একসময় ভারতের অন্যতম পরিচিত শিল্পপতি। কিংফিশার এয়ারলাইন্স, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের জন্য খবরের শিরোনামে থাকা সেই বিজয় মালিয়াই এখন দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে।
ভারতে না ফেরার কারণে বছরের পর বছর ধরে তাঁকে ‘পলাতক’ বা ‘ভাগোড়া’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু এবার সেই পরিচয়ই সরাসরি অস্বীকার করলেন মালিয়া।
ব্রিটেন থেকে একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তাঁর দাবি, তিনি ইচ্ছা করে ভারত থেকে পালিয়ে বিদেশে বসে নেই। বরং ব্রিটেনের আইনি পরিস্থিতির কারণেই তিনি বর্তমানে দেশটি ছাড়তে পারছেন না। একইসঙ্গে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে ‘চরম অবিচার’-এর অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
‘আমি পলাতক নই, ব্রিটেন ছাড়তেই পারছি না’
মালিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৯২ সাল থেকেই ব্রিটেনে স্থায়ী বাসিন্দা। তাঁর দাবি, বর্তমানে তাঁর উপর এমন আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে যার কারণে তিনি যুক্তরাজ্য ছেড়ে অন্য দেশে যেতে পারছেন না।
অর্থাৎ, ভারতে ফিরছেন না—এই বিষয়টিকে তিনি নিজের ইচ্ছাকৃত পলাতক অবস্থান হিসেবে দেখতে নারাজ।
তাঁর বক্তব্য, তাঁকে ‘ভাগোড়া’ হিসেবে উপস্থাপন করার আগে ব্রিটেনে চলা আইনি প্রক্রিয়াটিও বিবেচনা করা উচিত।
ভারত সরকারই তাঁকে ‘পোস্টার বয়’ বানিয়েছে?
শুধু ‘পলাতক’ তকমা নিয়েই আপত্তি নয়। ভারত সরকারের বিরুদ্ধেও সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন মালিয়া।
তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে যে ধরনের প্রচার হয়েছে, তা তাঁকে আর্থিক অনিয়মের ‘পোস্টার বয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তিনি সরকারের পদক্ষেপকে ‘poster boy actions’ বলেও কটাক্ষ করেছেন।
তবে এগুলি মালিয়ার নিজস্ব অভিযোগ ও বক্তব্য—ভারত সরকার বা তদন্তকারী সংস্থার অবস্থান হিসেবে এগুলিকে দেখার সুযোগ নেই।
₹১৪,১৩১ কোটির হিসাব তুলে প্রশ্ন মালিয়ার
এই বিতর্কে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন টাকা উদ্ধারের হিসাব নিয়ে।
মালিয়া একটি ED-র হলফনামার উল্লেখ করে দাবি করেছেন, ২০২১ সালেই তাঁর কাছ থেকে ₹১৪,১৩১.৬০ কোটি উদ্ধার হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, এই অঙ্কের সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা ₹৬,২০৩ কোটির ‘judgment debt’-এর তুলনা করলে তাঁকে এখনও কেন ব্যাংক প্রতারণার জন্য দায়ী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন ওঠে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
₹১৪,১৩১.৬০ কোটি এবং ₹৬,২০৩ কোটি—এই দুই অঙ্ক একই ধরনের হিসাব নয়। মালিয়া নিজেই এগুলিকে তুলনা করে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে ED-এর সরকারি নথিতে ₹১৪,১৩১.৬০ কোটি মূল্যের সম্পদ বাজেয়াপ্ত/রেস্টিটিউশন এবং SBI-কে তা ফেরত দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। ফলে ‘উদ্ধার হওয়া সম্পদ’ আর ‘আইনি দায় বা judgment debt’কে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক হবে না।
ED-এর সরকারি হিসাব কী বলছে?
ED-এর ২০২৫-২৬ সালের বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিজয় মালিয়াকে ৫ জানুয়ারি ২০১৯ সালে Fugitive Economic Offender ঘোষণা করা হয়েছিল।
একই নথিতে বলা হয়েছে, মালিয়া, কিংফিশার এয়ারলাইন্স ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার ক্ষেত্রে ₹১৪,১৩১.৬ কোটি মূল্যের সম্পদ কেন্দ্রীয় সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং SBI-নেতৃত্বাধীন ব্যাংকগুলির আবেদনের ভিত্তিতে প্রায় একই মূল্যের সম্পদ তাদের কাছে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
ED-এর বর্তমান রেস্টিটিউশন তালিকাতেও বিজয় মালিয়ার ক্ষেত্রে ₹১৪,১৩১.৬০ কোটি সম্পদ পুনরুদ্ধারের পরিমাণ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, সম্পদ উদ্ধারের বিষয়ে মালিয়ার বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরকারি ED নথিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু সেই তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য আইনি দায় বা ফৌজদারি অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না।
কিংফিশার কর্মীদের ₹৩১১.৬৭ কোটিও দেওয়া হয়েছে
মালিয়া আরও দাবি করেছেন, তাঁর সংযুক্ত সম্পদ থেকে ₹৩৫০ কোটিরও বেশি টাকা কিংফিশার এয়ারলাইন্সের কর্মীদের বকেয়া মেটাতে ব্যবহার করা হয়েছে।
সরকারি ED নথিতে অবশ্য নির্দিষ্ট অঙ্ক হিসেবে ₹৩১১.৬৭ কোটি উল্লেখ রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ED জানায়, Debt Recovery Tribunal-এর নির্দেশের ভিত্তিতে এই অর্থ কিংফিশারের প্রাক্তন কর্মীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া মেটানোর জন্য Official Liquidator-এর মাধ্যমে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অর্থাৎ, মালিয়ার দাবির সঙ্গে সরকারি নথির মধ্যে অঙ্কের পার্থক্য রয়েছে। তাই ₹৩৫০ কোটি নয়, প্রকাশিত সরকারি নথির ভিত্তিতে ₹৩১১.৬৭ কোটির হিসাব ব্যবহার করাই বেশি নির্ভুল।
তাহলে ‘পলাতক অর্থনৈতিক অপরাধী’ তকমা কেন?
