Sunday, September 20, 2026
Google search engine
Homeআন্তর্জাতিকছেলের অপেক্ষায় পৃথিবী ছাড়লেন চিন্ময়কৃষ্ণের মা! মৃত্যুর পর ৫ ঘণ্টার প্যারোল ঘিরে...

ছেলের অপেক্ষায় পৃথিবী ছাড়লেন চিন্ময়কৃষ্ণের মা! মৃত্যুর পর ৫ ঘণ্টার প্যারোল ঘিরে উঠছে বড় প্রশ্ন

জীবনের শেষ মুহূর্তে ছেলেকে একবার চোখের সামনে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণ হল না। কারাবন্দি ছেলে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের সঙ্গে শেষ দেখা না হয়েই বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যু হল তাঁর মা সন্ধ্যা রানি ধরের

মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়, যাতে তিনি মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে পারেন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অনুমোদনের পর ১০ সেপ্টেম্বর তাঁকে কারাগার থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।

কিন্তু যে প্যারোলটি একজন অসুস্থ মাকে শেষবার দেখার জন্য চাওয়া হয়েছিল, তা মঞ্জুর হল না জীবিত অবস্থায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে আইনি প্রক্রিয়া, প্যারোলের নিয়ম এবং মানবিকতার প্রশ্ন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ হল না কেন?

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্ধ্যা রানি ধর দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রায় দু’মাস ধরে তাঁর চিকিৎসা চলছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মৃত্যুর আগের দিন পরিবার চিন্ময়কে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে অসুস্থ মায়ের সঙ্গে দেখা করার আবেদন করেছিল।

কিন্তু সেই আবেদন অনুমোদিত হয়নি।

পরদিন সকালে হাটহাজারীর পুণ্ডরীক ধামে সন্ধ্যা রানি ধর মারা যান। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে আবার প্যারোলের আবেদন করা হয়—এবার মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য।

এই আবেদনই অনুমোদন পায়।

মৃত্যুর পর মিলল ৫ ঘণ্টার প্যারোল

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়ার অনুমোদনের পর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোল দেওয়া হয়।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতেই এই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে তাঁকে আবার চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল।

পুণ্ডরীক ধামে মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নেন চিন্ময়। সেই মুহূর্তের আবেগঘন ছবি ও ভিডিও ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে।

কিন্তু মায়ের জীবিত মুখটি শেষবার দেখার সুযোগ আর হল না।

প্যারোল নিয়ে আইনি প্রশ্ন কোথায়?

এই ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে প্যারোলের নিয়ম নিয়ে।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম The Daily Sun-এর প্রতিবেদনে পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, প্যারোলের আবেদনটি মায়ের মৃত্যুর আগে করা হলেও সেই সময়ে তা অনুমোদিত হয়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ছিল—প্রচলিত ব্যবস্থায় আত্মীয়ের মৃত্যুর পর শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য প্যারোল দেওয়া যায়।

অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো আইনি প্রেক্ষাপটটি ধরা পড়বে না।

একদিকে রয়েছে একজন মুমূর্ষু মায়ের সঙ্গে সন্তানের শেষ সাক্ষাতের মানবিক আবেদন, অন্যদিকে রয়েছে কারাবন্দির প্যারোল সংক্রান্ত প্রশাসনিক ও আইনি নিয়ম।

এই দুইয়ের সংঘাতই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে।

চিন্ময় কি চার মামলায় জামিন পেয়েও জেলে?

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মামলার বর্তমান অবস্থাও এই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশের হাইকোর্ট আরও দুটি মামলায় তাঁকে জামিন দেয়। এর ফলে ছয়টি ফৌজদারি মামলার মধ্যে চারটিতে তাঁর জামিন হয়েছে বলে তাঁর আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য জানিয়েছেন।

তবে তাতেই তাঁর কারামুক্তির পথ খুলে যায়নি।

কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় জামিনের আদেশ স্থগিত রয়েছে। পাশাপাশি আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের হত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলার বিচার চট্টগ্রাম স্পিডি ট্রায়াল ট্রাইব্যুনালে চলছে। ফলে চারটি মামলায় জামিন পাওয়ার পরও তিনি জেলের বাইরে আসতে পারেননি।

তাই “একাধিক মামলায় জামিন পেলেও সরকার ইচ্ছা করে তাঁকে আটকে রেখেছে”—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে আদালতের পৃথক মামলাগুলির বর্তমান অবস্থাটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে চিন্ময়ের বন্দিদশার সম্পর্ক নিয়ে কী দাবি উঠছে?

