম নয়, প্রয়োজন একজন আরেকজনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হয়ে ওঠা।