এখানেই আসল আইনি প্রশ্ন।
মালিয়ার দাবি, তিনি ব্রিটেনের আইনি বিধিনিষেধের কারণে আটকে রয়েছেন। কিন্তু ভারতীয় আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আলাদা অবস্থান তৈরি হয়েছে।
ED-এর সরকারি নথি অনুযায়ী, ৫ জানুয়ারি ২০১৯ তাঁকে Fugitive Economic Offender হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়া এবং ভারতে ফেরানোর প্রচেষ্টা সেই বৃহত্তর মামলারই অংশ।
ভারতের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে চলমান। বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেটস’ কোর্ট মালিয়াকে ভারতে প্রত্যর্পণের সুপারিশ করেছিল এবং বিষয়টি পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে যায়।
আদালতে মালিয়ার লড়াই এখনও শেষ হয়নি
মালিয়া শুধু সম্পত্তি ও অর্থ উদ্ধারের হিসাব নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন না। তিনি Fugitive Economic Offenders Act এবং তাঁকে ‘fugitive’ ঘোষণা করার প্রক্রিয়াকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন।
সাম্প্রতিক আইনি শুনানিতেও আদালতের পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতে আইনি প্রতিকার চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং ভারতে ফিরে আদালতের এখতিয়ারের মুখোমুখি হওয়ার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে।
ফলে মালিয়ার বক্তব্য যতই জোরালো হোক, তাঁর বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
আসল প্রশ্ন: ₹১৪ হাজার কোটি উদ্ধার হলে দায় শেষ?
এই প্রশ্নটিই এখন নতুন করে সামনে এনেছেন বিজয় মালিয়া।
তাঁর যুক্তি—যদি তাঁর সম্পদ থেকে ব্যাংক ও সরকারি সংস্থাগুলি বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধার করে থাকে, তাহলে তাঁকে এখনও কেন প্রতারক বা ‘ভাগোড়া’ হিসেবে তুলে ধরা হবে?
অন্যদিকে সরকারি সংস্থার অবস্থান হল, সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা ব্যাংকের কাছে ফেরত দেওয়া এবং ফৌজদারি/আইনি দায়—দুটি আলাদা বিষয়। ED-এর নথিতেও সম্পদ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মালিয়াকে Fugitive Economic Offender হিসেবে ঘোষণার বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই ₹১৪,১৩১.৬০ কোটি সম্পদ পুনরুদ্ধারের তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শুধু এই অঙ্কের ভিত্তিতে মালিয়ার বিরুদ্ধে থাকা সব আইনি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না।
এখন নজর কোথায়?
একদিকে মালিয়া বলছেন, তাঁকে অন্যায়ভাবে ‘পলাতক’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে এবং তাঁর সম্পদ থেকে উদ্ধার হওয়া অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা উচিত।
অন্যদিকে ভারতের তদন্তকারী সংস্থার সরকারি নথিতে তাঁর Fugitive Economic Offender হিসেবে ঘোষণার বিষয়টি স্পষ্টভাবে রয়েছে এবং বিপুল সম্পদ SBI-সহ সংশ্লিষ্ট দাবিদারদের কাছে পুনরুদ্ধারের কথাও বলা হয়েছে।
ফলে বিজয় মালিয়ার নতুন দাবি শুধু পুরনো বিতর্ককে ফিরিয়ে আনেনি—এটি সম্পদ পুনরুদ্ধার, ব্যাংকের বকেয়া, ফৌজদারি দায় এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া—এই চারটি প্রশ্নকে আবার একই আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
শেষ পর্যন্ত আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়াই ঠিক করবে, মালিয়ার দাবিগুলির কোন অংশ কতটা গ্রহণযোগ্য। আপাতত তাঁর ‘আমি পলাতক নই’ বক্তব্য ঘিরে নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে বহু বছরের পুরনো বিজয় মালিয়া বিতর্ক।
SEO তথ্য
SEO Title: বিজয় মালিয়া ‘পলাতক’ নন? ₹১৪,১৩১ কোটির হিসাব তুলে ভারত সরকারকে কাঠগড়ায় শিল্পপতি
Meta Description: নিজেকে ‘পলাতক’ মানতে নারাজ বিজয় মালিয়া। ₹১৪,১৩১.৬০ কোটি সম্পদ উদ্ধারের দাবি তুলে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ করলেন তিনি? জানুন পুরো ঘটনা।
Primary Keyword: বিজয় মালিয়া
Secondary Keywords: বিজয় মালিয়া পলাতক, Vijay Mallya latest news, বিজয় মালিয়া ১৪১৩১ কোটি, কিংফিশার এয়ারলাইন্স, Fugitive Economic Offender, বিজয় মালিয়া ভারত প্রত্যর্পণ
Suggested Slug: vijay-mallya-fugitive-14131-crore-recovery
Google Discover Headline: ‘আমি পলাতক নই!’ ₹১৪ হাজার কোটির হিসাব তুলে ভারত সরকারকে নিশানা বিজয় মালিয়ার