পরিবারের পক্ষ থেকে এমন দাবি সামনে এসেছে যে চিন্ময়ের দীর্ঘ কারাবাস এবং তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা সন্ধ্যা রানি ধরের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলেছিল।

কিছু প্রতিবেদনে পরিবারের বক্তব্য হিসেবে তাঁর স্ট্রোক ও হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যার কথাও বলা হয়েছে।

তবে মায়ের মৃত্যুর সরাসরি কারণ হিসেবে চিন্ময়ের কারাবাস বা সরকারের সিদ্ধান্তকে দায়ী করার মতো স্বাধীন চিকিৎসাগত প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই এই দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না লিখে পরিবারের অভিযোগ বা বক্তব্য হিসেবেই দেখা উচিত।

তারেক রহমান সরকারের দিকে উঠছে প্রশ্ন

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ঘটনাটি এখন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সময়েই নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে সরকার গঠন করেছেন।

তবে চিন্ময়ের মায়ের প্যারোল আবেদন কেন অনুমোদিত হয়নি, সেটিকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলে দাবি করার মতো প্রমাণ এই মুহূর্তে নেই।

বরং প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্যারোলের অনুমোদন দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের আবেদনেই পাঁচ ঘণ্টার প্যারোল মঞ্জুর হয়েছে।

সুতরাং রাজনৈতিক দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে সরাসরি তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নির্দেশ হিসেবে তুলে ধরা তথ্যভিত্তিক হবে না।

মানবিকতার প্রশ্নটিই কি সবচেয়ে বড়?

আইন তার নিজের পথে চলবে—এটাই রাষ্ট্রের স্বাভাবিক নীতি। কোনও অভিযুক্ত বা বিচারাধীন ব্যক্তির ক্ষেত্রেই আদালতের প্রক্রিয়া উপেক্ষা করার প্রশ্ন নেই।

কিন্তু একই সঙ্গে এমন ঘটনাও সামনে আসে, যেখানে আইনের কাঠামোর মধ্যেই মানবিক বিবেচনার জায়গা তৈরি করা যায় কি না, সেই প্রশ্ন ওঠে।

একজন গুরুতর অসুস্থ মায়ের শেষ ইচ্ছা ছিল ছেলেকে একবার দেখা। সেই সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি। পরে মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য সেই ছেলেকেই পাঁচ ঘণ্টার প্যারোল দেওয়া হল।

এই ঘটনাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে—আইন এবং মানবিকতার মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?

রাজনৈতিক তরজা কি এবার আরও বাড়বে?

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ঘিরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তেজনা আগেও তৈরি হয়েছে। তাঁর গ্রেফতার, মামলা এবং জামিনের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এবার মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটি সেই বিতর্কে নতুন আবেগ যোগ করেছে।

একদিকে তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ—একজন অসুস্থ মায়ের শেষ ইচ্ছাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে প্রশাসনের অবস্থান হলো, প্যারোল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই দেওয়া হয়েছে এবং মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে পাঁচ ঘণ্টার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন শুধু চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মামলা নয়।

কারাবন্দি একজন মানুষের পারিবারিক ও মানবিক অধিকার কতটা, প্যারোলের ক্ষেত্রে প্রশাসনের বিবেচনার সীমা কোথায় এবং আইনি নিয়মের সঙ্গে মানবিকতার ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে—এই প্রশ্নগুলিই সামনে চলে এসেছে।

মায়ের শেষ ইচ্ছা আর পূরণ হল না। ছেলের সঙ্গে দেখা হল না জীবিত অবস্থায়। আর মৃত্যুর পর মাত্র পাঁচ ঘণ্টার প্যারোল পেয়েই মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে হল চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে।

এই ঘটনা তাই বাংলাদেশে আইন, প্রশাসন ও মানবিকতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্কের দরজা খুলে দিয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments